আজ ১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নড়বড়ে পুতিনের ক্ষমতার আসন

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ মানুষ স্বাধীনতার জন্য, নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে এরচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। আর স্বৈরশাসকরা সেই দাবি প্রকাশ্যে অগ্রাহ্য করছেন এরচেয়ে ভয়ঙ্করও আর কিছু নেই।

 

বেলারুশে বিতর্কিত নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে রাস্তায় নেমেছে হাজার হাজার মানুষ, রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখেও আজ তারা নির্বিকার। রাশিয়ার খবারোভস্কে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে স্থানীয় গভর্নরকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে।

 

নড়বড়ে হয়ে গেছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ক্ষমতার আসন। দেশটির দুর্নীতিবিরোধী যোদ্ধা ও পুতিনের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালেক্সি নাভালনি আজ বিষক্রিয়ার কারণে হাসপাতালে কেন, এ প্রশ্ন সবার মুখে।

 

ভয় দিয়ে যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা নিজেরাও সবসময় ভয়ে থাকে। তাদের শঙ্কা, একদিন জনগণ আর তাদের মিথ্যাচার, জোচ্চুরি ও নিষ্ঠুরতা সহ্য করবে না। এধরনের শাসকরা প্রোপাগান্ডা, অত্যাচার আর পৃষ্ঠপোষকতার জোরে টিকে থাকতে চান।

 

দিনদিন যে পরিস্থিতি হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে পুতিনের কৌশলগুলো শেষ হয়ে আসছে, আর তার বিপদগ্রস্ত মিত্র বেলারুশের স্বৈরশাসক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর তো পথই শেষ হয়ে এসেছে।

 

এ দুই নেতাই ক্ষমতায় এসেছিলেন যে বিশৃঙ্খলায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে তা থেকে স্বস্তির প্রতিশ্রুতি দিয়ে। পুতিন তার দেশের নাগরিকদের একটা চুক্তির প্রস্তাব করেছিলেন: রাজনীতি থেকে দূরে থাকুন, সুশাসন এবং ভালো মজুরি পাবেন। লুকাশেঙ্কো সোভিয়েত ধাঁচের শাসন ব্যবস্থাই ধরে রাখার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

 

তবে রুশ প্রেসিডেন্ট একদিক থেকে ভাগ্যবান- তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর তেলের দাম বেড়েছে, যার ফলে দেশটির সাধারণ মানুষজন উপকৃত হয়েছে। দিনশেষে পুতিন দাঁড় করিয়েছেন একটি মাফিয়া রাষ্ট্র আর লুকাশেঙ্কো পুরোনো ধাতের একনায়কতন্ত্র। দুই নেতাই পোষ্য গণমাধ্যম ব্যবহার করে নিজের শক্তিশালী ভাবমূর্তি দেখানোর চেষ্টা করছেন।

 

এ সপ্তাহেই লুকাশেঙ্কো হেলিকপ্টারে চড়ে বা হাতে একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে তাকে উৎখাতে কথিত পশ্চিমা ষড়যন্ত্র মোকাবিলার মহড়া দিয়েছেন। তবে এ দু’টি দেশের কোনও সরকারপ্রধানই নিজেদের বদলাতে চান না। টেলিভিশনের ভাষণে তারা মুখে মুখে পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেও যখনই সেটা বাস্তবে করার কথা আসে, তখনই বদলে যায় অবস্থাটা।

 

পুতিন গত দুই দশক ধরে সোভিয়েত ও জারসিস্ট সাম্রাজ্যের অতীত গৌরব এবং প্রাচুর্য্যের কাল্পনিক চিত্র দেখিয়ে চলেছেন। গুজবের পথিকৃৎ তার সরকার। তারাই ট্রল ফ্যাক্টরি আবিষ্কার করেছে, এমন মিডিয়া পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে বলা হয় ‘কোনও কিছুই সত্য নয়, আবার সব কিছুই সম্ভব’।

 

অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি পুতিন ও লুকাশেঙ্কো উভয়ই তাদের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের কারোরই যোগ্য উত্তরসূরি নেই।

 

লুকাশেঙ্কো তবুও শেষমুহূর্তে তার ১৫ বছরের ছেলেকে খুঁজে বের করেছেন, কিন্তু পুতিন এত সহজে কাউকে আনতে পারছেন না। এ কারণে চলতি বছরই তিনি সংবিধান পরিবর্তন করে ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার ব্যবস্থা করেছেন, যখন তার বয়স হবে ৮৪ বছর।

 

বিপরীতে, অ্যালেক্সি নাভালনি আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিতব্য আঞ্চলিক নির্বাচনে পুতিনবিরোধীদের ভোট টানতে ব্যস্ত ছিলেন। রাশিয়ায় যদি বেলারুশের মতো বড় কোনও আন্দোলন হতো, তবে তিনিই হতেন সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। সেক্ষেত্রে তাকেও মঞ্চ থেকে সরিয়ে দেয়া হতে পারত।

 

নাভালনিকে বিষপ্রয়োগই প্রমাণ করে যখন এধরনের শাসনব্যবস্থায় নতুন কোনও উপায় না পাওয়া যায়, তখন তারা সহিংসতার আশ্রয় নেয়। বেলারুশ ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, অস্ত্র হিসেবে সহিংসতার ব্যবহার কতটা কঠিন।

 

লুকাশেঙ্কো বিক্ষোভকারীদের গ্রেফতার ও নির্যাতনের মাধ্যমে দমনের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি শুধু তাদের আরও বেশি উৎসাহিতই করেছে এবং সরকার পক্ষকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।

 

লুকাশেঙ্কো না পারলেও চতুর পুতিন ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক শক্তি ব্যবহার বিক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। এ কারণেই ক্রেমলিন খবারোভস্কে বিক্ষোভকারীদের স্পর্শ করেনি এই আশায় যে, তারা ধীরে ধীরে হয়তো আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তবে এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লে পুতিনের হিসাবও হয়তো একইরকম হতো।

 

অন্য দেশগুলো এ বিষয়ে কী করতে পারে? এর প্রথম উত্তরই হচ্ছে, মানবাধিকার রক্ষার নীতি মেনে চলা। জার্মানি ইতোমধ্যেই নাভালনিকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।

 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র বেলারুশের বিতর্কিত নির্বাচনের ফলাফলে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছে। এর জন্যই প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে পশ্চিমাদের গোপন অভিযান বলে প্রচার করতে পারে মিনস্ক এবং মস্কোর প্রোপাগান্ডাধারীরা।

 

যদিও সাধারণ লোকজন তা বিশ্বাস করে না। বেলারুশে কোনওধরনের শক্তি প্রয়োগ হলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কথা জানিয়ে রাশিয়াকে সতর্ক করা উচিত বাইরের শক্তিধর দেশগুলোর। পুতিন এবং লুকাশেঙ্কো হয়তো নৈতিক, আইনী অথবা কূটনৈতিক কোনও বিধিনিষেধেই সংযত হবেন না, তবে বিরোধীদের রক্ত ঝরালে অবশ্যই তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।