আজ ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

শীতের লাদাখে চীনা বাহিনীর মোকাবেলায় প্রস্তুত ভারত, তৈরি পাতালে তেলের ট্যাংক

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:  চীনের সঙ্গে সীমান্তে কয়েক মাস ধরে উত্তেজনা চলছে ভারতের। অনেকটা যুদ্ধপরিস্থিতি বিরাজ করছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি)। তবে আসন্ন শীতে চীনা লাল ফৌজ নয়।

 

শীতের লাদাখে সবচেয়ে বড় শত্রু প্রকৃতি। প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবেলা করে এলএসিতে কৌশলগত অবস্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তাই এখন থেকেই চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

 

সেনা সূত্রের খবর, আসন্ন শীতে লাদাখের এলএসিতে মোতায়েন সেনাদের জন্য শীতের উপযোগী পোশাক ও অন্যান্য সরঞ্জাম এবং রসদ পাঠানোর পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে পরিকাঠামো নির্মাণে।

 

লাদাখের বিভিন্ন স্থানে তৈরি করা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ তেলের ট্যাংক। এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ফুয়েল ডাম্প’-গুলোর প্রতিটির ধারণক্ষমতা চার লাখ লিটার করে। সেগুলোতে পৃথকভাবে মজুদ করা হচ্ছে সেনাদের জন্য রান্নার কেরোসিন, টি-৯০ ট্যাংক আর বিএমপি-২ ‘ইনফ্যান্ট্রি কমব্যাট ভেহিকল্’-এর ডিজেল এবং অ্যাপাচি হেলিকপ্টারের ‘অ্যারো টার্বাইন ফুয়েল’।

 

রয়েছে শীতে ব্যবহারের উপযোগী বিশেষ ধরনের ডিজেল। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের (আইওসি) তৈরি এই ডিজেল হিমাঙ্কের নিচে ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেও কার্যকর থাকে।

 

সেনার একটি সূত্র জানিয়েছে, লেহ্‌ থেকে হেলিকপ্টারে খাবার, ফলের রসের প্যাকেট, জ্বালানি তেলের সঙ্গেই প্রবল শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁবু, গরম কাপড়ের সেনা পোশাক, বিশেষ জুতা, বরফে ব্যবহারের সানগ্লাস পৌঁছে দেওয়ার কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। পাঠানো হচ্ছে বাড়তি সেনাও।

 

ওই সূত্র আরো জানিয়েছে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) মোকাবেলায় লাদাখের ৮২৬ কিলোমিটার লম্বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর আপাতত ৫০ হাজার ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে। যাতে প্রয়োজনে আরো সেনা দ্রুত এলএসিতে পাঠানো যায়, তার জন্য এখন থেকেই কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা লাদাখের বিভিন্ন ঘাঁটিতে পাঠানোর কাজ চলছে।

 

লেহ্ থেকে দাবরুক, শিয়োক হয়ে দৌলত বেগ ওল্ডি (ডিবিও) বিমান ঘাঁটি পর্যন্ত বিস্তৃত নতুন সড়কপথে দুর্গম সেনা চৌকিগুলোতে রসদ, জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছানোর কাজে প্রায় ৮,০০০ ট্রাক ব্যবহার করছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

 

সাহায্য নেওয়া হচ্ছে ভারতীয় বিমানবাহিনীর ‘সি-১৩০জে হারকিউলিস’ এবং ‘আইএল-৭৬’ পরিবহন বিমানের। ফরওয়ার্ড পোস্টগুলোতে পাঠানো হচ্ছে ‘চিনুক’ এবং ‘এমআই-২৬’ পরিবহন হেলিকপ্টার।

 

এলএসি বরাবর বিভিন্ন স্থানে নজরদারির জন্য তৈরি করা হয়েছে ‘মোবাইল এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল ইউনিট’। মনিটরযুক্ত এই ব্যবস্থা সিয়াচেনেও ব্যবহার করে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

 

শীতে লাদাখে বিপুল পরিমাণ সেনার জন্য প্রয়োজনীয় পানীয় জলের সংস্থান করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। শীতকালে জমে যাওয়া নদী ও পাহাড়ি ঝরনাই মূল ভরসা। কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে লাদাখে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলোও খোঁজার কাজ চলছে পুরোদমে।

 

এক সেনা কর্মকর্তা জানান, ‘বাসস্থান ও রসদ সরবরাহ সংক্রান্ত ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকলেও শীত মোকাবেলার জন্য মোটামুটিভাবে আমরা প্রস্তুত। গত সাড়ে তিন দশকে সিয়াচেন হিমবাহের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনার কাজে এসেছে।’

 

পৃথিবীর উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেনে পাকিস্তানি হামলা ঠেকাতে বছরজুড়েই মোতায়েন থাকে ভারতীয় সেনাবাহিনী। কারাকোরাম পর্বতের প্রায় ১৯ হাজার ফুট উচ্চতায় শীত মৌসুম কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে ভারতীয় সেনার অনেক অফিসার ও জওয়ানের।

 

তখন সেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের প্রায় ৫০ ডিগ্রি নিচে নেমে যায়। অন্যদিকে পূর্ব লাদাখে শীত মৌসুমে তাপমাত্রা হয় মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে খাপ খাওয়াতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

 

পূর্ব লাদাখের এলএসি-তে যুদ্ধপ্রস্তুতির দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় সেনার ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি কোর’। এই বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল অরবিন্দ কাপুর বলেন, ‘শুধু ভারত নয়, এ রকম চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বিশ্বে জুড়ি নেই আমাদের কোরের।’সূত্র : আনন্দবাজার।