আজ ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

শরীরে যেসব প্রভাব দেখা দিতে পারে করোনার ফলে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ করোনাভাইরাস সংক্রমিত রোগীর শরীরে সাধারণত জ্বর, শীত শীত অনুভূত হওয়া, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট, মাংসপেশী-মাথা-গলা ব্যথা, ঘ্রাণ ও স্বাদের অনুভূতি লোপের মত তাৎক্ষণিক ও স্বল্পমেয়াদী উপসর্গ দেখা দেয়। তবে করোনার দীর্ঘমেয়াদী কোনো প্রভাব আছে কি-না তা নিয়ে চলছে নিরন্তর গবেষণা।

 

কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠার পরও অনেক মানুষ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। ইংল্যান্ড, চীন, জাপান, কোরিয়া ইত্যাদি দেশে বেশ কয়েকটি জরিপে করোনার বেশ কতগুলো দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেখা গেছে। করোনা সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পরও এই যে দীর্ঘস্থায়ী বিবিধ প্রভাব শরীরে থেকে যাচ্ছে, তাকে এককথায় ‘লং কোভিড’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। মানবদেহে করোনার এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবকে শারীরিক ও মানসিক দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

 

দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক প্রভাব: করোনাভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গগুলো সাধারণত দুটি কারণে প্রকট হয় বলে মনে করা হয়। একটি হলো- শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত কমে যাওয়ার দরুণ এবং অপরটি হলো- সাইটোকাইন স্টর্ম। করোনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের জন্যও কারণ দুটিকে দায়ী বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফুসফুসের পাশাপাশি মস্তিষ্ক, বৃক্ক, যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড প্রভৃতিও করোনার জটিলতার শিকার হতে পারে।

 

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, যেসব ব্যক্তি মৃদু সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের চেয়ে মাঝারি ও তীব্র সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীর দীর্ঘমেয়াদী জটিলতায় ভোগার সম্ভাবনা বেশি। করোনাভাইরাস ফুসফুসে ভাইরাল নিউমোনিয়া সৃষ্টি করে, যা প্রাথমিকভাবে প্রশমিত করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ফুসফুসে পালমোনারি ফাইব্রোসিসের মত জটিলতা তৈরি করতে পারে। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘমেয়াদে রোগী স্থায়ী ও মারাত্মক শ্বাসকষ্ট, কাশি, ক্লান্তিবোধ, সক্ষমতা হ্রাস ইত্যাদিতে ভুগতে পারেন।

 

গত মার্চ মাসে চীনে এক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, সেরে ওঠা ৭০ জন করোনা রোগীর মধ্যে ৬৬ জনেরই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও ফুসফুসে নানাবিধ সমস্যা রয়ে গেছে। গুরুতর অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার ছয় সপ্তাহ পরও ইংল্যান্ডে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের ফুসফুস স্ক্যান করে দেখা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২০-৩০ শতাংশ রোগীর ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হয়েছে।

 

ফুসফুসের পরপরই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির শঙ্কাযুক্ত অঙ্গ হচ্ছে মস্তিষ্ক। একিউট হেমোরেজিক নেক্রোটাইজিং এনসেফালোপ্যাথি, মেনিনজাইটিস কিংবা স্ট্রোকের মত জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে আক্রান্তের মস্তিষ্ক। এসব জটিলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে রোগীর খিঁচুনি, স্মৃতিভ্রষ্টতা, প্যারালাইসিস ইত্যাদিও হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘসময় ধরে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম থাকলে মস্তিষ্কেও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়, যা পরবর্তীতে রোগীর বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চতর স্নায়বিক কার্যকলাপে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।

 

পাশাপাশি করোনা সংক্রমণে বৃক্ক ও হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে পড়লে দীর্ঘমেয়াদেও তা বিরূপ শারীরিক প্রভাব ফেলে। ফালমিনেন্ট মায়োকার্ডাইটিস এরকম একটি জটিলতা, যা হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে পড়ার সূচনা করতে পারে। বৃক্ক ও হৃৎপিণ্ড শরীরের গুরুত্বপূর্ণ দুটি অঙ্গ, যা বিকল হয়ে গেলে শরীর ফুলে যাওয়া ও শরীরে বর্জ্যপদার্থ জমতে থাকার মত অসুবিধা তৈরি হয়। এথেকে উত্তরণের জন্য ডায়ালাইসিস কিংবা আক্রান্ত অঙ্গ প্রতিস্থাপনেরও প্রয়োজন হতে পারে।

 

করোনা থেকে সেরে ওঠার পরও যদি কারো মাঝে ১৬টি লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে ব্রিটিশ গবেষকরা লং কোভিডের ব্যাপারে তাদের সতর্ক থাকতে উপদেশ দিয়েছেন। ব্রিটেনের প্রতি চারজন করোনা রোগীর একজন চুলপড়ার মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন। করোনা থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তিদের নিয়ে করা একটি অনলাইন জরিপে দেখা গেছে, ১৫০০ মানুষের মধ্যে ২৭ শতাংশের চুল পড়ে গেছে। আবার করোনা থেকে সেরে ওঠার পরও অনেক মানুষের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হতে বেশ সময় লাগছে। এটি কিন্তু চিন্তার বিষয়।

 

তাপমাত্রা সাধারণত ৩৭.৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড অথবা এর বেশি হলে তাকে জ্বর বলা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে এ সীমা ৩৬.৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। অন্যদিকে করোনাকালীন কিংবা পরবর্তী সময়ে অনেক আক্রান্ত ব্যক্তিরই ডায়রিয়া হচ্ছে। অনেক সময়ই সাধারণ ওষুধে এটি কমছে না। এ ছাড়া ভাইরাস পরবর্তী ক্লান্তি বা ক্রোনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোম তথা মায়ালজিক এনসেফালোমায়েলাইটিস এবং বুকে ব্যথাও চিন্তার কারণ হতে পারে।

 

বিশেষ করে যারা হাসপাতালে ভেন্টিলেটরে ছিলেন, তাদের বুকে ব্যথা আরও বেশিদিন থাকে। লং কোভিডে ভুক্তভোগী রোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো অনিদ্রা। তবে এটি শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি মানসিক কারণেও হতে পারে। এ ছাড়াও শিশুদের ক্ষেত্রে ‘কোভিড টো’ পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেখানে পায়ের আঙুলের পাতায় ফোসকা এবং রক্তবর্ণ ক্ষত দেখা দেয়, যা সাধারণত প্রদাহজনিত কারণে হয়ে থাকে। পাশাপাশি শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, দিক বুঝতে সমস্যা হওয়া, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, শরীর ব্যথা, বুক ধড়ফড়, বমি-বমি ভাব এবং হৃৎপিণ্ডের ছন্দপতন হওয়া ইত্যাদিও লং কোভিডের উপসর্গ হিসাবে দেখা যাচ্ছে।

 

দীর্ঘমেয়াদী মানসিক প্রভাব: করোনা আক্রান্তকালীন ভীতি এবং মানসিক ট্রমা ও চাপ থেকে পরবর্তীতে দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদ, পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, এমনকি পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারের মত দীর্ঘকালীন প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারেন করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে যাওয়া ব্যক্তি। এ ছাড়া হ্যালুসিনেশনও লং কোভিডের একটি লক্ষণ। এক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি মনে মনে ভাবেন একটা আর দেখেন আরেকটা কিংবা খাবারের ঘ্রাণ যা মনে করেন, ঘ্রাণ পান তার উল্টো। অর্থাৎ বিভিন্ন শারীরিক প্রভাবের পাশাপাশি সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক মানসিক প্রভাবেও ভুগতে পারেন লং কোভিডে ভুক্তভোগী ব্যক্তি।

 

লং কোভিডে ভুক্তভোগী হলে অযথা দুশ্চিন্তা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রাথমিক করোনা সংক্রমণের লক্ষণগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার পর অথবা করোনা টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ আসার পরও অনেকদিন পর্যন্ত যদি লং কোভিডের এ ধরনের উপসর্গ বিদ্যমান থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্যসম্মত, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, অস্বাস্থ্যকর কিংবা সেকেন্ডারি জীবনযাপন পদ্ধতি পরিহারকরণ এবং রুটিনমাফিক চলতে পারলে উপকার পেতে পারেন। নিয়মিত ব্যয়াম অনুশীলন এবং আমলকি, কমলা, কামরাঙা, পেয়ারা, কলা ইত্যাদি ফল গ্রহণ ও কচুশাক, কাঁচকলা, ডুমুর, পর্যাপ্ত ডিম, দুধ ইত্যাদি খেলে এসব উপসর্গ থেকে অনেকটাই রেহাই পাবেন।