আজ ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

হত্যাসহ বহু অভিযোগ পিতা-পুত্রের বিরুদ্ধে, প্রতারণার শিকার পুলিশ কর্মকর্তাও

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ  বাবা-ছেলে মিলে গড়েছেন অভিনব এক প্রতারক চক্র। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সেনা ও পুলিশ প্রধানসহ বিশিষ্টজনদের নাম ভাঙিয়ে করেছেন প্রতারণা। তারা এতটাই পারদর্শী যে, পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অঙ্কের টাকা। হত্যাসহ বহু অভিযোগের পর অনুসন্ধান শুরু করেছে পুলিশ।

 

হত্যা, অপহরণসহ একাধিক মামলায় কারাভোগের পর গোলাম মোস্তফা আদর ও গোলাম মোহাম্মদ কালু নামে এই পিতা-পুত্র এখন জামিনে। রাজশাহী রেঞ্জে কর্মরত এসপি বেলায়েত হোসেনও তাদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। উলটো বেলায়েত হোসেনের বিরুদ্ধেই তারা মামলা করেছে।

 

তাকে ঢাকায় বদলি করে দেওয়ার কথা বলে আদর এসপিকে ফোন করে বলেন, আপনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ফোন করছেন, সবচেয়ে শক্ত তদবির হচ্ছে। আপনার এই বদলি এবার কোনোভাবেই ঠেকবে না। কিছুদিন পর নিজের অসুস্থতার কথা জানিয়ে ঐ পুলিশ সুপারের কাছে ১০ লাখ টাকা ধার চান আদর। অসুস্থতার প্রমাণ দিতে একটি ছবিও পাঠান। বেলায়েত হোসেন তাকে ৫ লাখ টাকা ধার দেন। টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় টালবাহানা। উলটো পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে করেন মামলা, রটাতে থাকেন নানা ধরনের কুত্সা।

 

পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন বলেন, গত কোরবানির ঈদের সময় ধারের ৫ লাখ টাকা শোধ করার কথা ছিল। কিন্তু দেয়নি। পরে এই টাকা চাইলে আমাকে হুমকি দিয়ে উলটো আমার বিরুদ্ধে মামলা করে দিয়েছে।

 

পুলিশ প্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপিসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে গোলাম মোস্তফা আদর বহু মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তাদের সম্পর্ক আছে সেটা বোঝাতে ফেসবুকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তার বাবার ছবিও পাঠিয়ে দেন।

 

গত বছরের ৭ নভেম্বর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মইনুল হক। ১৯ অক্টোবর গ্রেফতার হন উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারিকুজ্জামান রাজীব। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে খাতির থাকার কথা বলে তাদের জামিনে বের করে দেওয়ার জন্য হাতিয়ে নেন কয়েক লাখ টাকা।

 

সাবেক কাউন্সিলর মইনুল হকের স্ত্রী জাহানারা বেগম রেখা বলেন, আমার স্বামীকে বের করে দেওয়ার জন্য প্রথমে ৩০ লাখ টাকা চায়। পরে ১৫ লাখ টাকা চায়। এরপর বিশ্বাস করে আমরা তাদের কিছু টাকা দেই। কোনো কাজও করেনি, টাকাও ফেরত দেয়নি। এই পিতা-পুত্র অনেক নারীকেও ব্লাকমেইল করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

 

অর্থমন্ত্রীর মেয়েকে দিয়ে তদবির করিয়ে ১০ কোটি টাকা ঋণের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন এক ব্যবসায়ীকে। গোলাম জিলানী চৌধুরী টিপু নামে ঐ ব্যবসায়ী বলেন, প্রাথমিকভাবে ১০ লাখ টাকা খরচের জন্য দরকার বললে আমি বিশ্বাস করে তাদের টাকা দিয়ে ফেঁসে গেছি।

 

নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় এই পিতা-পুত্রের পৈত্রিক বাড়ি ছিল। আট বছর আগে তাদের বাড়িটা ঋণের দায়ে নিলাম হয়। এলাকাবাসীও জানালেন, তারা পিতা-পুত্র খারাপ লোক। পালিয়ে এলাকা ছেড়েছে। এখনো এলাকায় প্রচুর মানুষ তাদের খুঁজছে। অনেকেই টাকার জন্য তাদের খোঁজে।

 

২০১৫ সালে উত্তরা থেকে বেসরকারি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র আসিফ ইমরানকে অপহরণ করা হয়। পরে মুক্তিপণ না দেওয়ায় তাকে খুন করা হয়। ইমরানের মরদেহ মেলে বুড়িগঙ্গায়। মামলায় প্রধান আসামি করা হয় আদর ও তার বাবাকে। গ্রেফতার হন, স্বীকারোক্তিও দেন। এখন জামিনে। নিহত আসিফের বাবা লুত্ফর রহমান বলেন, বুড়িগঙ্গা থেকে নৌপুলিশ তার ছেলের লাশ উদ্ধার করে। এই কালু শুধু টাকার জন্য এই কাজগুলোই করে। লুত্ফর রহমান ছেলের হত্যার কঠোর শাস্তি চান ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মশিউর রহমান বলেন, আসলে কারো সঙ্গেই এদের সম্পর্ক নেই। এরা ভুঁইফোঁড়, প্রতারক। এদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এদের দ্বারা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। গোলাম মোস্তফা আদর দাবি করেন, তারা ষড়যন্ত্রের শিকার। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। এসপির বিরুদ্ধে মামলা করায় এখন তাদের ফাঁসানো হচ্ছে।