আজ ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

বিএনপি-জামায়াতের আমলে আইএসআইয়ের মদদে উলফা শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত আমলে (২০০১-২০০৬) পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সমর্থন পেয়ে শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে ভারতের উত্তর-পূর্বভিত্তিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা)।

 

চট্টগ্রামের অস্ত্র মামলায় এই বিষয়টি কোনো রকম সন্দেহ ছাড়াই প্রমাণিত হয়েছে। ওই সময়ে তৎকালিন বাংলাদেশ সরকার উলফাকে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ায় প্রশ্রয় দেয়।

 

তখন বাংলাদেশের ভেতরে উলফা আইএসআইয়ের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পায়। তৎকালিন সরকারের সমর্থনে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি দেশের ভেতরে বিদ্রোহীদের অভয়ারণ্য তৈরি করে।

 

তারা অনুপ্রবেশ ও চলাচলের নিরাপদ রুট তৈরি করে, সরকারের সহায়তায় বিদ্রোহী নেতারা বাংলাদেশের বাইরে ভ্রমণের নথি সরবরাহ করে, অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান নিয়ে আসে। তারা প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং স্থলপথের বিভিন্ন রুটে অবাদে চালাচল করে।

 

চট্টগ্রামের অস্ত্র মামলা প্রকাশিত হয়েছে যে, উলফা কর্মীদের বাংলাদেশের ভেতরে থেকে শুধুমাত্র ভারতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালানোর জন্যই নয় বরং ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর জন্য অস্ত্র পাচারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলগুলোকে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে আসছিল বিএনপি-জামায়াত পরিচালিত সরকার।

 

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাংলাদেশের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের (এনএসআই) প্রাক্তন ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম এবং এনএসআইয়ের পরিচালক ডাব্লিউজি সিডিআর (অব.) সাহাবুদ্দিন স্বীকার করেছেন, তৎকালিন দেশের নীতি নির্ধাকরা পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন ভারতীয় বিদ্রোহীদের অস্ত্র পাচারের জন্য। উলফার সামরিক শাখার কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া তখন ঢাকায় অবস্থান করেছিলেন। ওই সময় চীন থেকে বাংলাদেশে আনা বিশাল অস্ত্র চালানের তদারকি করেছিলেন তিনি।

 

২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামে জব্দ করা হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ। ওই সব অস্ত্র উলফার অস্ত্রাগারে ক্রমহ্রাসমান স্টককে পূরণ করার জন্যই নেওয়া হচ্ছিল বলে মনে করা হয়। শুধু তাই নয়, ২০০৩ সালে তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো অভিযানের পর উলফার মনোবল বৃদ্ধি করার জন্যও এই কাজটি করা হয়।

 

ভারতীয় বিদ্রোহীদের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থনের বিষয়টি ‘চ্যানেলাইজড’ করা হয়েছিল বাংলাদেশের দু’টি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা- এনএসআই এবং ডিজিএফআই-এর সহায়তায়।

 

ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন প্রত্যাবাসিত এমন সেনা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে টেকসই যোগাযোগ বজায় রেখেছিল আইএসআই।

 

এভাবে এনএসআই এবং ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছিল আইএসআই এবং উত্তর-পূর্ব ভারতকে অস্থিতিশীল করার প্রয়াসে আইএসআইকে সমস্ত সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তৎকালিন এই দুটি গোয়েন্দা সংস্থা।

 

১৯৭৫ সাল (শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা) থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সাল (আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন) পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে আইএসআই সমগ্র বাংলাদেশে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল,  বিশেষত খালেদা জিয়ার বিএনপি শাসনামলে (১৯৯১ থেকে ১৯৯৬)। ওই সময়ে আইএসআইয়ের কার্যক্রমের স্নায়ু কেন্দ্রে পরিণত হয় ঢাকা।

 

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তখন ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে রাষ্ট্রবিরোধী ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছিল। বাংলাদেশে যখনই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল (১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬) তখনই আইএসআই দেশের ভেতরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক দৈনিক খালিজ টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাক্তন আইএসআইয়ের প্রধান জেনারেল আসাদ দুরানি পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের সামনে ২০১২ সালের মার্চ মাসে বলেছিলেন যে আইএসআই উত্তর পূর্ব ভারতে বিদ্রোহীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনের আগে ডানপন্থী বিএনপিকে ৫০ কোটি রুপি দিয়েছে।

 

যদিও পরে দুরানি বিবৃতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তবে এটি সত্য যে আইএসআই ভারতকে অস্থিতিশীল করতে উলফার ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। একই সঙ্গে সন্দেহের কোনো অবকাশ রাখে না যে কাশ্মীরে বিদ্রোহে উসকানি দেওয়ার বিষয়ে পাকিস্তানের জড়িত থাকা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হইচই শুরু হলে আইএসআই তার ভারতবিরোধী অভিযান বাংলাদেশের ভেতরে দিয়ে পরিচালিত করে।

 

আইএসআই এবং দুই বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের গোপন সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী উলফা তার কার্যক্রমের ক্ষেত্রটি প্রসারিত করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিল উলফা।

 

বাংলাদেশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, এনএসআইয়ের ডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম (বর্তমানে চট্টগ্রামে উদ্ধার করা অস্ত্র মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত) ভুটানের রাষ্ট্রদূতকে ২০০৪ সালে মার্চের ৭ তারিখে বলেছিলেন, বাংলাদেশে উলফা কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর কোনো উদ্বেগ বা আশঙ্কা থাকার দরকার নেই।

 

ভুটানের রাষ্ট্রদূত তার বাংলাদেশি কথোপকথনকারীর কাছে জানিয়েছিলেন, ভুটানে ২০০৩ সালের প্রথম দিকে উলফার ক্যাডারদের ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউনের প্রেক্ষিতে তিনি হামলার আশঙ্কা করছিলেন।

 

বাংলাদেশের এনএসআইয়ের তৎকালিন ডিজি কোনো ঊর্ধ্বতন উলফার নেতার নাম উল্লেখ না করে ভুটান রাষ্ট্রদূতের আশঙ্কা নিয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, উলফা নেতাদের বাংলাদেশে শিবির স্থাপনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল এবং তাদেরকে নিশ্চিত করা হয়েছিল যে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে লক্ষ্যের বিরুদ্ধে বিদেশি বা স্থানীয়দের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা সহ্য করা হবে না। এতে ভুটানের রাষ্ট্রদূত স্বস্তি বোধ করেন। তবে তিনি বুঝাতে পারেন এনএসআইয়ের ডিজি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশে উলফার নেতাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে ভারতীয় বিদ্রোহীরা কেবল বাংলাদেশের অভয়ারণ্যই খুঁজে পায়নি, ব্যবসায়ের উদ্যোগের জন্য উপযুক্ত পরিবেশও পেয়েছিল। ‘উষা ইন্টারন্যাশনাল, ঢাকা’, ‘অনির্বান গার্মেন্টস লিমিটেড, চট্টগ্রাম’ এবং ‘করাচি গার্মেন্টস, চট্টগ্রাম’র মতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা শুরু করে উলফা। এই ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করা কর্তৃপক্ষের সমর্থন ছাড়া সম্ভব হতো না।

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় থিংক ট্যাঙ্ক স্ট্র্যাটেজিক ফোরসাইট ইনকের, যা স্ট্রেটফোর নামে পরিচিত, ২০০৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া হোটেল, টেক্সটাইল মিলস, কনসালটেন্সি ফার্ম, বিভাগীয় স্টোর, চিংড়ি ট্রলার ও পানীয় কারখানার ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তিনি প্রায় একশ ১০ মিলিয়ন ডলারের মালিক ছিলেন।

 

১৯৮৮ সাল থেকে উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল পকিস্তানের গোয়েন্দ সংস্থা আইএসআই। তখন পরেশ বড়ুয়া প্রথমবার করাচি সফর করেন। এরপর থেকেই আইএসআই ঢাকা থেকে উলফাকে আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। উলফা কর্মীদের কেবল নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সে (এনডাব্লিউএফপি) নয়, আফগানিস্তানেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। পরেশ বড়ুয়া বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে পাকিস্তান সফরও করেছিলেন।

 

এটা সবারই জানা যে, ২০০১ সালের ২১ আগস্ট আসামের গোয়ালপাড়ায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সফলভাবে আক্রমণ চালানোর পরে আইএসআইয়ের পক্ষ থেকে উলফা সামরিক শাখার কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার কাছে প্রশংসাসূচক অভিনন্দন বার্তা পাঠানো হয়েছিল। উলফার ভারতবিরোধী অভিযান এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানের সহায়তার হাজারো উদাহরণ রয়েছে।

 

পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল মোশাররফের বাংলাদেশ সফরে আসার আগে পাকিস্তান টেলিভিশন চ্যানেল পিটিভি ওয়ার্ল্ড ২০০২ সালের ৩০ জুলাই একটি প্যানেল আলোচনা করেছিল ‘উলফার সাহসিকতা এবং গৌরব’ নিয়ে। যার মাধ্যমে ভারতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় উলফার সাফল্য এবং ভারত সরকারের উলফাদের গ্রেপ্তার বা তাদের সহিংস কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ করার ব্যর্থতা তুলে ধরা হয়েছিল।

 

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:ঢাকায় অবস্থানকালে জেনারেল মোশাররফ উলফার প্রতিষ্ঠাতা অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে দেখা করেন শেরাটন হোটেলে। তার সঙ্গে মিটিং করার জন্য অনুপ চেটিয়াকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার বের করে নিয়ে আসা হয়। জেনারেল মোশাররফ তখন শেরাটন হোটেলে ছিলেন। ৯ জানুয়ারি ২০১০ সালে এটি প্রকাশ করেছিলেন আর কেউ নন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তৎকালীন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী আরো বলেন, ভারতে ধ্বংসাত্মক এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করেছিল ইসলামাবাদ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান মুখপাত্রের প্রকাশিত এই তথ্যের বিষয়ে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

২০০৩ সালে ভুটানে উলফার বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ‘ক্র্যাকডাউন’র পর গ্রেপ্তার হওয়া কিছু উলফা ক্যাডার স্বীকার করেছেন যে, আশন্ত বাঘফুকনসহ তাদের অনেক নেতাই গেরিলা যুদ্ধের কৌশল এবং বিস্ফোরক ডিভাইস পরিচালনার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তের বট্রাসিতে যান। আইএসআই ভারতে নৃশংস কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য তৈরি করছিল তাদের। বিএনপি এবং জামায়াতসহ ইসলামি দলগুলো উলফা ও উত্তর-পূর্বভিত্তিক ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি গোপন সহায়তা এবং আশ্রয় প্রদানের মাত্রা বাড়িয়েছিল। পাকিস্তানের পরামর্শদাতাদের সন্তুষ্ট করার জন্যই তারা এই কাজ করেছিল।

 

ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেষ্টায় আইএসআই বাংলাদেশকে উত্তম গন্তব্য হিসেবে মনে করতো। আইএসআই চায় উত্তর পূর্ব ভারতে চিরস্থায়ী অস্থিতিশীলতা বজায় রাখতে। যাতে ভারতের উত্তর পূর্ব অংশে পাকিস্তান হস্তক্ষেপ করতে পারে এবং ভারত থেকে ওই অঞ্চলটি বিচ্ছিন্ন করা সহজ হয়ে যায়। এভাবে ১৯৭১ সালের পরাজয় এবং দেশটির পূর্ব শাখা (বর্তমানে বাংলাদেশ) হারানোর প্রতিশোধ নেওয়ার দীর্ঘ লালিত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চায় পাকিস্তান।