আজ ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

দর কেজি ৮০ বড় রুই-কাতলার, ছোট মাছ ২০ টাকা!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ হাঠাৎ করে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার হাটবাজারে মাছে সয়লাব। কেউ মাছ কিনতে কেউ দেখতে জটলা করছেন। আবার হাটে মাছ কেনার জন্য মাইকিংও করা হয়েছে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে। তবুও এসব মাছের তেমন ক্রেতা মেলেনি হাটে। অনেক মাছ ব্যবসায়ী ও চাষিদের মাছ বিক্রি না হওয়ায় বাজারেই পঁচে গেছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আক্কেলপুর পৌরসরের কলেজ বাজার এবং রেলগেট এলাকার চিত্র ছিল এটি। তবে আজ বৃহস্পতিবার সকালে সেই চিত্র ছিল উল্টো। বাজারে তেমন মাছ আমদানি না থাকায় বাজারদর ছিল আগের মতই।
বাজারে রুই-কাতলাসহ বিভিন্ন মাছে বাজার সয়লাব। সাধারণত বড় আকৃতির মাছ কেজিপ্রতি ১৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকার নিচে মেলে না। সেখানে এদিন এমন মাছের দর চাওয়া হচ্ছিল মাত্র ২৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা। আর ছোট আকৃতির মাছের ক্রেতাই তেমন মেলেনি।

মাছ চাষি ও মৎস্য বিভাগের ভাষ্য, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পুকুর ও বিলের পানিতে হঠাৎকরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দিয়েছে। এতে ব্যাপক হারে মাছ মরে গেছে। ফলে প্রচুর মাছ বাজারে চলে আসায় দামে ধস নামে। সব মিলিয়ে বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন মাছ চাষিরা।

স্থানীয় মাছ চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরেই ভ্যাপসা গরম পড়ছে। এর মধ্যে আবার গত মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) সকাল নয়টার পর থেকে সারা দিন হালকা বৃষ্টি হয়। ফলে পানিতে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। পানির উপরে ভেসে অক্সিজেন নিতে গিয়ে মাছ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অবস্থা বেশি খারাপ হলে মারাও যায়। আক্কেলপুরের পুকুরগুলোতে হঠাৎ করে গত মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত এমন ঘটনাই ঘটতে থাকে। এতে ব্যাপক হারে মাছ মরে পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। অনেকে পানিতে রশি দিয়ে টানা দিয়ে বা সাঁতার কেটে অক্সিজেন বাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনোভাবেই রেহাই মেলেনি। অবস্থা বেগতি দেখে মাছচাষিরা মরা ও আধমরা মাছ দ্রুত পুকুর থেকে তুলে স্থানীয় বাজার ও আড়তে আনতে শুরু করেন। মুহুর্তের মধ্যে ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পরে। এর পর নদীতেও হুমড়ি খেয়ে লোকজন নেমে পরে মাছ ধরতে। গত বুধবার সকাল থেকেই বাজারে পুকুর ও নদীর বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর মাছ উঠে যাওয়ায় দামে ধস নামে। সব মিলিয়ে উপজেলায় মাছ চাষিদের দুই কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন চাষিরা।

সরেজমিনে গত বুধবার (২ অক্টোবর) সকালে আক্কেলপুর পৌরসদরের কলেজ বাজার হাটে গিয়ে দেখা গেছে, বাজারে সস্তায় বিভিন্ন মাছ বিক্রি করতে দেখা যায়। বড় রুই-কাতলা মিলছিল ৮০ টাকা থেকে ১৮০ কেজি দরে, যা একদিন আগেই ছিল ২০০-৩০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। বিভিন্ন যাতের খুচরা মাছ একদিন আগে (গত মঙ্গলবার) প্রতি কেজি ছিল ৩০০-৪০০ টাকা সেই মাছ (গত বুধবার) ২০-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। বাজারে অন্য দিনের তুলনায় লোকসমাগমও ছিল চোঁখে পড়ার মতো।

পৌরসদরের কালেজ বাজারের মেসার্স জাহাঙ্গীর মৎস্য আড়তের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, গত মঙ্গলবার রাত থেকেই বিভিন্ন এলাকার মাছ চাষিরা আমাকে ফোন করেন মাছ বিক্রি করার জন্য। কিন্তু বুধবার ভোর থেকেই বাজারে প্রচুর মাছ আমদানী হতে থাকে। বেশীর ভাগ খামারি চাষিদের মাছ মরা ও অসুস্থ হয়ে পড়া ছিল। কিন্তু প্রচুর মাছ বাজারে উঠে যাওয়ায় পরে আর ক্রেতা পাননি মাছ চাষিরা। পরে শুধু খুচরা ব্যবসায়ীরা কিছু মাছ কিনেছেন। তাঁরা চাষিদের নামমাত্র দাম দিয়েছেন।

আওয়ালগাড়ি গ্রামের সাগর হোসেন নামে এক ক্রেতা বলেন, বুধবার সকালে বাজার করতে হাটে এসেছিলাম। দেখি বাজারে প্রচুর মাছ উঠেছে। তার ৮০ টাকা কেজি দরে বড় রুই, জাপানি, বড় বাটার পাঁচ কেজি মাছ কিনেছি। এর আগে কখনও এতো সস্তায় কোন দিন মান কিনতে পারিনি।

নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার গয়েসপুর গ্রামের মৎস্যচাষি শাহিন হোসেন বলেন, ভাপসা গড়ম আর মঙ্গলবারে সারা দিনের পানিতে রাত থেকেই দেখি পুকুরের মাছ সব ভেসে উপরে উঠে দ্রুত বাতাস নিচ্ছে। রাত গভীর হতেই দেখি অবস্থা আরো বেশি খারাপ হতে থাকে। এর মধ্যে মাছও মারা যেতে থাকে। তাই রাতেই দ্রুত মাছ ধরি। বুধবার সকালে আক্কেলপুর কলেজ বাজারে ৮ মণ মাছ নিয়ে আসি। ক্রেতা না পেয়ে অনেক যে মাছ আগে বিক্রি করেছিলাম ১৬ হাজার টাকা মণ, সেই মাছ মাত্র ৬ হাজার টাকা মণে বিক্রি করে এসেছি।

মাছ চাষি নুরুল হোসেন ও ইসরাফিল বলেন, বাজারে যে মাস ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকায় বিক্রি হতো সেই মাছ ৮০ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে এমন বড় লোকসানের মুখে এর আগে কখন পরিনি।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ বৃষ্টি আর ভাবসা গড়ম এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। এতে পুকুর ও বিলের মাছ মরে গেছে। তবে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে চাষিদের বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তা অনুসরণ করায় আশা করছি দুই এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।