আজ ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মিয়ানমারের দুই সেনা আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের হেফাজতে!

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দুই সদস্য বর্তমানে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটরের দপ্তরের হেফাজতে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই দুই সদস্য হলেন মিয়ো উইন তুন (৩৩) ও য নিং তুন (৩০)। তাঁরা সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক ভিডিও বার্তায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ২০১৭ সালে হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, গণকবর দেওয়াসহ গুরুতর অপরাধ সংঘটনের কাজে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।

দ্য হেগে তাঁদের সাম্প্রতিক উপস্থিতি রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর জেনোসাইড, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের বিচারের পথে বড় টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে, আইসিসির প্রসিকিউটরের চলমান তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি এনে দিতে পারে মিয়ানমারের এই দুই সদস্যের স্বীকারোক্তি।

ভিডিওতে মিয়ো উইন তুন বলেছেন, তাঁর কমান্ডিং অফিসার তাঁদের আদেশ দিয়েছিলেন, ‘যা দেখবে, শুনবে সব গুলি করে শেষ করে দাও’। আর তা মেনে তিনি ৩০ জন রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যায় অংশ নেন। এরপর তিনি সামরিক ঘাঁটি ও ওয়াচ টাওয়ারের কাছে তাদের গণকবর দেন।

প্রায় একই সময় কাছাকাছি টাউনশিপে ছিলেন য নিং তুন। তিনি বলেন, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা তাঁদের ব্যাটালিয়নের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ পালন করেছিলেন। তাঁদের ওপর আদেশ ছিল, ‘শিশু বা বৃদ্ধ যাদের দেখতে পাবে মেরে ফেল।’ য নিং তুন বলেন, ‘আমরা প্রায় ২০টি গ্রাম খালি করে গণকবর দিয়েছি।’

মিয়ানমারের এই দুই সেনা সদস্য যে ধরনের অপরাধ সংঘটনের বর্ণনা দিয়েছেন তার সঙ্গে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্ণনার মিল পাওয়া যায়।

মানবাধিকার সংগঠন ফরটিফাই রাইটসের প্রধান নির্বাহী ম্যাথু স্মিথ বলেছেন, মিয়ানমারের ওই দুই সেনা সদস্য বর্তমানে দ্য হেগে আছেন—এটি বিশ্বাস করার মতো কারণ তাঁদের কাছে আছে। কিন্তু আইসিসির মুখপাত্র মিয়ানমারের ওই দুই সেনার আইসিসির হেফাজতে থাকার ভাবনা নাকচ করেছেন।

একটি গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দ্য হেগে যোগাযোগ করা হলে আইসিসির প্রসিকিউটরের দপ্তর জানায়, গত বছরের ১৪ নভেম্বর আইসিসির বিচারকরা অনুমোদন দেওয়ার পর প্রসিকিউটর ফাটু বেনসুডা বাংলাদেশ-মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেন। সেই অনুসন্ধান এখনো চলছে। অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গোপনীয়তা। এটি না হলে প্রসিকিউটরের দপ্তর যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে না। প্রসিকিউটরের দপ্তর চলমান অনুসন্ধান ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার কোনো কিছু সম্পর্কে মন্তব্য করে না। এটি কেবল অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার সততাই নয়, এর সঙ্গে অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তি, সাক্ষী ও প্রসিকিউটরের দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যও প্রয়োজন। আইসিসির প্রসিকিউটরের দপ্তর কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান শুরুর পর থেকেই তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে বিভিন্ন সূত্র থেকে নৃশংস অপরাধের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছে। অনুসন্ধান পরিচালনাকারীরা সেই তথ্য-প্রমাণ সতর্কভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেন। এমন কী হয়েছিল যাতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে চলে আসতে হয়েছে—সেই সত্য তাঁরা অনুসন্ধান করতে চান।

অনুসন্ধান শেষে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ যদি আইনি ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত হয় তবে প্রসিকিউটর নৃশংস অপরাধ সংঘটনের প্রমাণ আছে এমন যে কাউকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করতে বিচারকদের অনুরোধ জানাবেন। প্রসিকিউটরের দপ্তর যখন অনুসন্ধানের বিষয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেবে এবং যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো অগ্রগতি হবে তখন তারা জনগণকে জানাবে। প্রসিকিউটরের দপ্তর স্বাধীন অনুসন্ধানের বিষয়ে জনগণের জানার আগ্রহের প্রশংসা করে। তবে এর আগে উল্লিখিত কারণগুলোর কারণে প্রসিকিউটরের দপ্তরকে এই অনুসন্ধানকাজ পুরোপুরি গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে। মিয়ানমার বাহিনীর ওই দুই সদস্য কিভাবে আইসিসি পর্যন্ত পৌঁছেছেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে কয়েক মাস আগে মিয়ানমার বাহিনীর সঙ্গে গৃহযুদ্ধরত গোষ্ঠী আরসার হেফাজতে তাঁরা রোহিঙ্গাদের নির্মূলে অভিযান চালানোর বিষয়ে আলাদা ভিডিও বার্তায় স্বীকারোক্তিমূলক বিবৃতি দিয়েছিলেন। দ্য হেগের সূত্রগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (সিবিসি) বলেছে, গত আগস্ট মাসেই ওই দুই সেনা তাঁদের সুরক্ষার জন্য বাংলাদেশ সীমান্তে এসেছিলেন।

জেনোসাইড সনদ লঙ্ঘনের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস, সংক্ষেপে আইসিজে) গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবী পায়াম আখাভান সিবিসিকে মিয়ানমারের ওই দুই সেনা প্রসঙ্গে বলেছেন, তাঁদের পরিচয় কী বা কোথায় নেওয়া হয়েছে, তা তিনি প্রকাশ করতে পারছেন না।

তবে তিনি বলেছেন, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সহিংসতা যে মিয়ানমারের সামরিক অধিনায়কদের সরাসরি আদেশে হয়েছে সে বিষয়ে তাঁরা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দিয়েছেন। আর এর ফলে আইসিসি সংবিধির আওতায় বাধ্যবাধকতা হিসেবে বাংলাদেশ দ্য হেগে আইসিসির প্রসিকিউটরকে জানিয়েছে। তাঁরা এখন আর বাংলাদেশে নেই।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আরসার প্রকাশ করা ভিডিও বার্তার ব্যক্তিরাই বাংলাদেশ সীমান্তে এসেছিলেন কি না তা নিশ্চিত করেননি পায়াম আখাভান। তিনি বলেন, এ ধরনের অসংখ্য ব্যক্তি গণনৃশংসতায় অংশ নিয়েছিলেন।

পায়াম আখাভানের মতে, অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের ওই দুই সেনার বক্তব্যের সত্যতা মিললে প্রমাণ হবে যে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বা বিপথগামী কিছু সেনার অপকর্ম ছিল না। বরং তা সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

জানা গেছে, ভিডিও বার্তায় মিয়ানমারের ওই দুই সেনা তাদের যে পরিচয় দিয়েছেন তার সত্যতা মিলেছে। তাদের সামরিক ইউনিটগুলো রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে চিহ্নিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, মিয়ানমার আইসিসির সদস্য নয়। আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার মিয়ানমার অস্বীকার করেছে। তবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে আইসিসি সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশের মাধ্যমে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার বিচারিক এখতিয়ার আইসিসির আছে। আইসিসির প্রসিকিউটরের দপ্তর কোন প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়েছে এবং এই গণবাস্তুচ্যুতির মাধ্যমে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার অনুসন্ধান করছে। আইসিসি ব্যক্তি বিশেষের অপরাধের বিচার করতে পারে; অন্যদিকে রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে।