আজ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ইয়াহিয়ার বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে হত্যার পরিকল্পনা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ আগস্ট মাস শোকের মাস। এ মাসেই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ২৩ বছরে ভাষা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুকে বারবার হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকেই পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে তাদের এক নম্বর শক্র হিসেবে চিহ্নত করে।

 

আমরা জানি, পাকিস্তানের সামরিক সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে ফাঁসি দেওয়ার প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে তাঁরা ব্যর্থ হয়। পরে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাসহ ১২টি অভিযোগ এনে সামরিক ট্রাইব্যুনালে গোপন বিচারে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার প্রচেষ্টা চালায়—এ ঘটনাও প্রায় সবাই জানে।

 

কিন্তু সামরিক ট্রাইব্যুনালে গোপন বিচারের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে আরো একটি হত্যা পরিকল্পনা করেছিলেন, তা আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না। পরিকল্পনাটি ছিল জেনারেল নিয়াজির গ্রামের বাড়ির জেলা শহর মিয়ানওয়ালের কারাগারে তাঁর জেলার বন্দিদের দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা।

 

বাঙালিরা নিয়াজিকে হত্যা করেছে এই সংবাদ রটিয়ে দিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যার সব আয়োজনই সম্পন্ন করেছিল ইয়াহিয়া সরকার। এ পরিকল্পনাও শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। এ জন্য ইয়াহিয়ার মধ্যে প্রচণ্ড দুঃখবোধ কাজ করে।

 

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের তিন দিন পর ১৯ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় শেখ মুজিবকে হত্যা করতে না পারার দুঃখের কথা জানিয়ে ভুট্টোকেই কাজটি শেষ করার অনুরোধ করেছিলেন।

 

(১৮ জানুয়ারি ১৯৭২, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস)। ২৫শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ক্র্যাকডাউন, ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ মাসের ঘটনাপ্রবাহ এবং ইয়াহিয়া খানের বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনার খবরগুলো উঠে আসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পাতায়।

 

স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো পাকিস্তানি সামরিক জান্তাদের হামলার শিকার হলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমই হয়ে ওঠে বিশ্ববাসীর কাছে পাকিস্তানি বর্বরতা ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার-পরবর্তী ঘটনার তথ্য জানার প্রধান মাধ্যম। পাকিস্তানি সেনাদের রুদ্ররোষ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়িয়েই বিদেশি সাংবাদিকরা তাঁদের নিজ নিজ মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করেন।

 

আমার মনে আছে, কিশোর বেলায় বিবিসির সকাল, সন্ধ্যা ও রাতের সংবাদ শোনার জন্য গভীর আগ্রহভরে অপেক্ষায় থাকার কথা। পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকতার সুবাদেই জানতে পারি, লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক সাইমন ড্রিং শেরাটন হোটেলের লন্ড্রির দোকান থেকে লুকিয়ে টেলিফোনে সংবাদ প্রেরণ করতেন।

 

বিবিসির মার্কটালি পাকিস্তানি সেনাদের অগোচরেই গণহত্যা ও ধ্বংসস্তূপ প্রত্যক্ষ করে সংবাদ পরিবেশন করেছেন অত্যন্ত গোপনে। পুলিত্জার পুরস্কার পাওয়া দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের দক্ষিণ এশিয়া প্রতিনিধি সিডনি স্যান্ডবার্গকে ‘আই উইটনেস অ্যাকাউন্টস’ শিরোনামে বেশ কিছু প্রতিবেদন লেখার জন্য ১৯৭১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

 

বঙ্গবন্ধুকে ধানণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তারের পর অজ্ঞাত স্থানে এবং পরে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। পাকিস্তানের কোথায়, কোন কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছে সে সম্পর্কে তাঁকে গ্রেপ্তারের পাঁচ মাসে আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যম তথ্য দিতে পারেনি। শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের মনোবল অটুট রাখার জন্য বঙ্গবন্ধু জনগণের মাঝে আছেন বলে প্রচার করা হতো।

 

বঙ্গবন্ধু জীবিত আছেন- এই তথ্যটি নিশ্চিত হওয়া যায় তখনই, যখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৩ আগস্ট পাকিস্তান টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “শেখ মুজিবকে ‘রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে দেশের আইনে বিচার করা হবে।”

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর জন্য পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর ক্যামেরা ট্রায়ালের খবর সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানোর সব আয়োজনই সম্পন্ন করে। কিন্তু এ সম্পর্কিত তথ্য প্রদানে সামরিক সরকারের সূত্রগুলো মুখে কুলুপ আঁটে। বঙ্গবন্ধুর বিচার সম্পর্কে হ্যান্ডআউট আকারে শুধু দুটি তথ্য গণমাধ্যমকে দেয়।

 

একটি সামরিক ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরুর তারিখ ১১ আগস্ট জানিয়ে বিবৃতি, অন্যটি ২০ আগস্ট করাচির আইনজীবী আল্লাহ বক্স খান ব্রোহিকে শেখ মুজিবের পক্ষে ডিফেন্স কাউন্সিলর নিয়োগের ঘোষণা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাসহ ১২টি অভিযোগ আনা হয় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে।

 

নজিরবিহীন গোপনীয়তার মধ্যেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন সূত্র থেকে কিছু কিছু তথ্য সংগ্রহ করে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ও সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের সংবাদ পরিবেশন করে। তবে বেশির ভাগ প্রতিবেদনে সংবাদ সূত্রের নাম উল্লেখ না করে ইনফরমড, ডিপ্লোমেটিক সূত্র ব্যবহার করে।

 

১০ আগস্ট ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনে ‘আওয়ামী লীগ চিফ টু বি ট্রায়েড বাই আর্মি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিবকে সম্ভবত রাওয়ালপিন্ডি থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণে মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। অবহিত (Informed) সূত্রের বরাদ দিয়ে বলা হয়, তাঁরা শুনেছেন রাওয়ালপিন্ডি থেকে সোজা দক্ষিণে ১৫০ মাইল দূরে পাঞ্জাবেরে উত্তরে লায়ালপুরের কাছাকাছি কোথাও বিচার অনুষ্ঠিত হবে।

 

বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের পাঁচ মাস পর প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সদর দপ্তর থেকে ইস্যু করা বিবৃতিতে ১১ আগস্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও অন্যান্য অভিযোগে বিশেষ সামরিক আদালতে রুদ্ধদ্বার কক্ষে শেখ মুজিবের বিচার শুরুর ঘোষণা দেন। ইয়াহিয়া খান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে এই বিবৃতিটি ইস্যু করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম এ বিবৃতিটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ১১ আগস্ট (বৃস্পতিবার) বিচার শুরুর তথ্য পাকিস্তানের সরকারি তরফ থেকে প্রচার করা হয়নি। এমনকি সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমও এ ব্যাপারে সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত থাকে। কতটা গোপনে বঙ্গবন্ধুর বিচার শুরু হয়, এটা তার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।

 

১৩ আগস্ট প্রকাশিত গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার ১১ আগস্ট পশ্চিম পাকিস্তানের অজ্ঞাত কোনো স্থানে শেখ মুজিবের বিচার শুরুর কথা জানিয়ে একটি বিবৃতি দেয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার এ বিচার নিয়ে পাকিস্তানের স্থানীয় পত্রিকা ও রেডিও কোনো তথ্য প্রচার করেনি। একেবারেই নীরব থাকে।

 

পশ্চিম পাকিস্তানের কোন স্থানে বিচার চলছে এবং কারা সামরিক ট্রাইব্যুনালের সদস্য তা-ও গোপন রাখে ইয়াহিয়া সরকার। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে করাচিতে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের নাম উল্লেখ না করে বলা হয়, তাঁরা (কূটনীতিকরা) বিশ্বাস করেন, রাওয়ালপিন্ডির ১০০ মাইল দক্ষিণের ছোট্ট শহর শাহিওয়ালে শেখ মুজিবের বিচার হয়।

 

সামরিক ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুর বিচার নিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে ‘করাচি নিউজপেপার রিপোর্টস : কনক্লুশন অব দ্য মুজিব ট্রায়াল’ শিরোনামে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) একটি খবর প্রকাশ করে, যা পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মর্নিং নিউজে ছাপা হয়। এতে বলা হয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগে গোপন সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার শেষ হয়।

 

ট্রাইব্যুনালের রিপোর্ট খুব শিগগিরই প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের কাছে পেশ করা হবে। খবরে বলা হয়, ২০ আগস্ট আল্লাহ বক্স খান ব্রোহিকে শেখ মুজিবের ডিফেন্স কাউন্সিলর হিসেবে নিয়োগদানের ঘোষণা ছাড়া সরকার সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রমের কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। মর্নিং নিউজের খবরে আরো বলা হয়, বিচার ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। শেখ মুজিব মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মুখোমুখি।

 

পাকিস্তানের সামরিক সরকারের এই বিচার কার্যক্রম ছিল সাজানো ও প্রহসনের। আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সব কিছু করা হচ্ছে তা বিশ্ববাসীকে দেখানোর জন্যই এই বিচারের আয়োজন করা হয়। বঙ্গবন্ধু আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ডিফেন্স কাউন্সিলর হিসেবে এ কে ব্রোহির নিয়োগদানও ছিল সামরিক সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক বিচারেরই অংশ।

 

বঙ্গবন্ধু এটা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই তিনি একপর্যায়ে ব্রোহিকে প্রত্যাখ্যান করেন। বঙ্গবন্ধু বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্যই ব্রোহিকে প্রত্যাখ্যান করেন। এটা জানা যায় ১৮ জানুয়ারি ১৯৭২ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক সিডনি স্যান্ডবার্গকে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার থেকে। পত্রিকাটিতে ‘হি টেলস ফুল স্টোরি অব অ্যারেস্ট অ্যান্ড ডিটেনশন’ শিরোনামে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকারধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিব আইনের বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন বলে আইন সম্পর্কে জানতেন।

 

তাঁর বিরুদ্ধে ১২টি অভিযোগ আনা হয়। এ কে ব্রোহিকে শেখ মুজিবের আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর লায়ালপুরে বিচার শুরু হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই তিনি ব্রোহিকে আইনজীবী হিসেবে চান বলে জানান। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নতুন মার্শাল ল অর্ডার জারি করেন। অর্ডারে বলা হয়, শেখ মুজিব চান বা না চান, তাঁকে আইনজীবী নিতেই হবে।

 

শেখ মুজিব বলেন, ‘তাদের চাওয়া একটাই, আমাকে ফাঁসি দেওয়া। বিচার শেষ হয় ৪ ডিসেম্বর। ইয়াহিয়া সামরিক আদালতের সব সদস্যকে ডেকে বলেন বিচারের ফাইন্ডিংসের খসড়া দ্রুত প্রণয়ন করতে।’ যুদ্ধের মধ্যে বিচারের রায় হাস্যকর হতে পারে বলে তা প্রকাশ করা হয়নি।

 

 

ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, তা ২৫শে মার্চের মিলিটারি ক্র্যাকডাউন শুরুর পরের দিন তাঁর ভাষণেই পরিষ্কার হয়ে যায়। ২৬শে মার্চ সন্ধ্যায় ভাষণে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভাঙার অভিযোগ এনে বলেন, ‘দিস ক্রাইম উইল নট গো আনপানিশড।’

 

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭ ডিসেম্বর শেখ মুজিবকে মিয়ানওয়ালির কারাগারে নেওয়া হয়। মিয়ানওয়ালি পূর্ব পাকিস্তান দখলদার সেনাবাহিনীর কমান্ডার লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজির গ্রামের বাড়ির জেলা শহর। শেখ মুজিব তাঁকে হত্যার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার নতুন পরিকল্পনার কথা জানতে পারেন ১৬ই ডিসেম্বর সকালে, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়ের দিনে।

 

পরিকল্পনাটি ছিল কারাগারে মিওয়ানওয়ালির বন্দিদের কাছে নিয়াজিকে বাঙালিরা হত্যা করেছে সংবাদ ছড়িয়ে দিয়ে মুজিবকে হত্যা করা। এ জন্য কারাগারে কবরও খোঁড়া হয়। কারাগারের তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে মুজিবের বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনি হত্যা পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে শেখ মুজিবকে রাত ৪টায় এক মাইল দূরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান।

 

যাওয়ার সময় শেখ মুজিব তত্ত্বাবধায়ককে বলেন, ‘আমাকে যদি ফাঁসির আদেশ কার্যকরের জন্য নেওয়া হয়, তবে প্রার্থনার জন্য কয়েক মিনিট সময় দেওয়া হোক।’ তত্ত্বাবধায়ক তাঁকে সময় নেই বলে টেনে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। যাওয়ার সময় শেখ মুজিব সেলের বাইরে খোঁড়া কবর দেখতে পান।

 

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন থেকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইয়াহিয়ার দুঃখের কথা জানা যায়। ১৯ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। বঙ্গবন্ধুকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় ইয়াহিয়া বলেন, তাঁর একটাই দুঃখ যে তিনি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারেননি। ভুট্টো যেন এই কাজটুকু শেষ করেন। ভুট্টো মুজিবকে ইয়াহিয়ার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা জানান।

 

ভুট্টোর প্রত্যাখ্যানের একটাই কারণ, বাঙালি এই নেতাকে হত্যা করা হলে পূর্ব পাকিস্তানে আত্মসমর্পণকারী প্রায় এক লাখ সৈন্য, যাদের বেশির ভাগই এসেছে পাঞ্জাব থেকে, তাদের হত্যা করা হবে। এর ফলে পাঞ্জাবের জনগণ ভুট্টোর শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।লেখক : সাংবাদিক ও বাসসের সাবেক সিটি এডিটর