আজ ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

করোনা কেন ফুসফুসকে আক্রান্ত করে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বেড়েই চলেছে। বেশির ভাগ মানুষ সুস্থ হয়ে উঠছেন। করোনাভাইরাসের সব থেকে খারাপ দিক হলো এই ভাইরাস শ্বাসনালী ও ফুসফুসকে সরাসরি আক্রমণ করে। এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠা কিছু মানুষের ফুসফুস অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানা যায়। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসকষ্ট, জ্বর, মাথা ব্যথা, হাঁচি, কাশির মতো সমস্যা দেখা।

 

করোনাভাইরাস কোনো জীবিত প্রাণীর শরীরের বাইরে বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে এবং বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। ভাইরাস শরীরের ভিতরে ক্ষতি করে থাকে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি যখন কাশি বা নাক ঝাড়েন তখন ভাইরাসটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যরা তা ড্রপলেটের মাধ্যমে নিশ্বাস গ্রহণ বা চোখ, নাক ও মুখের স্পর্শের মাধ্যমে ফুসফুসে সংক্রমিত হয়।

 

কিন্তু একবার যদি ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করে ফেলে তখন তা স্পাইকের মতো একটি প্রোটিন ব্যবহার করে শ্বসনযন্ত্রের কোষে থাকা অ্যাঙ্গিওটেনসিন-কনভারটিং এনজাইম ২ (এসিই-২)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়, সেটিতে প্রবেশ করে এবং এরমধ্যেই বংশ বিস্তার করে সংক্রমণ ছড়ায়।

 

এই রোগের প্রথম লক্ষণ হলো জ্বর। করোনার জীবাণু ঢোকার পর গড়ে পাঁচদিন পর জ্বর শুরু হয়। আক্রান্ত হওয়া ও লক্ষণ প্রকাশের ক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় ১৪ দিন।

 

লক্ষণ শুরু হওয়ার প্রথম তিন দিনে ভাইরাস গলার পিছন দিকে আক্রমণ করে। ফলে গলা ব্যথা ও শুকনো কাশি শুরু হয়। পরে তা শ্বাসনালীর নিচের দিকে চলে যায়। লক্ষণ দেখা দেওয়ার চার থেকে ৯ দিনে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

 

ভাইরাসটি বংশ বিস্তার করতে করতে ফুসফুসে পৌঁছায়। এতে ফুসফুসের থলিতে ছিদ্র হয়ে তা তরল দ্বারা পূর্ণ হয় এবং নিউমোনিয়ার সৃষ্টি হয়। ফুসফুসের প্রদাহের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। লক্ষণ শুরুর আট থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয়।

 

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের দাবি, ফুসফুসে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে শ্বাসতন্ত্রের কোষগুলো ফুলে ওঠে। ভাইরাস অণুগুলো ফেটে চারপাশে থাকা অন্য কোষগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে সংক্রমণ। এই সংক্রমণ দ্রুত ব্রঙ্কিওল টিউবে ছড়িয়ে যায়। এই সময় শুরু হয় গলাব্যথা আর শুকনো কাশি।

 

করোনাভাইরাস শরীরে ঢোকার পর প্রথমে শ্বাসনালি ও পরে ফুসফুসে অবস্থান করে। ভাইরাসটি ফুসফুসের ছোট্ট ছোট্ট বলের মতো জায়গায় গিয়ে আরামসে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। এতে ফুসফুসের বলগুলো নষ্ট হয়ে যেতে থাকে।

 

আক্রান্তদের পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখতে পান, এই ভাইরাসের সংক্রমণে ফুসফুসের দুই পাশের পেরিফেরিয়াল অংশে হালকা, পালতা আস্তরণ দেখা যায়। সংক্রমণ যত বাড়ে, ওই আস্তরণ ততই ঘন হয়। তখন কষ্ট আরও বাড়তে থাকে।

 

ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর গড়ে ৫ দিন পর্যন্ত সময় নেয় ও তারপর ব্যক্তির উপসর্গ অর্থাৎ, ক্লান্তি, জ্বর, কাশি, ডায়রিয়া ইত্যাদির লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে।

 

অপরপক্ষে শরীর (ইমিউন সিস্টেম) এই ভাইরাসের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে প্রাণপনে চেষ্টা করে। আমাদের নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম ক্রমাগত প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি বা যোদ্ধা সেল তৈরি করতে থাকে ভাইরাসকে পরাস্ত করতে।

 

ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির গতি অপেক্ষা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধের কোষের বংশবৃদ্ধির গতি বেশি হলে আপনি বেঁচে গেলেন। আর দুর্বল ইমিউন সিস্টেম হলে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি বেড়ে যাবে ও আপনার ফুসফুস ক্রমান্বয়ে পরাস্ত হতে থাকবে ভাইরাসের হাতে।

 

ফুসফুস পরাস্ত হতে থাকলে আস্তে আস্তে শরীরে প্রয়োজনীয় অস্কিজেনের অভাব দেখা দেয় এবং রোগী অস্কিজেনের জন্য একসময় হাঁসফাঁস করতে থাকে। পরবর্তীতে শরীরের অন্যান্য অর্গানগুলো (কিডনি, হার্ট, যকৃত, প্যানক্রিয়াস ইত্যাদি) অক্সিজেনের অভাবে একে একে অকেজো হতে শুরু করে।

 

নানা অসুখের কারণে আগেভাগেই কারো অর্গানগুলো দুর্বল হয়ে থাকলে, তার জন্য ভাইরাসটির আক্রমণের চাপ বহন করা কঠিন হয়ে পরে। তখন ভাইরাসটি রক্তে ছড়িয়ে পরে। এইবেলা তার জন্য হাসপাতালের সাহায্য বা কৃত্রিমভাবে অক্সিজেন-এর বন্দোবস্ত করার জরুরি দরকার হয়ে পরে।

 

এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কার্যকর কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। তাই নিজের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই ভরসা! সেটি শক্তিশালী হলে ভাইরাসগুলো যুদ্ধে হেরে গিয়ে মারা যাবে। জ্বর-কাশি কিছুদিন পর আপনা আপনি ভালো হয়ে যাবে, বাসায় বসেই। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৮০% আক্রান্ত মানুষ ঘরে বসেই ভালো হয়ে যায়।

 

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়াতে কিছু নিয়ম মেনে চলা উচিত। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে না যাওয়া। খাবার আগে ভালো করে হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে। অকারণে মুখে-নাকে-চোখে হাত না দেওয়া। ভিটামিন-এ জীবাণুদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে। ভিটামিন-এ যেমন গাজর, কমলালেবু, টমেটো, ডিমের কুসুম, পালংশাক, রাঙা আলু, ব্রোকোলিসহ নানা টাটকা ফল ও সবজি খাওয়া যেতে পারে। হাঁচি, কাশি, গলাব্যথা বা সর্দি-জ্বর হলে অবশ্যই আলাদা থাকা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া।