আজ ১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধুর হৃদস্পন্দনে বাঙালি

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বাংলার মাটি ও মানুষের নাড়ির সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলার মানুষের ভালোবাসা, সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও বাংলার মানুষের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা, বিশ্বাস।

 

এ কারণে তিনি কখনোই ভাবতে পারেননি তাঁর ওপর, তাঁর পরিবারের ওপর এ রকম নারকীয়, জঘন্য, বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর মতো মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার মতো অকৃত্রিম শক্তি আর কোনো বিশ্বনেতার নেই। এ জন্যই হয়তো ২০০৪ সালে বিবিসির জরিপে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত-স্বীকৃত।

 

১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর কানাডীয় সাংবাদিক মার্ক গেনকে ১৪ জুলাই বঙ্গবন্ধু ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির এক নির্জন কক্ষে ‘অব দ্য রেকর্ড’ একটি সাক্ষাত্কার দেন। সেখানেও বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি বাংলার মানুষের ভালোবাসার কথা তুলে ধরেন। জাতির পিতা বলেন, ‘তারা আশা করে যে সামরিক আইন দিয়ে আমার কাছ থেকে আমার জনগণকে তারা বিভক্ত করবে। তারা আসলে বোকার স্বর্গে আছে, …আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি। তারা আমাকে ভালোবাসে। আমি তাদের জন্য দুঃখ-নির্যাতন সয়েছি। আমি নীতির প্রশ্নে লড়াই চালাচ্ছি।’

 

বঙ্গবন্ধুর বাংলার প্রত্যেক মানুষকে আমার ভাবার অপরিসীম মমত্ববোধ ছিল, মমত্ববোধ ছিল বাংলার প্রতি। ৭ই মার্চের ভাষণেও আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু কোনো নেতা হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেননি। অগ্নিঝরা ৭ই মার্চের ভাষণের শুরুই করেছেন ‘ভায়েরা আমার’ দিয়ে।

 

৭ই মার্চের ভাষণে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের আমলে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বলেন, ‘আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’ শান্তিপূর্ণ হরতালে ইয়াহিয়া বাহিনীর আক্রমণ নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘কী পেলাম আমরা? আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে—তার বুকের উপরে হচ্ছে গুলি।’

 

বঙ্গবন্ধু ভাষণে আরো উল্লেখ করেছিলেন, ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে হরতালে আক্রমণ ও নিরীহ মানুষ হত্যার পর টেলিফোনে কথা বলেছিলেন। টেলিফোনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরিবের ওপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের ওপর গুলি করা হয়েছে। কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন।’

 

১০ তারিখ রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স করতে চেয়েছিলেন ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলেছিলেন, ‘কিসের রাউন্ড টেবিল, কার সাথে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসবো?’ ‘রক্তের দাগ শুকায় নাই, আমি ১০ তারিখ বলে দিয়েছি, ঐ শহীদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না।’

 

জাতির পিতা কখনোই প্রধানমন্ত্রিত্ব চাননি, তিনি এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাংলার আপামর জনগণকে প্রাণাধিক ভালো বাসতেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙ্গালি-ননবাঙ্গালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই।’

 

বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চে গ্রেপ্তারের পূর্বমুহূর্তে যখন খবর পেয়েছিলেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। প্রাণের ভয় না করেও বঙ্গবন্ধু সেদিন ৩২ নম্বরের বাড়ি ছেড়ে যাননি। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের বক্তব্যে বলেন, ‘ভায়েরা আমার, যাওয়ার সময় আমাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। তাজউদ্দীন, নজরুলেরা আমাকে ছেড়ে যায়। আমি বলেছিলাম সাত কোটি বাঙালির সাথে মরতে আমাকে ডেকো না। আমি আশীর্বাদ করছি ওরা কাঁদছিল। আমি বলি তোরা চলে যা আমার আস্থা রইলো। আমি এই বাড়িতে মরতে চাই। এটাই হবে বাংলার জায়গা, এখানেই আমি মরতে চাই। ওদের কাছে মাথানত করতে আমি পারবো না।’

 

৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু। ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ লন্ডন ও ভারত হয়ে বঙ্গবন্ধু বিজয়ীর বেশে বাংলায় ফিরে আসেন। এই দিনটি ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। পাকিস্তানের জেলে থাকতে কোর্ট মার্শালে বঙ্গবন্ধুর বিচারে ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু যে সেলে বন্দি ছিলেন তারই পাশে কবর খোঁড়া হয়। বঙ্গবন্ধু তখনো বীরদর্পে বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও কোনো আপত্তি নাই। মৃত্যুর পরে তোমরা আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে পৌঁছে  দিও। এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে।’

 

বঙ্গবন্ধুকে কোর্ট মার্শালে বিচার করে সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ফাঁসির আদেশ দিয়ে দিয়েছিলেন। ১১ আগস্ট ১৯৭১ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী গান্ধী বঙ্গবন্ধুর প্রাণ রক্ষার জন্য বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানান। ১২ আগস্ট ভারতের পার্লামেন্ট জানান, সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি কার্যকর করলে পুরো বিশ্ব তার প্রতিক্রিয়া জানাবে। অতঃপর ইয়াহিয়া খান, ভুট্টো ও জেনারেল আকবর বঙ্গবন্ধুকে তাঁদের কাছে হাজির করান। করমর্দনের জন্য ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘দুঃখিত, ও হাতে বাঙালির রক্ত লেগে আছে, ও হাত আমি স্পর্শ করবো না।’

 

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের সোনালি দিনগুলো এই বাংলা ও বাংলার মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে দিয়ে গেছেন। দেশে ফিরে তাঁর বক্তব্যে সে ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘আমি আজ বাংলার মানুষকে দেখলাম, বাংলার মাটিকে দেখলাম, বাংলার আকাশকে দেখলাম, বাংলার আবহাওয়াকে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই, আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি। বোধ হয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।’

 

বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস আর ভালোবাসা ছিল সাগর-মহাসাগরসম। যখনই তাঁর নিরাপত্তার বিষয়ে কেউ তাঁকে সাবধান হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই দৃঢ়ভাবে তা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘ওরা আমার লোক। ওরা আমাকে হত্যা করতে পারে না। এমনকি খুনিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, কী ভেবেছ তোমরা? তোমরা কি ভেবেছ পাকিস্তান আর্মি যাঁকে হত্যা করতে পারেনি। তোমরা তা পারবে?’

 

কী অকুণ্ঠ বিশ্বাস আর ভালোবাসা ছিল বঙ্গবন্ধুর বাংলার মানুষের প্রতি।
লন্ডনে একদল সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি একটি নতুন জাতির পিতা। আপনার যোগ্যতা কী?
ঈষত্ হেসে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমার যোগ্যতা, আমি আমার মানুষকে ভালোবাসি।
আর আপনার অযোগ্যতা?
সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেন, আমি তাদেরকে একটু বেশি ভালোবাসি। বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রতিটি কথা গবেষণার বিষয়, যা এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। বাংলার মানুষের অধিকার চাই।’ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এই একটি উক্তি যদি চিরকাল গবেষণা করি তা-ও তা পর্যাপ্ত হবে না। যথার্থই বলেছেন অন্নদাশঙ্কর রায়—‘যতকাল রবে পদ্মা মেঘনা গৌরী যমুনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।’

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ ও সাবেক ট্রেজারার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া