আজ ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২রা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মানিকগঞ্জে গোপনে বাল্যবিবাহের হিড়িক

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ সরকার ও জেলা প্রশাসন বাল্যবিয়ে রোধে নানা উদ্যোগ নিলেও মানিকগঞ্জে ঠেকানো যাচ্ছে না বাল্যবিয়ে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে শহর অঞ্চলের অভিভাবকরা বিভিন্ন কৌশলে তাদের কন্যা ও পুত্রসন্তানের বয়স লুকিয়ে বাল্যবিয়ে দিচ্ছেন। গোপনেই সারা হচ্ছে বিয়ের আয়োজন। মহামারী করোনা ও বন্যার সময়ে মানিকগঞ্জে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বেড়ে গেছে বহুগুণে। সরকারের নিয়ম উপেক্ষা করে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েদের অভিভাবকরা জালজালিয়াতির মাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে ভূয়া জন্ম নিবন্ধন দাখিল করে; আইনজীবীদের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে সম্পন্ন করছেন।

ফলে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ের নানা উদ্যোগ গ্রহণ করার পরেও মানিকগঞ্জে ঠেকানো যাচ্ছে না বাল্যবিয়ে। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কোন রকমের নোটারি পাবলিক গ্রহণযোগ্য না থাকলেও বেশিরভাগ বাল্যবিয়ের ঘটনায় দেখা গেছে নোটারির মাধ্যমে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।

এসব বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে-মেয়েদের অভিভাবকরা জালিয়াতির মাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে ভূয়া জন্ম নিবন্ধন দাখিল করে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে আগেভাগেই বিয়ে সম্পন্ন করেছেন।

জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলে বিয়ের আগে মেয়েরা যাতে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে না পড়ে এবং পরিবারের সুনাম বজায় রাখতে মেয়েদের বাল্যবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার পরিবারগুলো, বিশেষ করে বন্যাপ্রবণ এলাকার পরিবারগুলো তাদের মেয়েদের বাল্যবিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারগুলো সংসারের খরচ বাঁচাতে এবং কন্যাসন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পেরে কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। ফলে স্থানীয় সচেতন মহল বা প্রশাসন চেষ্টা করেও বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা করতে পারছে না স্কুল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের। বাল্যবিয়ে মুক্ত এ জেলার অধিকাংশ ছাত্রীর শিক্ষা জীবনের সমাপ্তি ঘটছে জেএসসি পরীক্ষার পরেই।

জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েরা প্রপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বাল্যবিয়ের অভিশাপে স্বামীর সংসার করতে বাধ্য হচ্ছে। আর এসব কাজে ছাত্রীর পরিবারের চেয়ে ঘটক ও অবৈধ নিকাহ রেজিস্টাররা বেশি আগ্রহী বলে দাবি স্থানীয়দের।

আইনজীবীরা জানান, বিশেষ প্রেক্ষাপটে কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের বিয়ের বিধান রেখে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭’ পাস হওয়ায় আগের তুলনায় বাল্যবিয়ে আরও বেড়েছে। এ আইনে সুবিধাভোগী কিছু আইনজীবী মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বাল্যবিয়েতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করছেন। আবার জন্ম নিবন্ধন সনদে ঘষামাজা করে আর এফিডেভিটের মাধ্যমে বয়স পরিবর্তন করেও অভিভাবকরা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের বিয়ে দিচ্ছেন।

ইতোপূর্বে বাল্যবিয়ের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে অনেক অভিভাবককে জেল জরিমানা করা হয়েছে। কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে নিকাহ রেজিস্টার এবং কাজীদেরও।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক নিকাহ রেজিস্টার ও কাজী অবৈধভাবে একাধিক সহকারী দিয়ে বেসরকারি ভলিয়মে অবৈধভাবে নিকাহ রেজিস্ট্রির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। পৌর এলাকার কিছু নিকাহ রেজিস্টার ও কাজী জেলা জজকোর্ট এলাকায় কিছু আইনজীবি ও তাদের সহকারীর মাধ্যমে এফিডেভিটের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করছেন।

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্টার কাজী শফিকুল ইসলাম সিংগাইর উপজেলার বায়রা ইউনিয়নের বাসিন্দা হয়ে কৃষ্ণপুর ইউনিয়নে নিকাহ রেজিস্টার হিসেবে নিয়োগ নিয়ে সহকারী মামুনুর রশীদকে দিয়ে ৩/৪ বছর ধরে অবৈধভাবে বিবাহ রেজিস্ট্রি করে আসছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি এই কাজী শফিকুল ইসলামের সহকারী মামুনুর রশীদকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা করা হয়। সহকারী কাজী মামুনুর রশীদ ভ্রাম্যমান আদালতের সাজা ভোগ করে বের হয়েও জজকোর্ট এলাকায় পৌরবিপণী মার্কেটের ২য় তলায় অফিস নিয়ে বিবাহ রেজিস্ট্রির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি দৌলতপুর উপজেলার জিয়নপুর ইউনিয়নের কাজী শফিউল্লাহ জজকোর্টের এ্যাডভোকেট রওশন আলমের মাধ্যমে এফিডেভিট করে শিবালয় উপজেলার উথলী ইউনিয়নের অপ্রাপ্তবয়স্ক এক কিশোরীর বিবাহ রেজিস্ট্রি করেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া সরকারী দেবেন্দ্র কলেজের পাশে ডায়মন্ড প্লাজার নীচতলায় অফিস নিয়ে জজকোর্ট এলাকায় একাধিক সহকারীর মাধ্যমে বাল্যবিয়ে করানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের কাজী মোঃ মনিরুজ্জামান। এছাড়া কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের একাংশের কাজী নুরুল ইসলামের সহকারী হিসেবে পরিচিত আইনজীবি সহকারী আলীম, পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডর কাজী মোশারফ, ৯ নং ওয়ার্ডের কাজী ও সিংগাইর পৌরসভার ১,২,৩ নং ওয়ার্ডের কাজী ও জেলা জজকোর্টের শিক্ষানবীশ আইনজীবি মতিউর রহমানের নামেও একাধিক বাল্যবিয়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব কাজীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও থেমে নেই তাদের কার্যক্রম।

সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম জানান, বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে। বাল্যবিবাহের খবর পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বাল্যবিবাহের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি আরো জানান, এফিডেভিটের মাধ্যমে নিকাহ রেজিস্ট্রি গ্রহণযোগ্য নয়।

বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে প্রশাসন জিরো টলারেন্স উল্লেখ করে জেলা রেজিস্টার মোশতাক আহমেদ জানান, নিকাহ রেজিস্টারদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নিকাহ রেজিস্টারদের কোন সহকারী নিয়োগ দেওয়ার বিধান নেই বলেও জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, নোটারী পাবলিক বা এফিডেভিটের মাধ্যমে বিবাহ রেজিস্ট্রি গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই বাল্যবিয়ে ঠেকানো না গেলে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশু মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।