আজ ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

যেভাবে চীনা কোম্পানির ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হবে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ করোনার আয়ুষ্কাল আট মাস শেষ হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে গোটা দুনিয়াই এখন অপেক্ষায়। কার আগে কে কার্যকর ভ্যাকসিন বিশ্ববাসীকে উপহার দেবে- এ নিয়ে চলছে চেষ্টা।

 

এর মধ্যে ভাইরাসটি প্রতিরোধে বিশ্বে টিকা তৈরি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বেশকিছু দেশ। বাংলাদেশেও চীনের ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

 

এখন শুধু অপেক্ষা কবে শুরু হবে ট্রায়াল। চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাকের টিকার বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ট্রায়ালের কাজটি করবে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআরবি।

 

প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কোভিড-১৯’র চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত সাতটি হাসপাতালের নিজ থেকে আগ্রহ প্রকাশকারী ৪ হাজার ২০০ জন স্বাস্থ্যকর্মী বাছাই করে তাদের এই ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হবে। যত দ্রুত সম্ভব তা শুরু করার জন্য উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

 

দুই মাসের মধ্যে উল্লিখিত স্বাস্থ্যকর্মী বাছাই করে এই সময়ের মধ্যেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের কাজটা শেষ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এর পরে ছয় মাস তাদের পুরোপুরি পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের শারীরিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে।

 

ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বুঝতে একটা লম্বা সময় প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। আইসিডিডিআর,বি’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কে জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আমরা যত দ্রুত সম্ভব ট্রায়াল শুরু করতে চাই। ঢাকার সাতটি কোভিড হাসপাতাল থেকে আমরা ভলান্টিয়ার নেবো।

 

বাংলাদেশে ট্রায়ালের পদ্ধতি: আইসিডিডিআরবি’র কর্মকর্তারা বলেছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেভাবে পরীক্ষা চালানো হয়েছে, সেই নিয়ম অনুসরণ করে বাংলাদেশের জন্য একটা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।

 

যাদের ওপর ট্রায়াল চালানো হবে, তাদের একদলকে দেয়া হবে করোনাভাইরাস প্রতিষেধক উপাদানসহ আসল টিকা। আরেকদলকে এমন কিছু দেয়া হবে, যাতে আসল টিকার কোনো উপাদান থাকবে না (যেটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় প্ল্যাসিবো বলা হয়)।

 

কিন্তু কাউকেই জানানো হবে না কাদের আসল টিকা আর কাদের প্ল্যাসিবো দেয়া হচ্ছে। দু’টি দলকেই পর্যবেক্ষণে রাখা হবে ছয় মাস। এজন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি টেলিমেডিসিন ইউনিট ইতিমধ্যেই গঠন করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা তা চালু থাকবে। ট্রায়ালে অংশ নেয়া দুই দলের প্রত্যেকের সঙ্গে টেলিমিডিসিন ইউনিট নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে।

 

তাদেরকেও বলা হবে, তাদের শরীরে ছোট-বড় কোনো সমস্যা দেখা দিলেই তা সেই ইউনিটকে সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে পরামর্শ নিতে। যাদের আসল টিকা দেয়া হবে এবং টিকার আসল উপাদান যাদের শরীরে প্রয়োগ করা হবে না-এই দুই দলের প্রত্যেকের শরীরে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে-সে সব তথ্য নিয়ে প্রত্যেক সপ্তাহে পর্যালোচনা করা হবে।

 

এ ব্যাপারেও একটা বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করবে। এই বিশেষজ্ঞ কমিটির পর্যালোচনা রিপোর্টের মাধ্যমে টিকার কার্যকারিতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত আসবে। কর্মকর্তারা বলেছেন, টিকা প্রয়োগ শুরু হওয়ার পর থেকে পর্যবেক্ষণের শেষ সময় পর্যন্ত এই পুরো সময়কে গুরুত্ব দিয়ে অনেকগুলো বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করবে। এই সময়ে অংশগ্রহণকারীদের শরীর নিরাপদে আছে কিনা-সেটাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নজরদারিতে রাখা হবে।

 

আইসিডিডিআরবি’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কে জামান এই পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ট্রায়ালের মূল দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে ট্রায়ালের বিষয়ে বলেন, ঢাকায় করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত সাতটি হাসপাতালে নিজ থেকে আগ্রহী স্বাস্থ্য কর্মীদের মাঝে এই ট্রায়াল চালানো হবে। প্রোটোকল যেটা অনুমোদন হয়েছে, তাতে আমরা বলেছি, ঢাকার সাতটি কোভিড হাসপাতাল থেকে আমরা ভলান্টিয়ার নেবো।

 

এই ভলান্টিয়াররা হবেন চিকিৎসক, নার্স এবং ওয়ার্ড অ্যাটেনডেন্ট। এই স্বাস্থ্য কর্মীদের ৪ হাজার ২০০ জনকে আমরা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ট্রায়ালের জন্য নেবো। তিনি আরো বলেছেন, যাদের বাছাই করা হবে, তাদের অবশ্যই স্বেচ্ছায় আসতে হবে। কারণ টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কেউ নিজে থেকে আগ্রহী না হলে জোর করে প্রয়োগ করা যায় না। ড. কে জামান জানিয়েছেন, চীনা কোম্পানি এক লাখ ভ্যাকসিনসহ ট্রায়ালের সব খরচ দেবে।

 

এখন তারা সেই ভ্যাকসিন এবং যন্ত্রপাতি আনার ব্যবস্থা নেবেন। তিনি আরো বলেন, ভ্যাকসিন প্রয়োগের জন্য তিনশ’ জনের মতো লোক নিয়োগ করে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এখন এই ব্যবস্থাগুলোর কাজ তারা শুরু করবেন। এই প্রস্তুতিপর্বে কিছুটা সময় লেগে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সেজন্য তারা সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারছেন না। তিনি বলেন, আমরা যত দ্রুত সম্ভব ট্রায়াল শুরু করতে চাই।

 

দুই মাসের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী বাছাই করে এই সময়ের মধ্যেই ভ্যাকসিন প্রয়োগের কাজটা শেষ করতে চাই। এর পরে ছয় মাস তাদের পুরোপুরি পর্যবেক্ষণে রেখে তাদের শারীরিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা বুঝতে একটা লম্বা সময় প্রয়োজন হবে।

 

কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রায়ালের পুরো কাজ করবে আইসিডিডিআরবি। তাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা তারা নেবে। আইসিডিডিআর,বি জানাচ্ছে অল্প সময়ের মধ্যে ট্রায়াল শুরু করার চেষ্টা করা হবে, তবে সুনির্দিষ্ট সময় এখনই তারা জানাতে পারছেন না।

 

সাতটি হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মীদের নিয়ে ট্রায়াল করা হবে। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এই হাসপাতালের বার্ন ইউনিট, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিট-২, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং ঢাকা মহানগর হাসপাতাল।

 

গত ১৮ই জুলাই চীনের তৈরি করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি)। বিষয়টি ৪০ দিন ঝুলে থাকার পর ২৬শে আগস্ট সরকারের পক্ষ থেকে ট্রায়ালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসে।