আজ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশে হিন্দু নারীদের উত্তরাধিকার আইন

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ১৯৩৭ সালের হিন্দু আইনানুযায়ী মেয়েরা কোন সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নয়। তবে বিধবা হওয়ার পর সন্তান নাবালক থাকা অবস্থায় শুধুমাত্র বসতি বাড়ির অধিকারী হয়।

 

দীর্ঘ ৮৩ বছরেও হিন্দু আইনে আর কোন পরিবর্তন হয়নি। গত ১ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টে রায় ঘোষণা করা হয়েছে, হিন্দু বিধবা নারী স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে, তবে অর্পিত সম্পত্তি কোন প্রকার বিক্রি, হস্তান্তর যোগ্য নয়। শুধু ভোগদখলকৃত বলে গণ্য হবে।

 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হিন্দু মেয়েরা অবহেলিত, অবলা। তাদের কোন পরিচয় নেই। জন্মের পর উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার স্থাবর-অস্থাবর কোন সম্পত্তির উত্তরাধিকারী নয়। বৈবাহিক সূত্রে স্বামীর বাড়িতেও স্থাবর-অস্থাবর কোন সম্পত্তির অধিকার নেই।

 

এমনকি সন্তানের কোন সম্পত্তির অধিকারও তাদের নেই। সময়ের চাকায় ভর করে বিশ্ব পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের সুযোগ-সুবিধার কথা মাথায় রেখে পরিবর্তিত করা হয়েছে অনেক নিয়ম। নতুন করে তৈরি হয়েছে আইন-কানুন। সতীদাহ থেকে বিধবা বিবাহ এমনকি নারী শিক্ষায়ও এসেছে পরিবর্তন।

 

অবিভক্ত ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার পর হিন্দু জনগোষ্ঠীর একটা অংশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান এক সময় স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। স্বাধীন দেশে রচিত হয়েছে নতুন সংবিধান। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এ দেশের সংবিধানে কতো আইন বাতিল হয়েছে। কতো আইন সংযোজন হয়েছে।

 

কতো হয়েছে সংশোধন। কিন্তু হিন্দু নারী আইন সংশোধন হবার মতো এ দেশে একটি মানুষও জন্মায়নি। একজন রানী রাসমনী, একজন বিদ্যাসাগর, একজন রাজা রামমোহন এদের কারোই এত বছরে পূর্নজন্ম হয়নি। তাই হিন্দু মেয়েদের মানুষ হিসাবে প্রকাশ করার মতো দুটি কথা, কেউ বলেনি। কোন আইনজীবী রিট করেনি আদালতে। এত বছরেও হিন্দু পুরুষদের কাছে এ দেশের মেয়েরা দাসী ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনি।

 

নারী নিয়ে সারা বিশ্ব যখন তোলপাড়। নারী অগ্রাধিকার নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যখন গর্বকরা হয়। এ দেশের পার্লমেন্ট প্রধান, স্পিকার, বিরোধীদল নারী। যখন বিশ্ব পার্লামেন্টে নারী শাসকের দৃষ্টান্ত হিসেবে মাননীয় প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপস্থাপন করা হয়। ঠিক সে সময়েও এ দেশের অন্ধকার আইনে হিন্দু নারীরা দিনের পর দিন নিস্পেষিত হচ্ছে।

 

পার্শ্ববর্তী হিন্দু দেশ ভারত এবং নেপাল দুই দেশেই তাদের নারী উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করেছেন। তাহলে বাংলাদেশের হিন্দু আইন এখনও কেন সনাতন প্রথা মেনে হচ্ছে? এ দেশের হিন্দু আইনে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন পাস হলেও তা সর্বত কার্যকর হচ্ছে না। বর্তমান ডিজিটাল সময়ে হিন্দু মেয়েদের বিয়ে হয় শুধু অগ্নিসাক্ষী করে সাতপাক ঘুরে মালাবদল আর সিঁথিতে সিঁদুর দানের মাধ্যমে।

 

বিয়ের পর সকল মেয়ের ভাগ্যে স্বামী সুখ জোটে না। তবু সারাজীবন মুখ বুজে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। বাংলাদেশের হিন্দু পরিবার এখনো গর্ব করে বলে, এ দেশে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ হয়না। কখনোকি এই বিষয়টির সত্যতা খুঁজে বের করেছে কেউ? মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি পায়ের তলায় মাটি। শুন্যে ভেসে কখনো কোন কিছুর বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না।

 

একটি হিন্দু মেয়ে বাবা-ভাইয়ের সংসারে কিংবা স্বামী-সন্তানের সংসারে গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকে। হিন্দু মেয়েদের নিজের বলতে কোন সম্পদ বা সম্পত্তি নেই বলে সারাজীবন অবহেলিত হয়ে বেঁচে থাকে।

 

স্বাধীনতার এত বছরেও বাংলাদেশে কোন হিন্দু নারী পর্লামেন্টে যায়নি। কোন হিন্দু নারী প্রথা ভেঙ্গে নিজের অধিকার নিয়ে রাজপথে শ্লোগান দেয়নি। এর কারণ মেয়েটি অসহায়। তার নিজের কোন পরিচয় নেই।

 

অধিকাংশ হিন্দু পরিবার মেয়েকে শিক্ষা দেয়া হয়, ভাল একটি ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেবে বলে। আগের দিনে তবু মেয়ের বিয়েতে যৌতুক হিসেবে কিছু অর্থ খরচ করা হতো। অন্তত পক্ষে আর যা-ই হোক মেয়েটি কিছু সোনার গহনা উপহার হিসাবে পেত।

 

এই গহনাগুলোই ছিল মেয়েটির নিজের সম্পত্তি। সরকার যৌতুকপ্রথা বন্ধ করার পর মেয়েরা সে সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। এখন এ দেশের হিন্দু মেয়ে মানে সস্তা, কানাকড়িও মূল্য নেই।

 

জন্মের পর থেকে একটি হিন্দু মেয়ে শোনে, বাবার সংসারে তার কোন সম্পত্তির ভাগ নেই। তাই বিয়ে হওয়া পর্যন্ত তার ভরণ পোষনের দায়িত্ব বাবা বা ভাইয়ের। আবার বিয়ে হয়ে শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার পর সেই মেয়েটি শুনতে পায়, আমৃত্যু ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নেবে স্বামী।

 

হিন্দু সামজে, একটি মেয়ে মানে একটি গলগ্রহ। বিয়ে হয়ে স্বামীর ঘরে যাবার সময় মায়ের আঁচলে চাল ছিটিয়ে, বলে যায় আজ থেকে তোমার সব ঋণ শোধ করে দিলাম। অর্থাৎ এ বাড়ির সাথে সব ধরনের সম্পর্ক শেষ করার রীতি পালন করে, মেয়েটি পর হয়ে যায়।

 

পরবর্তীতে বাপের বাড়ি নিয়ে কোন কথা বলতে গেলে বাবা-মা-ভাই তাকে বলে, বিয়ে হয়ে গেছে নিজের সংসার নিয়ে চিন্তা কর। সত্যি কি মেয়েটি বিয়ের পর নিজের একটা সংসার পায়?

 

সেখানেও শ্বশুরবাড়ির মানুষ বলবে, আমরা এখনো বেঁচে আছি, তোমার এত কথা কিসের? শ্বশুর বা স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেরাও ঠিক একই কথা বলে, আমাদের সংসার আমরা বুঝবো। মেয়েটির নিজের আর সংসার পাওয়া হয় না।

 

অসহায়ত্ব নিয়ে যে মেয়েটি বেড়ে ওঠে, সে মেয়েটি কতোটুকুইবা সামনে যেতে পারে। ভয় থাকে প্রতি পদে পদে, যদি কোন কিছু হয়, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো। এই দাঁড়ানোর জায়গা, আশ্রয়হীনতার ভয় মেয়েটিকে সারাজীবন কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।

 

সে মননে, চলনে, বলনে প্রগতিশীল হতে পারে না। তাকে আশ্রয়হীনতার শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা হয়েছে। পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো পর্যন্ত যেতে যেতে, মেয়েটি তার স্বাধীনতার কথা ভুলে যায়। কারণ মেয়েটি জীবনের সবচেয়ে বাঁধনহীন সময়গুলি গন্ডির মধ্যে আটকে থেকেছে, তাই স্বাধীনতা পেয়েও উড়তে পারে না।

 

ধরে নেই, একটি মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিয়ের পর মেনে এবং মানিয়ে নিতে গিয়ে তাদের একটি সন্তান হয়ে গেল। অবশেষে মেনে নিতে ব্যর্থ হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ নয়, আলাদা বসবাসের সিদ্ধান্ত নিল দুজন।

 

অথবা স্বামী আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস করতে শুরু করল। মেয়েটির কোন রোজগারের ব্যবস্থা নাই। তখন মেয়েটি কি করবে? মেয়েটির পিতার সম্পত্তির অধিকার নাই, স্বামীর সম্পত্তির অধিকার নাই।

 

যদিওবা মেয়েটি পিতার বাড়িতে আশ্রয় নেয়, তাহলে তাকে সারাজীবন অবহেলা, লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা সহ্য করে জীবন-যাপন করতে হবে। আর যদি স্বামীর বাড়িতে শ্বশুর-শাশুড়ির আশ্রয়ে থাকে, সেখানেও একই অবস্থা।

 

নতুন যে আইন পাস করে আদালত দৃষ্টন্ত স্থাপন করার চেষ্টা করেছেন, সে বিষয়ে কি ভাবছি আমরা? একটি নারী বিধবা হওয়ার পর স্বামীর সম্পত্তির অধিকারী হবে। লিখিত নয়, শুধুমাত্র ভোগ করতে পারবেন।

 

তাহলে কি ধরে নেবো, কোন নারীর যদি সম্পত্তির অধিকারী হওয়ার বাসনা মনে থাকে, তাহলে তাকে বিধবা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে? অথবা কোন নারী সংশোধীত আইনের সম্পূর্ন ব্যাখ্যা না বুঝে স্বামীকে হত্যা করে।

 

তাহলে আদালত কি ওই নারীকে শাস্তি দেবেন? কারণ আদালতের আইন নারীকে তখনই সম্পত্তির অধিকার দেবেন, যখন একটি নারী বিধবা হবে। আদালত যদি নারীকে বিধবা হওয়ার আইন তৈরি করে থাকেন, তাহলে নারীরও অধিকার আছে বিধবা হওয়ার। এই আইনের পরিমার্জন বা পরিবর্ধন হবে কি না মাননীয় আদালত? লেখক : ইরানী বিশ্বাস, সাংবাদিক, নাট্যকার ও পরিচালক।