আজ ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

চীন-ভারত সংঘাতে ভারকে সমর্থন করবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়?

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: জুনে গালওয়ান উপত্যকায় চীন-ভারত সীমান্ত সংঘাতের পর, ভারত বারবার চীনের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিক দিয়ে ভারত চীনের চেয়ে পিছিয়ে। তাহলে কেন চীনকে উস্কানি দেয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে ভারত?

 

এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ভারত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, চীন যুদ্ধ শুরু করতে বা যুদ্ধের দিকে পরিস্থিতি ধাবিত করার উদ্যোগ নিতে অনিচ্ছুক। এই কারণেই ভারত সীমান্ত এলাকায় ছোট পরিসরে উস্কানিতে লিপ্ত। ভারত বিশ্বাস করে যে, এই ধরণের ছোট ছোট ঝামেলায় চীনের বিরাট সামরিক শক্তি কাজ করতে পারবে না।

চরম জাতীয়তাবাদে আচ্ছন্ন নরেন্দ্র মোদি সরকার ও ভারতীয় সেনাবাহিনীকে এখন চীনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান দেখাতেই হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে শক্তি থাকুক আর না থাকুক, তাদেরকে শক্ত হতেই হবে। নয়া দিল্লি দৃশ্যত নিশ্চিত যে চীন কোনো বড় আকারে সামরিক সংঘাতে যাবে না। এ কারণেই দেশটি সাহস দেখাতে তৎপর।ভারত যুদ্ধ শুরুর অঙ্গভঙ্গি করছে।

 

তবে এই ধরণের অঙ্গভঙ্গি করতে গিয়ে ভারতের যা অর্জন হবে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতিই হবে। কারণ সামরিক নাড়াচাড়ার জন্যও অনেক সম্পদ ব্যয় হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যাপক চাপ হয়তো ভারতের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে। ভারতের সাম্প্রতিক এসব উস্কানি বরং এই লক্ষণই প্রকাশ করে যে দেশটি আর সেই চাপ সহ্য করতে সক্ষম নয়। নয়াদিল্লি এখন বেইজিং-এর সাথে যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি করতে আগ্রহী।

 

ভারত-চীন সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে অবনতির দিকে গেছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে, যুক্তরাষ্ট্র বেশি শক্তিশালী। তাই উস্কানিও দেয় যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু চীন-ভারত সম্পর্কে, ভারত দুর্বলতর। কিন্তু তা সত্ত্বেও উস্কানিও দেয় ভারত। এটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়।

 

দেশের অর্থনৈতিক দুর্গতি ও মহামারির দিক থেকে নজর সরানোর পাশাপাশি, চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কহানির আরেকটি কারণ হলো সামগ্রিক পরিস্থিতি নয়া দিল্লির বিচার করতে না পারা। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বেশ থমথমে। পরিস্থিতি সেই ১৯৬২ সালের মতোই। ভারত তাই ভুলভাবে এই বিশ্বাস পোষণ করছে যে, তাদের সামনে একটি সুযোগ এসেছে। ভারত বিশ্বাস করে ভারতের উস্কানি নিয়ে ব্যস্ত থাকার সময় চীনের নেই, কারণ বেইজিং এখন ওয়াশিংটনকে মোকাবিলায় ব্যস্ত। ভারত এই বিভ্রান্তিতে ভুগছে যে, চীন হয়তো তাই বড় ছাড় দিতেও রাজি হয়ে যাবে।

 

ভারত আরও বিশ্বাস করে আন্তর্জাতিক পরিবেশও দেশটির পক্ষে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের সময়, চীনের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্ক খারাপ অবস্থায় ছিল। তখনও নয়াদিল্লি ভেবেছিল তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ও সহানুভুতি পেয়ে গেছে। আর এখন ভারত ভাবছে তারা রাশিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং জুনে বলেছিলেন যে, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক হলো ‘বিশেষ কৌশলগত আংশিদারিত্ব’।

 

কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিবেশ ব্যাপকভাবে পাল্টে গেছে। তা সত্ত্বেও ভারত সেকেলে কৌশলগত ভাবনায় ডুবে আছে। বস্তুতপক্ষে, চীন, ভারত ও রাশিয়ার অনেক অভিন্ন সুযোগ আছে। ব্রিকস ও সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের রূপরেখার অধীনে সহযোগিতার অনেক ক্ষেত্র আছে তিন দেশের। রাশিয়ার পক্ষে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের উস্কানিকে সমর্থন দেয়া অসম্ভব। যদিও রাশিয়া ভারতের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে, তবে এগুলো সাধারণ বিষয়। রাশিয়া এখনও আশা করে যে, চীন ও ভারত তাদের সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে পারবে। তাই নয়াদিল্লির আশাবাদী হওয়ার কোনো কারণ নেই।

 

যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের বড় সমর্থক হিসেবে ভাবা হয়। এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে জিতে নিতে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল প্রচার করে যাচ্ছে। এ কারণে নয়া দিল্লি ভাবছে যে, তাদের হাতে এখন দরকষাকষির অস্ত্র আছে অনেক বেশি।

 

কিন্তু ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা যায়? ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে সমর্থন দেয় বলে দাবি করে। কিন্তু দেখুন তারা কী করেছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একে-অপরের বিরুদ্ধে ইট-পাটকেল খেলায় জড়িয়ে গিয়েছিল। ওয়াশিংটন ভারতীয়দের জন্য বরাদ্দ এইচ-১বি ভিসা সীমিত করার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে চড়া মূল্যে। আর এই মার্কিন প্রশাসন যদি বন্ধু হতে চায় কারও, তাহলে সেই বন্ধুর কাছ থেকে লাভও ঘরে তুলতে চায় তারা। মনে হচ্ছে, ভারত এখনও এই সমীকরণ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়।

 

যদি চীন ও ভারতের মধ্যে সামরিক সংঘাত বেধেই যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভারতকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে বা অস্ত্র বিক্রি করে সহায়তা করবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারতকে সৈন্য দিয়ে সহায়তা করা সম্ভব নয়। এটি বলার অর্থ হলো, মার্কিন সমর্থন নিয়েও, ভারত চীনের বিরুদ্ধে সংঘাতে কোনো সামরিক অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে না।

 

সোমবার ভারতীয় সৈন্যরা চীনা মহড়ারত সেনাদের ওপর সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে। এরপর থেকে উত্তেজনা তুঙ্গে। যদি সীমান্ত যুদ্ধ বেধেও যায়, তবুও চীন সীমান্ত ইস্যুতে কখনওই কোনো ছাড় দেবে না। ফলে একমাত্র ফলাফল হলো দুই পক্ষই হতাহত, সম্পদ হানির পাশাপাশি আরও সংঘাতে জড়িয়ে যাবে।

 

যদি ভারতের উস্কানি সহ্যের সীমা ছাড়ায়, তাহলে চীন হয়তো অন্যান্য সংঘাত বাদ দিয়ে শুধু ভারতকে মোকাবিলায় মনোযোগী হবে। যদি ভারত চীনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সক্রিয় হয়ে আচরণ করে, তাহলে তারা হয়তো পরাজিত হবে। ভারতের উচিত আরও বুদ্ধিমান হওয়া ও চীনের বিরুদ্ধে উস্কানিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা দেওয়া বন্ধ করা। কারণ শেষ পর্যন্ত চীন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়বে না, কিন্তু ভারতের বেলায় অনেক কিছুই এত গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 

(লেখক চীনের বেইজিং ফরেইন স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমি অব রিজিওনাল অ্যান্ড গ্লোবাল গভার্ন্যান্সের জ্যেষ্ঠ রিসার্চ ফেলো ও চেংদু ইন্সটিটিউট অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স-এর প্রেসিডেন্ট। তার এই নিবন্ধ চীনের রাষ্ট্র-মালিকানাধীন গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে।)