আজ ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মোবাশ্বের আলীর-সাহিত্য চেতনা

উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি ও প্রফেসর ইয়াসমিন আরা লেখক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, শিক্ষা-হিতৈষী। তিনি তার বিভিন্ন লেখনিতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে অনেক মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর রচিত বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে।

 

এবার বাংলা একাডেমি বইমেলায় তিনি ‘মোবাশ্বের আলীর সাহিত্য-চেতনা’ অনবদ্য একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা পাঠকনন্দিত হয়েছে। গ্রন্থটিতে তার গবেষণার স্ফুরণ ঘটেছে। এ ধরনের মূল্যবান গ্রন্থ যা মৌলিক কাজ হিসেবে বিবেচিত রচনার জন্য লেখককে ধন্যবাদ জানাই।

 

প্রফেসর মোবাশ্বের আলী ছিলেন একাধারে গবেষক, সাহিত্য সমালোচক, অনুবাদক এবং ভাষাসৈনিক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী প্রফেসর মোবাশ্বের আলী বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট ছিলেন, যা প্রফেসর ইয়াসমিন আরার লেখার অনবদ্য লেখনিতে ফুটে উঠেছে। মোট ৪৭টি গ্রন্থ প্রফেসর মোবাশ্বের আলী রচনা করেন। এর মধ্যে ১৪টি গ্রন্থ নিয়ে প্রফেসর ড. ইয়াসমিন আরা আলোচ্য গ্রন্থটি রচনা করেছেন।

 

‘মধুসূদন ও নজাগৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে প্রফেসর লেখায় মন্তব্য করেছেন, ‘যে উনিশ শতকে ইউরোপের সাথে সংযোগের ফলে বাংলাদেশ যে রেনেসাঁস ঘটে এরই প্রেক্ষিতে তিনি মধুসূদনকে উপস্থাপিত করেছেন। তার এ উক্তিটি বিশেষভাবে স্মরণ গ্রহণযোগ্য। ‘নজরুল প্রতিভা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখিকা মন্তব্য করেছেন নজরুলের সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে মোবাশ্বের আলী তীক্ষ্ণ লেখনির মাধ্যমে নজরুলের প্রতিভার বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন (পৃষ্ঠা ২৬)। তার এই মন্তব্যটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী।

 

‘বিশ্ব সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে লেখিকা যথার্থই মন্তব্য করেছেন, সমালোচনা সাহিত্যের সমৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে অধিকতর বিশ্বমুখী ও বিশ্ব প্রয়াস করার জন্য প্রায় দুই যুগ ধরে প্রবন্ধকার মোবাশ্বের আলি কুমিল্লার মতো একটা ছোট্ট মফস্বল শহরে বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ রচনা কাজে লিপ্ত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে লেখকের মনস্তাত্ত্বিক ও দক্ষতার দিক বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন।

 

‘শিল্পীর ট্রাজেডি’ গ্রন্থের লেখকের অভিমত হচ্ছে মোবাশ্বের আলী এ পুস্তকের প্রথমেই যে দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন, সেই ভূমিকায় তিনি ট্রাজেডিকে শুধু ব্যক্তিগত হিসেবে দেখাননি। সামাজিক বা রাজনৈতিক কারণে যেসব অবরোধ এসেছে এবং সেই অবরোধের মধ্য দিয়ে শিল্পী যেভাবে পরিশ্রান্ত হয়েছেন, সংগ্রামরত হয়েছেন তা লেখার চেষ্টা করেছেন (পৃষ্ঠা ৩২)। তার এই উক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত এবং গবেষক হিসেবে প্রফেসরের লেখা চতুর্দিকে আলো ফেলে যথার্থ বিশ্লেষণ ব্রতী হয়েছেন।

 

‘বাংলাদেশের সন্ধানে’ গ্রন্থটি প্রফেসর মোবাশ্বের আলি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎসর্গ করেছিলেন। এ গ্রন্থটি সম্পর্কে লেখকের মূল্যায়ন হচ্ছে, বাংলা ভাষায় এ জাতীয় বইয়ের সংখ্যা অপ্রতুল। আমি মনে করি, যেকোনো পাঠক ‘বাংলাদেশের সন্ধানে’ পরার পর নিজের দেশকে জানার সঙ্গে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবেন। আসলে লেখিকা অত্যন্ত পারদর্শীতার সঙ্গে বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধটিতে তার মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন।

 

‘রবীন্দ্রনাথ অন্তরঙ্গ আলোকে’ শীর্ষক প্রবন্ধে আমাদের জাতীয় জীবনে রবীন্দ্রচর্চার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রফেসর যেভাবে নিজেকে তুলে ধরেছেন, তার চিত্রকল্পকে একটু একটু করে মুন্সিয়ানার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, সম্পূর্ণ বইটি পড়ে মনে হয় আরো কিছু জানার ছিল। পরবর্তী মহাপ্রয়াণে রবীন্দ্রনাথ শিরোনামে আরেকটি অধ্যায়ে সংযুক্তি করার ইচ্ছা ছিল লেখকের (পৃ: ৪২)। তার বক্তব্য অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।

 

‘শৈলী: জীবন ও সাহিত্যিক, শিরোনামের প্রবন্ধে লেখিকা মন্তব্য করেছেন যে, মোবাশ্বের আলী জীবনের সঙ্গে মিলিয়েই সেসব জায়গায় কবির কাব্য ভাবনা ও কাব্য প্রীতির পরিচয় তুলে ধরেছেন (পৃষ্ঠা ৪৫)। ‘বরিস পাস্তেনাক’ এর মাধ্যমে মোবাশ্বের আলীর সাহিত্য জীবনের সূত্রপাত ঘটে। মোবাশ্বের আলীর ‘ড. জিভাগো’ প্রবন্ধটি সমকালে প্রকাশিত হয়েছিল।

 

বরিস পাস্তেনাককে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে তিনি অন্যান্য গ্রন্থের মতো কঠোর পরিশ্রম বাংলা একাডেমির আহ্বানে করেছিলেন। লেখিকা যথার্থই বলেছেন, মোবাশ্বের আলীর বর্ণনায় একটি সুনির্দিষ্ট দিক চিহ্ন ফুটে উঠেছে। এখানেই গ্রন্থের চরম উৎকর্ষতা (পৃষ্ঠা ৫০)। ‘গ্রিক ট্রাজেডি’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছিল শিল্পকলা একাডেমি থেকে। হঠাৎ দেখা গেলো সূচিপত্র নামে একটি প্রকাশনা এটির পাইরেসি সংস্করণ বের করেছে। এ ব্যাপারে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও প্রকাশনা সংস্থাটি আর করবে না বলে মৌখিকভাবে জানায়।

 

প্রফেসর ইয়াসমিন আরা যথার্থই মন্তব্য করেছেন, তবুও নির্দ্বিধায় বলা যায়, গ্রিক ট্রাজেডি শিল্প বা সাহিত্য নয়। প্রাচীন গ্রিসের পূর্ণ জীবনবোধ যা পাঠে মন ও প্রাণ দুই পূর্ণভাবে তৃপ্ত হয়(পৃ: ৬০)। লেখিকা অত্যন্ত সাবলীলভাবে গ্রন্থটি আলোচনায় তার গবেষণাসুলভ ‍দৃঢ়চিত্র অনুসন্ধান প্রকৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন।

 

`গ্রিসের গল্প’ গ্রন্থটি মোবাশ্বের আলীর অন্যতম অনুবাদকর্ম। তার এই গ্রন্থ সম্পর্কে লেখিকার মন্তব্য হচ্ছে, গ্রিসের গল্পের জীবন ঘনিষ্ঠতা, জীবনধর্মী তার আবেদন সম্পৃক্ত এই গল্প সংকলনে পাঠকরা পাবেন জীবন ও স্বপ্নের মোহনায় একটি রসনীয় জীবন উদ্যানে স্বপ্নলোক (পৃ: ৬৫)। অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য গ্রিসের ১০টি গল্প ও আরেক অনুবাদগ্রন্থ। ড. লেখায় যথার্থই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশের একটি প্রবাদ আছে ‘অতি ভাল ভাল নয়’ অন্যত্র আছে ‘অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ’ সামাজিক অবস্থা দৃষ্টে এটি অনেকখানি বাস্তবের আলোকধারায় স্নাত।

 

‘মধুসূদনের গ্রন্থবলি ও স্মৃতিকথা’ গ্রন্থখানি প্রকাশিত হয়েছিল বাংলা একাডেমি থেকে। প্রফেসর ইয়াসমিন আরা লেখায় যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইংরেজি গদ্য রচনা ও স্মৃতি কথা রচনায় বাংলা সাহিত্যে এক অমূল্য সংযোজন। তার এ বক্তব্য অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি গ্রন্থটি শিল্পকলা একাডেমি প্রকাশ করেছিল। অত্যন্ত সাবলীলভাবে লেখিকা গ্রন্থটির সমালোচনা ফুটিয়ে তুলেছেন।

 

যা পাঠককে আপ্লুত করবে। ‘মধুসূদনের বিশ্ব’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেছিল বাংলা একাডেমি। গ্রন্থটি সম্পর্কে লেখিকা আক্ষেপ করেছেন যে, বর্তমানে আমরা দেখেছি মধুসূদনকে নিয়ে একই কথা বারংবার উচ্চারিত হচ্ছে। নতুন বিষয়ে কোনো সংযোজন নেই (পৃ: ৮৪)। লেখিকার উক্তিটি অত্যান্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। স্বাধীন বাংলাদেশ মধুসূদন চর্চাকে বাস্তবতার আলোকে বহুমাত্রিকতায় বিশ্লেষণ করা দরকার।

 

‘বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনে সাহিত্যকৃতি’ মোবাশ্বের আলী গ্রন্থটি মূলত ২০০৩ সালে জমা দিয়েছিলেন। অথচ দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এটি প্রকাশিত হয়েছিল। প্রফেসর লেখায় যথার্থ মন্তব্য করেছেন, মোবাশ্বের আলী এই গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের মৌল অবশিষ্ট বৈশিষ্ট তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন (পৃ:৮৯)। প্রফেসর ড. ইয়াসমিন আরা অত্যন্ত উচ্চমার্গের গবেষক। আলোচ্য গবেষণা গ্রন্থে তার সাহিত্যে সূক্ষ্ম গবেষণা পদ্ধতি ধরা পড়ে। তাকে মূল্যবান গবেষণা গ্রন্থ রচনায় অভিনন্দন জানাচ্ছি। আশা করি ভবিষ্যতে মোবাশ্বের আলীর অন্য গ্রন্থগুলো নিয়েও তিনি গবেষণা করবেন।

গ্রন্থ রচনা: প্রফেসর ড. ইয়াসমিন আরা লেখা

গ্রন্থ সমালোচক: প্রফেসর ড. তাহমিনা হক