আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

করোনার ভ্যাকসিন কবে পাবে বাংলাদেশ

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ অ্যান্টিবায়োটিক এবং ভ্যাকসিন—অধুনা চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই প্রধান আবিষ্কারদ্বয় প্রাণঘাতী রোগব্যাধি থেকে সুরক্ষাপূর্বক পৃথিবীতে মানুষের গড় আয়ু বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছে। সময়মতো ও নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে শিশু, জীবনসংহারক বহু মারাত্মক সংক্রামক অসুখ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছে।

 

করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত বিশ্ব ‘করোনা ভ্যাকসিন’ আয়ত্তে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছে। এ কথা ঠিক যে একটা নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন করোনা গ্রাস থেকে মানুষের জীবন বাঁচানোর প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, এনে দিতে পারে স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্য।

 

ডিসেম্বর ২০১৯, চীনের উহান থেকে সৃষ্ট করোনাভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ১১ মার্চ ২০২০-এ রোগটিকে অতিমারি হিসেবে ঘোষণা দেয়। এর পর থেকে বিশ্বব্যাপী গবেষকরা এর প্রতিষেধক তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। জানুয়ারিতে সার্স কোভ-২ জিনোমের ডিসফেরিংয়ের পদক্ষেপ এবং মার্চ মাস থেকে মানুষের মধ্যে করোনার প্রথম ভ্যাকসিন সুরক্ষা পরীক্ষা শুরু হয়। এ পর্যন্ত ১৬৫টির বেশি করোনা ভ্যাকসিন প্রকল্প সচল রয়েছে, তার মধ্যে ২৭টি টিকা মানব ট্রায়ালে যুক্ত আছে। এই সুদীর্ঘ যাত্রায় কিছু ভ্যাকসিন সফলতা পাবে, কিছু কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না-ও পেতে পারে। মূলত একটা সঠিক টিকা পেতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। কিন্তু এই অতিমারিতে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা ট্রায়ালের কিছু ফেইজ সংযুক্তভাবে সম্পন্ন করে দ্রুততার সঙ্গে কভিড ভ্যাকসিন মানুষের কাছে পৌঁছাতে প্রাণপণে সচেষ্ট রয়েছেন।

 

ল্যাব থেকে ক্লিনিক পর্যন্ত একটা ভ্যাকসিনের বিকাশচক্রে নানান ধাপ থাকে, এগুলো যথাক্রমে :
১. ইঁদুর বা বানর—এ ধরনের প্রাণীতে ভ্যাকসিনটা রোগ প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি করে কি না তার প্রাথমিক প্রাকৃতিক পরীক্ষা করে দেখা।
২. অল্পসংখ্যক লোকের ওপর ধাপ—
—নিরাপদ ট্রায়াল—যাতে করে টিকার ডোজ ও নিরাপদ ব্যবহারের ধারণা মেলে।
—এরপর শিশু ও বয়স্কদের নানা গ্রুপে বিভক্ত করে দ্বিতীয় ধাপের বিস্তৃত পরীক্ষা।
—হাজারো মানুষে, বিভিন্ন দেশ, জাতি-গোষ্ঠীতে ভ্যাকসিন ও প্লেসেবোপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবীদের ওপর তৃতীয় ধাপের কার্যকর পরীক্ষা।
—পরবর্তী সময়ে প্রতিটি দেশ পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে টিকাদানের অনুমোদন প্রাপ্তি দেয়। যেমন—জুনে এফডিএ ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিষেধক হিসেবে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ মানুষকে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করতে পারলে সে ভ্যাকসিন উপযুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
কভিড টিকা তৈরিতে যেসব ধরন গৃহীত হয়েছে

 

জেনেটিক ভ্যাকসিন : এখানে করোনাভাইরাসের কোনো জিন বা জিনের অংশবিশেষ ব্যবহার করে অ্যান্টিবডি সিস্টেম উদ্দীপিত করা হয়, মেসেঞ্জার আরএনএ বা ডিএনএ ব্যবহারপূর্বক। আমেরিকার মোদার্না এর একটি, যা ফেইজ ৩ ট্রায়ালে যুক্ত।

 

ভাইরাল ভেক্টর ভ্যাকসিন : এতে শিম্পাঞ্জির মধ্যে এডিনো ভাইরাস প্রবেশ করিয়ে ইমিউনোলজিক্যাল প্রসেসিং করা হয়েছে, অ্যাসট্রোজেনিকা-অক্সফোর্ড হিসেবে যা খ্যাতি পেয়েছে। এ-ও তৃতীয় ধাপে বেশ প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত নিয়ে অবস্থান নিয়েছে ।

 

প্রোটিন ভিত্তিক ভ্যাকসিন : যেখানে করোনা অণুজীবাণুর কোনো প্রোটিন কাজে লাগিয়ে টিকা তৈরি করা হয়। চীন, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি—এসব দেশ এ ধরনের টিকা নিয়ে প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্বে আছে।

 

পুরো নিষ্ক্রিয় ভাইরাস টিকা : ভারত, চীন এ নিয়ে তৃতীয় ধাপে রয়েছে। অক্সফোর্ড ট্রায়ালে যুক্ত হওয়া ছাড়া ভারতে কো-ভ্যাকসিন ও জেড্যিলা নামের নিজস্ব দুটি ভ্যাকসিন চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে। আর চীনের একটা টিকা এরই মধ্যে মানব শরীর প্রয়োগের কথা শোনা যাচ্ছে। রাশিয়া অক্টোবর মাসে সারা দেশে করোনা ভ্যাকসিন প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে।

 

মহামারি বিশ্বে করোনা টিকা আগেভাগে হস্তগত করার জন্য উন্নত দেশগুলো প্রাক-উত্পাদন অর্ডার দিয়ে রেখেছে। জানা যায়, দ্রুত টিকা জোগানোর তাগিদে অক্সফোর্ড ও কিছু করোনা ভ্যাকসিন এরই মধ্যে উত্পাদিত করে রাখা আছে, যাতে সফল পরীক্ষা ফলাফল পাওয়া গেলে সময়ক্ষেপণ না করে টিকার জোগান দেওয়া যায়।

 

যদিও অনেক বিশ্বনেতা উত্পাদিত টিকা ‘বিশ্বের জনগণের’—এরূপ বিবেচনাপূর্বক প্রায়োরিটি ও সমতার নীতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন। তবুও অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, প্রতিটি দেশের সরকার নিজ দেশের স্বাস্থ্যকর্মী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনসাধারণের দ্রুত সুরক্ষা দিতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকে এই বছরের মধ্যে ভ্যাকসিন জোগাড়ে তত্পর হয়ে উঠবে।

 

এ অবস্থায় বাংলাদেশ কত তাড়াতাড়ি এগোতে পারে তা বিচার্য বিষয়। দেশের এক ওষুধ সংস্থা ‘গ্লোবাল বায়োটেক’ দেশে করোনা টিকা আবিষ্কারে উদ্যমী হয়েছে। চীনের সিনোব্যাক, যা একটা পুরো নিষ্ক্রিয় ভাইরাস ভ্যাকসিন, তা নিয়ে আইসিডিডিআরবির তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যুক্ত হওয়ার পথে।

 

জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহৎ দেশগুলোর অন্যতম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পথচলা সুগম করে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে করোনা টিকা প্রদান এর অন্যতম উপায়। দেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কভিড সংক্রমণ থেকে আগেভাগে সুরক্ষা প্রদানও এতে সম্ভব হবে।

 

আমাদের করণীয়
বাংলাদেশ ত্বরিত করোনা টিকা পেতে চাইলে যা করা দরকার, তা হলো :
১. বিশ্বে অগ্রসরমাণ টিকাগুলো নিজ দেশে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যুক্ত করা।
২. দেশীয় ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে করোনা টিকা তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ।
৩. বিশ্ববাজারে করোনা টিকা আসার সঙ্গে সঙ্গে তা সংগ্রহের যথাযথ কর্মকৌশল অবলম্বন।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যসচিব মহোদয়, সব বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন জানিয়ে ট্রায়ালে যুক্ত হওয়া ও বাজারে আসা করোনা টিকা সংগ্রহের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বরাবরের মতো সঠিক সময়ে করোনা ভ্যাকসিন প্রাপ্তির সফল মিশনে বাংলাদেশ জয়ী হবে, এটাই আমাদের সবার প্রত্যাশা ও প্রার্থনা।

লেখক : অধ্যাপক সাবেক বিভাগীয় প্রধান, শিশু স্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
[email protected]