আজ ১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

যেভাবে রক্তে সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণে রাখবেন

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ডায়াবেটিস একটি স্বাস্থ্য সমস্যা যেখানে রক্তে গ্লুকোজের (শর্করা) পরিমাণ খুব বেশি থাকে। কারণ শরীর এটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারে না।

পাঁউরুটি, ভাত, আলু, রুটি, মিষ্টি আলু ও কাঁচকলার মত শর্করাযুক্ত খাবার, চিনি ও অন্যান্য মিষ্টি খাবার হজম হয়ে তা থেকে গ্লুকোজ উৎপন্ন হয় এবং যকৃত থেকেও তা পাওয়া যায় যা গ্লুকোজ উৎপাদন করে।

ইনসুলিন জীবনের জন্য অপরিহার্য। এটি হল অগ্ন্যাশয়ের দ্বারা উৎপাদিত একটি হরমোন, যা গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, যেখানে এটি শরীরের দ্বারা শক্তির জন্য ব্যবহৃত হয়।

ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণগুলো হল তেষ্টা বেড়ে যাওয়া, সবসময় টয়লেট যাওয়া (বিশেষতঃ রাতে), অত্যন্ত বেশি ক্লান্তি, ওজন কমে যাওয়া, জননাঙ্গে চুলকানি অথবা পায়ে ক্ষত ও ঝাপসা দৃষ্টির নিয়মিত পর্ব।

টাইপ১ ডায়াবেটিস দেখা দেয়, যদি শরীর কোন ইনসুলিন উৎপাদন করতে অক্ষম হয়। এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত ৪০ বছর বয়সের আগে দেখা দেয়। এর চিকিৎসা করা হয় ইনসুলিন ইনজেক্‌শন ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এবং নিয়মিত শরীরচর্চার পরামর্শ দেওয়া হয়।

টাইপ১ ডায়াবেটিস দেখা দেয় যখন অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন-উৎপাদনকারী কোষগুলো নষ্ট হয়ে যায়। কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না যে এটা কেন হয়, তবে কোষগুলোর ক্ষতি খুব সম্ভবতঃ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া যা কোনো ভাইরাস বা অন্য সংক্রমণের দ্বারা সূচনা হতে পারে। টাইপ১ ডায়াবেটিস কখনও কখনও বংশ পরম্পরায় চলে, যা জিনগত প্রভাবের ইঙ্গিত করে। এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত অল্পবয়স্ক মানুষদের প্রভাবিত করে।

টাইপ২ ‘পরিপক্বতার সূচনার’ ডায়াবেটিস। কারণ এটা সাধারণতঃ মধ্যবয়সী বা বয়স্ক মানুষদের মধ্যেই দেখা যায়, যদিও এটা কখনও কখনও এবং ক্রমশঃ বেশি পরিমাণে অল্পবয়সীদের মধ্যেও ঘটে। টাইপ ২ ডায়াবেটিস দেখা দিলেও শরীর তখনও কিছুটা ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে, কিন্তু তার পরিমাণ যথেষ্ট হয় না, অথবা তখন উৎপন্ন হওয়া ইনসুলিন যথাযথভাবে কাজ করে না (ইনসুলিন প্রতিরোধ নামে পরিচিত)।

এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত ৪০বছরের বেশি বয়সের ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা দেয়, যদিও এটা ৪০ বছর বয়সের আগেও হতে পারে। যাদের ওজন খুব বেশি, বিশেষত তাদের ক্ষেত্রে টাইপ২ ডায়াবেটিস দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে। এটা বংশগতভাবে চলতে থাকে এবং দক্ষিণ এশীয় ও আফ্রিকান-ক্যারিবিয়ান সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বেশি সাধারণভাবে দেখা যায়, যেখানে এটা সাধারণত ২৫ বছরের বেশি বয়সের মানুষদের মধ্যে দেখা যায়।

শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ট্যাবলেট, ই্নসুলিন ইনজেক্‌শনের মাধ্যমে টাইপ২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করা হয়। উভয় ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য হল যথাসম্ভব স্বাভাবিকের কাছাকাছি রক্তের গ্লুকোজ ও রক্তচাপের মাত্রা অর্জন করা।

সুস্থ জীবনশৈলীর সঙ্গে একসাথে এটি সুস্থতার উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করে এবং চোখ, কিডনি, স্নায়ু, হৃদপিন্ড ও প্রধান ধমনীগুলোর দীর্ঘকালীন ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।

কিছু ব্যক্তি টাইপ২ ডায়াবেটিসকে ভুলভাবে ‘হালকা’ ডায়াবেটিস হিসেবে বর্ণনা করেন। হালকা ডায়াবেটিস বলে কোনো জিনিস নেই। সব ডায়াবেটিসকেই গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত, নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত এবং যথাযথভাবে চিকিৎসা করা উচিত।

ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়টি হল, ওষুধ, শরীরচর্চা এবং খাওয়া-দাওয়া নিয়ম মেনে করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু তা কোনোভাবেই পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব নয়। ডায়াবেটিস এমন একটি রোগ যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অসুস্থতা বাড়িয়ে তোলে।

রক্তে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে শরীরে কী ধরনের সমস্যা হয় তা সম্পর্কে আমরা কমবেশি সকলেই অবগত।

সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে শরীরে সুগার বেড়ে যাওয়ার প্রধান লক্ষণগুলো চেনা অত্যন্ত জরুরি। এই লক্ষণগুলো চিনতে পারলেই ডায়াবেটিসে আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব। শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে ঠিক কী কী লক্ষণ প্রকাশ পায়।

চিকিৎকদের মতে শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে তা কিডনিতে চাপ সৃষ্টি করতে থাকে শরীর থেকে সুগার বের করে দেওয়ার জন্য। সে কারণেই ঘন ঘন প্রস্রাব পায়।

হাত ও পায়ের আঙুল বা পুরো হাত অবশ বোধ করা শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান লক্ষণ। পরিস্থিতি মারাত্মক পর্যায়ের চলে গেলে এই লক্ষণ প্রকাশ পায়।

খুব অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা শরীরে সুগারের মাত্রা বৃদ্ধির লক্ষণ। সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে শরীরে পানির ঘাটতি হয়। আর ডিহাইড্রেশনের ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।

যখন শরীর থেকে সুগার বের করে দেয়ার জন্য কিডনিতে চাপ পড়ে তখন ঘন ঘন প্রস্রাব পায়। আর তখন কিডনি শরীরের কোষ থেকে ফ্লুইড নিতে থাকে। এতে শরীরে পানির ঘাটতি হতে থাকে, যার ফলে ঘন ঘন পানি খাওয়ার তেষ্টা পায়।

শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে দৃষ্টিশক্তির উপর। এর ফলে দৃষ্টিশক্তি ঘোলাটে হয়ে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়।

ডায়েট বা ব্যায়াম না করেই হুট করে অনেক বেশি ওজন কমতে থাকা শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে না পারলে রক্তের সুগারের মাত্রা বেড়ে যায়। এ কারণে ডায়াবেটিস ঘটে। নিয়মিত ওষুধ সেবন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এগুলোর পাশাপাশি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি মেনে দেখতে পারেন।

করল্লা
তিন থেকে চারটি করল্লা নিন। এবার ভেতরের বীজগুলো ফেলে করল্লা ব্ল্যান্ডারে দিয়ে জুস তৈরি করুন। নিয়মিত এই জুস খাওয়া রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে উপকারি।

আমলকি
প্রতিদিন দুই বেলা ২০ মিলিলিটার করে আমলকির জুস খাওয়া ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য ভালো। এ ছাড়া প্রতিদিন দুই বেলা আমলকির গুঁড়াও খেতে পারেন। এটি রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।

গ্রিন টি
এই ভেষজ চা পেনক্রিয়াসের কার্যক্রম বাড়িয়ে ইনসুলিন তৈরিতে সাহায্য করে। তাই রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত গ্রিন টি পান করতে পারেন।

নিম
নিম আরেকটি চমৎকার উপাদান রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে। প্রতিদিন দুই থেকে তিনটি নিমের পাতা খালি পেটে খান। এটি ইনসুলিন তৈরিতে সাহায্য করে। এটি ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথির রোগীদের জন্য একটি উপকারি ঘরোয়া উপায়।

আমপাতা
আমপাতার সাহায্যেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব রক্তের সুগার লেভেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাকটিন, ভিটামিন সি এবং ফাইবার সমৃদ্ধ আমপাতা ডায়াবেটিস এবং কোলেস্টেরল— উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত উপকারী। এই উপাদানগুলো রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। আমপাতার রস (ম্যাঙ্গিফেরিন) এনজাইম আলফা গ্লুকোসিডেসকে বাধা দেয় এবং এটি অন্ত্রের কার্বোহাইড্রেট বিপাক ক্রিয়া হ্রাস করতে সাহায্য করে। তাই রক্তে বাড়তে পারে না শর্করার মাত্রা।

শরীরের কোনও অংশে কেটে বা ছড়ে গেলে তা না শুকানো এবং শুকাতে অনেক বেশি সময় লাগার বিষয়টিও শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। এই সব লক্ষণ দেখা গেলে অবহেলা না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিত্সকের পরামর্শ মেনে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া উচিত।