আজ ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানাতে ২০ কোটি টাকার বই কিনছে সরকার!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর বই নিয়ে অনৈতিক ব্যবসা এবং কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে৷ আর এই অভিযোগ উঠেছে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সাংবাদিক ও তার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে৷ খবর ডয়চে ভেলের।

মুজিববর্ষে প্রাথামিক বিদ্যালয়ে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’-এর জন্য বঙ্গবন্ধুর ওপর বই কেনায় এই অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে৷ ২০ কোটি টাকার বই নিয়ে যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র রিপোর্টার নাজমুল হোসেন ও তার প্রকাশনা সংস্থা জার্নি মাল্টি মিডিয়ার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ৷ বই দুইটি হলো ‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ এবং বঙ্গবন্ধুর জেল জীবন নিয়ে ‘৩০৫৩ দিন’৷ বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা বইটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছিল৷ আর ৩০৫৩ দিন প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ৷ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বঙ্গবন্ধু কর্নারের জন্য যে আটটি বই কেনার জন্মধ্যে এই দুইটি বই আছে আছে৷ কিন্তু প্রকাশক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নাজমুল হোসেন ও তার প্রকাশনা সংস্থা জার্নি মাল্টি মিডিয়া৷ দু’টি বই-ই সম্পাদিত এবং ছবি ভিত্তিক৷

‘বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা’ বইটি ২০১৭ সালের ৮ জুন প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়৷ সম্পাদক অমিতাভ দেউরী৷ কিন্তু সর্বশেষ সংস্করণে প্রধান গবেষক হয়ে যান সাংবাদিক নাজমুল হোসেন৷ আর প্রকাশকও পরিবর্তন হয়৷ নাজমুলের জার্নি মাল্টি মিডিয়ার পক্ষে তার স্ত্রী শারমিন সুলতানার নাম প্রকাশক হিসেবে ছাপা হয়৷ প্রিন্টার্স লাইনেও আসে অনেক পরিবর্তন৷ এর এসবের কিছুই জানেন না অমিতাভ দেউরী৷ বিষয়টি তার নজরে আসার পর তিনি উকিল নোটিশ পাঠান গত ৩ আগস্ট৷ আর ‘৩০৫৩ দিন’ দিন বইটির সম্পাদক নাজমুল হোসেন৷ কিন্তু সেটার প্রকাশক কারা অধিদপ্তর বাদ দিয়ে নাজমুলের জার্নি মাল্টি মিডিয়া কিভাবে হলো তাও বড় প্রশ্ন৷ আইজি (প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ‘‘৩০৫৩ বইটির প্রকাশক কারা অধিদপ্তর৷ কিন্তু এর প্রকাশক কিভাবে পরিবর্তন হলো তা আমি ঠিক এই মুহূর্তে বলতে পারছিনা৷’’

যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তাতে এটা স্পষ্ট যে সরকারের দুইটি সংস্থার প্রকাশিত বইয়ের প্রকাশক এখন জার্নি মাল্টি মিডিয়া৷ আর এর লাভের অংশ পাচ্ছেন সাংবাদিক নাজমুল হোসেন৷ সরকারের বই এখন সরকারকেই টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে৷

কপিরাইট লঙঘনের অভিযোগ তুলেছেন অমিতাভ দেউরী৷ তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘আমাকে না জানিয়ে প্রিন্টার্স লাইন পরিবর্তন করা হয়েছে৷ নাজমুল প্রধান গবেষক হিসেবে প্রিন্টার্স লাইনে নতুন করে নাম লিখেছেন৷ আমার নাম নিচে নামিয়ে দেয়া হয়েছে৷ আর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বাদ দিয়ে নাজমুলের জার্নি মাল্টি মিডিয়াকে প্রকাশনা সংস্থা করা হয়েছে৷ এই বই অনেক দামে বিক্রি হচ্ছে অথচ আমার অনুমতি না নিয়ে আমার মেধাস্বত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে৷ আর এ কারণেই আমি উকিল নোটিশ পাঠিয়েছি৷’’

মুজিববর্ষে দেশের ৬৫ হাজার ৭০০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু কর্নারের’ জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বই কেনা প্রকল্পের মোট ২৮ কোটি ৭৮ লাখ ১২ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে ২০ কোটি ৭০ লাখ ৮৬ হাজার ৪০০ টাকাই পাচ্ছেন নাজমুল হোসেন৷

এ নিয়ে নাজমুল হোসেন বলেন, ‘‘আইনের লঙ্ঘন করে এখানে কোনো কাজ হয়নি৷ আমি যথাযথ অনুমোদন নিয়েই বই দুইটি প্রকাশ করেছি৷ কপিরাইট আমার প্রকাশনা সংস্থার৷ আর অভিতাভ দেউরীকে তার কাজের জন্য শুরুতেই সাত লাখ টাকা দেয়া হয়েছে৷ বই প্রকাশ থেকে শুরু করে সব ব্যয় আমার প্রকাশনা সংস্থা থেকে করা হয়েছে৷’’ তিনি দাবি করেন, ‘‘শিশুরা বঙ্গবন্ধুকে জানবে- এটা যারা বাধাগ্রস্ত করতে চায় তারাই এই সব অপপ্রচার করছে৷’’

এর জবাবে অমিতাভ দেউরী বলেন, ‘‘ওই সাত লাখ টাকা ছিলো আমার পুরো টিমের কাজের সম্মানি৷ তাই বলে আমার মেধাস্বত্ব তিনি কীভাবে নিজের করে নেন৷’’

এরই মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এই ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে৷ মুক্তিযুদ্ধ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে এবিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে৷ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম আল হোসেন বলেন, ‘‘আমরা এই সপ্তাহে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বুঝতে পারব আইনের কোনো লঙ্ঘন হয়েছে কিনা৷’’

তবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘‘বইটি প্রকাশে আমরা কোনো টাকা খরচ করিনি৷ অর্থ মন্ত্রণালয় কোনো টাকা দেয়নি৷ পরে জার্নি মাল্টিমিডিয়া এগিয়ে এলে আমরা তাদের বইটি প্রকাশ করতে দিই৷ যেহেতু তারা আমাদের সরবরাহ করা ছবি ও তথ্য দিয়ে বইটি প্রকাশ করে সেজন্য তিন ভাগের এক ভাগ রয়্যালিটি আমরা পাচ্ছি৷’’

‘‘তবে সম্পাদকের সঙ্গে মেধাস্বত্ব নিয়ে কি হয়েছে সেটা আমাদের জানা নাই৷ এটা আমাদের জানার বিষয়ও নয়,’’ বললেন মন্ত্রী৷