আজ ৩রা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ট্রাম্পের করোনায় নির্বাচনও সংকটে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরিভাষা হয়ে ওঠা ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’ যেন এ বছর অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের করোনা পজিটিভের খবরে গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

 

আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কডিভ-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার পটভূমিতে সাংবিধানিক ও আইনগত—উভয় দিক থেকেই উঠছে অনিবার্য কিছু প্রশ্ন। প্রশ্ন আছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা নিয়েও।

 

এর বাইরে তৃতীয় আরেক দিক থেকেও ওঠা প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। যে ট্রাম্প বরাবরই করোনা মহামারিকে তাচ্ছিল্য করে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে জনসমক্ষে গেছেন, তাঁর করোনা পজিটিভের খবর ভোটাররা কিভাবে দেখছেন?

 

সাম্প্রতিক বিভিন্ন শোভাযাত্রায় যে হাজার হাজার ট্রাম্প সমর্থক মাস্ক পরেনি, করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি অস্বীকার করেছে, তারা কি এখন ট্রাম্পের মধ্যে নেতৃত্বের ব্যর্থতা দেখতে পাচ্ছে?

 

গত বৃহস্পতিবার রাতে (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সকালে) টুইটারে ট্রাম্প নিজেই জানান, তিনি ও তাঁর স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প দুজনই করোনায় আক্রান্ত। নিজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হোপ হিক্সের সংক্রমণ শনাক্তের পর করোনাভাইরাস পরীক্ষা করাতে দিয়েছিলেন ট্রাম্প, সঙ্গে দেওয়া হয় ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার নমুনাও।

 

প্রেসিডেন্ট কনোরায় আক্রান্ত হওয়ার জেরে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সামনে আসে তা হলো, মার্কিনরা চাইবে যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশ পরিচালনায় যেন কোনো ছেদ না পড়ে, সব কিছু যেন ঠিকঠাক চলে।

 

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বয়স্কদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ৭৪ বছর বয়সী ট্রাম্প স্বাভাবিকভাবেই এই কাতারে পড়েন। তিনি দেশ পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়লে কী হবে? এমনকি তাঁর মৃত্যু হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।

 

হোয়াইট হাউসের সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ডেভিড অ্যাক্সোরড সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সব কিছুর জন্যই সেখানে বিধিমালা বা প্রটোকল আছে। তাঁর ভাষ্য, ‘যদি সন্ত্রাসী বা পরমাণু বোমার হামলা হয়, তাহলে কী করতে হবে হোয়াইট হাউসে নিয়মিত তার অনুশীলন হয়। তবে সত্যি কথা বলতে, বর্তমান করোনার মতো যে পরিস্থিতি হোয়াইট হাউসকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে, তা অপ্রত্যাশিত।’

 

সিএনএন বলছে, কয়েক দশকের মধ্যে মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্টের এমন গুরুতর রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। আর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে ট্রাম্পের এই অসুস্থতা নতুন সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

 

এর আগে গত মার্চে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে সময় তিনি সরকার পরিচালনার কিছু দায়িত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাবের হাতে। অবশ্য ট্রাম্পের বেলায় এখনো তেমন কোনো ঘোষণা আসেনি।

 

বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঝুঁকি গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রধান ইয়ান ব্রেমার মনে করেন, যদি অসুস্থতার কারণে ট্রাম্প সরকার পরিচালনায় ?অক্ষম হয়ে পড়েন, সে ক্ষেত্রে দেশটির সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী তিনি ?অস্থায়ীভাবে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারবেন। ব্রেমার বলেন, ‘কাজে ফেরার মতো সুস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি (ট্রাম্প) পুনরায় দায়িত্ব নিজের হাতে ফিরিয়েও নিতে পারবেন।’

 

চিকিৎসার প্রয়োজনে সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ পর পর দুইবার এভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের কারণে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানও তাঁর মেয়াদে একবার ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছিলেন।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে যদি তেমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভা দায়িত্ব হস্তান্তরের উদ্যোগ নিতে পারবে। এমনকি যদি প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট দুজনেও যদি কোনো কারণে একসঙ্গে দেশ পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়েন বা মারা যান, সে ক্ষেত্রেও কী করতে হবে সংবিধানে তা-ও বলা আছে।

 

জর্জ মাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ইলিয়া সমিন বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে কার হাতে ক্ষমতা যাবে, সেটি সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা আছে।’ এ রকম হলে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ক্ষমতা গ্রহণ করবেন বলে জানান তিনি।

 

তবে তেমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে এবং বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির ন্যান্সি পেলোসিকে যদি ক্ষমতা গ্রহণ করতে হয়, আইনগতভাবে তা যতই সিদ্ধ হোক, ‘বিশৃঙ্খলা’ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

 

এ তো গেল ট্রাম্পের ক্ষমতা হস্তান্তরের আইনি ও সাংবিধানিক দিক। এর বাইরে চলমান নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা নিয়েও আছে গুরুতর কিছু প্রশ্ন। কোনো কারণে প্রার্থী বদলের প্রয়োজন পড়লে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিই বা কী করবে?

 

যতই বলা হোক ট্রাম্প ‘ঠিক আছেন’, আগামী চার বছর হোয়াইট হাউসের নেতৃত্ব দেওয়ার পক্ষে তা কতটা নিশ্চয়তা দেয়, সে প্রশ্ন যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি তিনি কি কোয়ারেন্টিনে থাকা অবস্থায় টুইটের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাবেন, আছে সে প্রশ্নও।

 

এর চেয়েও বড় কথা প্রচারণা চালিয়ে যাওয়ার মতো ততটা সুস্থও কি তিনি থাকবেন? যদি তিনি প্রচারণায় না থাকেন, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন কি বিষয়টিকে সম্মান দেখিয়ে প্রচারণা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেবেন? দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যকার বাকি দুটি বিতর্কেরই বা কী হবে?

 

আর রিপাবলিকান পার্টিকে যদি তাদের প্রার্থী পরিবর্তন করতে হয়, সেটি কিভাবে হবে? এখন পর্যন্ত এমন নজির না থাকলেও প্রার্থী পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির (আরএনসি) নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে যেভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত করা হয়, প্রার্থীর মৃত্যু হলেও নতুন কাউকে মনোনীত করতে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। বিরোধী ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটিও (ডিএনসি) একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে।

 

ট্রাম্পের করোনায় আক্রান্তের খবরে এরই মধ্যে বিশ্বের বহু দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর আরোগ্য কামনা করেছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বাইডেনও দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন। সূত্র : সিএনএন, বিবিসি, স্কাই, এসসিএমপি, রয়টার্স।