আজ ১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষফোঁড়া চীনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক এক নিবন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক জেসিকা চেন ওয়েইস বলেছেন, চীনা জাতীয়তাবাদীদের চাপ ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয়তাবাদ উস্কে দিয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিসিপি) অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা পেলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বেইজিং। দিনে দিনে ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষফোঁড়া হয়ে উঠছে চীনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি।

 

তিনি বলেন, উহানে করোনা ভাইরাসের মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর বেশ সংঘবদ্ধভাবে ছিল চীন। এরপরও দেশটিকে নানা আন্তর্জাতিক চাপও সামাল দিতে হয়েছে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ তুলেছিল, উহানের ল্যাব থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি।

 

ওয়াশিংটন পোস্টের এই ব্লগ রাইটার বলেন, যদিও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) জন্য দেশীয় সমর্থন গড়ে তোলাই ছিল বেইজিংয়ের জাতীয়তাবাদী চাপের মূল লক্ষ্য। তবুও এই জাতীয়তাবাদী চাপের ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনা জোরালো হয়েছে।

 

অধ্যাপক জেসিকা চেন বলেন, প্রতিটি পক্ষই নিজেদের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে কভিড-১৯ মহামারি ছড়ানোর দায় অন্যের উপর চাপানোর চেষ্টা করছে এবং একে অপরকে অভিযুক্ত করছে। আর এটিই ওয়াশিংটনের উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

তিনি বলেন, কভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলা প্রচেষ্টা থেকে সরে যেতে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। যার ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে এবং করোনা মহামারি মোকাবেলায় বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

 

জাতীয়তাবাদী চীনা দৃষ্টিভঙ্গির ফলে সমস্যাগুলো বেড়েই চলছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহমর্মিতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে মার্কিন নীতির বিকল্প রাস্তাগুলোকে ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলা সহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক আরো খারাপ হয়েছে।

 

জেসিকা চেন আরো বলেন, সুদীর্ঘ বিবেচনায় জাতীয়তাবাদীদের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অনেক প্রমাণ পাওয়া যাবে। যে কারণে চীনের বিভিন্ন প্রচেষ্টাগুলো বৈশ্বিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেনি। জাতীয়তাবাদী চেতনার ফলে চীন কূটনৈতিকভাবে বিশ্বে একঘরে হয়ে পড়েছে এবং বিশ্বের কাছে চীনের আবেদনগুলো সীমাবদ্ধ হয়েছে।

 

তিনি আরো বলেন, জাতীয়তাবাদ উস্কে দিয়ে বেইজিং অভ্যন্তরীণভাবে চীনা জাতীয়তাবাদীদের সন্তুষ্ট করতে পারবে, তবে এটি বিশ্বে চীনের আবেদন সীমাবদ্ধ করবে। জাতীয় স্থিতিশীলতার নামে বিদেশিদের সম্পর্কে ঘৃণার সৃষ্টি করা,গুয়াংজুতে আফ্রিকান অভিবাসীদের প্রতি ঘৃণার সৃষ্টি করা,জিনজিয়াংয়ের সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার অপচেষ্টা  বা হংকংয়ের নৃতাত্ত্বিক দমন-পীড়ন এগুলোই বৃদ্ধি পাবে। জিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীন সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে।

 

বেইজিং এসব সমস্যাগুলো যদি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় তবে এখনো জাতীয়তাবাদ ঠেকানো চীনা নেতৃত্বের কাছে অসম্ভব কিছু নয়, যদিও এটার জন্য কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে বেশ মূল্য দিতে হবে বলে মনে করেন অধ্যাপক জেসিকা।

 

তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ধাক্কা খেয়ে বেইজিং এরই মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী মতবাদ ছড়িয়ে দেওয়া আক্রমণাত্মক বক্তব্য কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান করোনাভাইরাস প্রতিক্রিয়া মডেল ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদীদের হুঁশিয়ারি করেছেন। তাইওয়ানের সঙ্গে একিভুত হওয়ার বিষয়ে কোন রকম রকম শক্তি প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারা।  এছাড়াও ভারত, কাজাখিস্তান এবং ভিয়েতনাম সম্পর্কে মনগড়া এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার করা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

 

অধ্যাপক জেসিকা বলেন, জাতীয়তাবাদী বক্তব্যগুলোর কিছু কিছু ছড়িয়ে দেওয়া সত্ত্বেও দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৯ সালে তিয়েনামেন স্কয়ারের ক্র্যাকডাউনের পর থেকে বিশ্বব্যাপী চীনবিরোধী মনোভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে কোন প্রচেষ্টা সফল করতে অবশ্যই জনগণের মতামত নিতে হবে চীনা সরকারকে। আর মার্কিনদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে চাইলে সে জন্য জাতীয়তাবাদীদের রোষের মুখে পড়ার প্রস্তুতি থাকতে হবে বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট সরকারকে। তবে জাতীয়তাবাদের উপর সিসিপি যত বেশি ঝুঁকবে, বিশ্ব নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে চীন সম্পর্কে আমেরিকা ততটা বেশি উদ্বিগ্ন হবে। সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস।