আজ ৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ যেন শামুকখোলের নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:  ডানা নাড়িয়ে চক্রাকারে আকাশে উড়তে থাকে আর দলবেঁধে ঘুরতে থাকে আবাসস্থানের আশপাশে। দেখতে মনে হয় যেন ছোট ছোট উড়োজাহাজ উড়ছে আকাশে। নজরকাঁড়ানো মনোমুগ্ধকর পাখি উড়ার দৃশ্যে পাখি প্রেমিদের মন কেড়ে নেয়। পাখিটির নাম শামখোল বা শামুকখোল। পাখিটি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার থানার ও পার্শ্ববর্তী গাছগুলোতে করেছে কলোনী।এ স্থানটি যেন নিরাপদ বাসস্থান। তাই গত কয়েক বছর থেকে গাছগুলোকে প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

 

এ বছরও বংশ বিস্তারে শামুকখোল ফুটিয়েছে বাচ্চা। এক একটি দম্পত্তি পাখি ২ টি থেকে ৫ টি বাচ্চা ফুটেয়েছে। গাছগুলোও পরিচিত হচ্ছে পাখি গাছ নামে। শামুকখোল পাখির চাদরে ঢাকা পড়েছে গাছের পাতাগুলো।গত কয়েক বছর ধরে থানার ও পার্শ্ববতী গাছগুলোর বাসিন্দা শামখোল বা শামুকখোল। কোথাও কোথাও শামুকভাঙ্গা নামেও এরা পরিচিত।

 

সারা বছর এদের দেখা মিলে না। লাপাত্তা হয়ে যায় কয়েক মাস। প্রজননের সময় আবারও ফিরে আসে এ স্থানে। সাধারণত মার্চ মাস থেকে এদের আনাগোনা এ স্থানে দেখা যায়। এ সময় গাছগুলোতে খড়কুটো এনে মাচার মত বাসা তৈরি করে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে এরা প্রজনন করে।গত চার বছর থেকে এ পাখিগুলো গাছগুলোতে করেছে কলোনী । বাচ্চা ফুটিয়ে বড় করে তাদের উড়ানোর উপযুক্ত সময় পর্যন্ত লালন পালন করে। উড়ানোর সময় সব পাখি একসাথে উড়ে অন্যস্থানে যায়।

 

আবারও প্রজননের সময় তারা ছোট ছোট ঝাঁকে গাছগুলোতে এসে কলোনী বা আবাস স্থল করে। এ যেন শামুকখোল পাখির প্রজনন কেন্দ্র।বিভিন্ন তথ্য অনুসারে জানা যায়, এরা কখনো ছোট ঝাঁক বেঁধে, কখনোবা একত্রে দলবদ্ধভাবে বিচরণ করে। বড় কলোনিতে রাত্রিবাস ও প্রজনন করে। খাবারের অভাব না হলে এরা সাধারণত এক জায়গায় থাকে। কমবয়সী শামুকখোল পাখী উড়তে শেখার পরে বিশাল অ লজুড়ে পরিভ্রমণ করে থাকে। সাধারণত এরা বহুদুর পর্যন্ত বিচরণ করার ক্ষমতা রাখে।

 

ভোরে আবাস ছেড়ে খাদ্যের সন্ধানে বেড় হয়। ডানা ঝাপটিয়ে দলবেঁধে জলাভূমির দিকে উড়ে যায়। দিনের উষ্ণতম সময়ে ডানা না নাড়িয়ে বিশেষ কৌশলে ধীরে ধীরে চক্রাকারে আকাশে উড়তে উড়তে উঠে যায় আর দলবেঁধে ঘুরতে থাকে। আবার জলাশয়ের একদিক থেকে অন্যদিকে ক্রমান্বয়ে উড়ে উড়ে খাদ্যের সন্ধান চালায়।পানির ধারে বা অল্প পানিতে হেঁটে হেঁটে কাদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে শামুক ও ঝিনুক তুলে খায়। এদের খাদ্য তালিকায় রয়েছে- শামুক, ঝিনুক। এছাড়াও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, ব্যাঙ, কাঁকড়া প্রভৃতি।

 

বিগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা ক্রমেই কমছে। তবে বণ্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮১ সেন্টিমিটার। ঠোঁট ও পা লম্বা। দুই ঠোঁটের মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা জায়গা থাকে। সাদাটে দেহ। শুধু ডানা ও লেজের প্রান্ত কালো। বিশাল কালচে ঠোঁট। জুলাই-সেপ্টেম্বর মাস এদের প্রজনন মৌসুম ধরা হয়। আবার স্থান ভেদে এদের প্রজনন ঋতুতে বিভিন্নতা দেখা দেয়। তখন কালচে পা হালকা গোলাপী হয় এবং তারা গোঙ্গানির মতো শব্দে ডাকে।এদের চোখের রং সাদাটে।

 

দুই ঠোঁটের ফাঁকের মধ্যে শামুক ভাঙ্গায় বিশেষ পারদর্শী। হয়তোবা এ জন্যই এ পাখির স্থানীয় নামকরণ হয়েছে শামুকখোল। আকারে বেশ বড়। ঠোঁটের বিশেষ গঠন এক ধরনের জাঁতিকলের মতো কাজ করে। প্রকৃতিপ্রদত্ত এ জাঁতিকলের মাধ্যমে শামুকখোল জলাভূমির শামুক ভেঙ্গে খায়। এজন্য এর নাম শামুকখোল। অন্যদিকে শামুক ভাঙ্গার জন্য নয়, বরং পিচ্ছিল শামুক ভালোভাবে ঠোঁটে আটকানোর জন্য তার ঠোঁটের গঠন এমন অদ্ভুদ হয়। সচরাচর পানির নিচে শামুকের খোল ভেঙ্গে এরা পানির উপর মাথা তুলে শামুকের মাংস গিয়ে খায়।

 

তাইতো তাদের ঠোটও বড়। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি দেখতে একই রকম। প্রজননের সময় তারা উঁচু গাছে ডালপালা দিয়ে বড় মাচার মতো বাসা বাঁধে। ডিম ২ থেকে ৫ টি দেয়। ডিমের রং সাদা। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই ডিমে তা দেয়। ২০ থেকে ২৫ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।প্রতি বছরের মত এবছরও শামুকখোল পাখি ফুটিয়েছে বাচ্চা। গাছগুলোকে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষনাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

এ এলাকায় পাখি মারা ও ধরা নিষেধ। কিশোরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আব্দুল আউয়াল জানান- সৃষ্টিকর্তার হুকুমেই পাখিগুলো থানার গাছগুলোকে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। থানার ও পার্শ্ববর্তী গাছগুলো ব্যাপকহারে পাখি প্রজনন করছে। আমরা ইতোমধ্যে গাছগুলোকে পাখির অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষনা করেছি।উপজেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগের ভেটেনারী সার্জন ডা. হোসেন মো. রাকিবুল রহমান জানান, এ পাখিটি সাধারণত এ অ লে দেখা যায় না। তবে পাখিগুলো এ স্থানকে নিরাপদ মনে করায় তারা এখানে প্রজননের আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিতে পারে।

 

এছাড়া এ অ লে অতিথি পাখিও দেখা যায় তারা মূলত পরিবেশগত ও নিরাপদ স্থান মনে করে এ এলাকায় কিছু সময়ের জন্য আবাসস্থল গড়ে।রংপুর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. বাবুল হোসেন জানান, মার্চ থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এ অঞ্চলে তারা খাবার পায় বলে এ স্থানে আবাস করে। এছাড়া প্রজননের প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকায় তারা প্রজননের নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে।

 

দিনাজপুর এলাকায় এ পাখি প্রচুর দেখা যায়। এরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আবাস করে থাকে। এদের প্রাকৃতিকভাবে খাবারের পরিবেশ সৃষ্টি করা হলে সারা বছর এ স্থানে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।