আজ ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

দক্ষতার অভাবে কম বেতন পাচ্ছে প্রবাসীরা

প্রথমবার্তা ,প্রতিবেদক : রেমিট্যান্স আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে অনেক বছর ধরেই। নানা সংকট বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব সৃষ্টি করলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তেমন বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারেনি রেমিট্যান্স আয়ের কারণে।

 

সাম্প্রতিক বৈদেশিক শ্রমবাজারে ভাটির টান লক্ষ করা যাচ্ছে। করোনায় কাজ হারিয়ে গত সাড়ে পাঁচ মাসে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবন কাটিয়ে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক দেশে ফেরত এসেছেন।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি আরো বাড়াতে হলে বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে যাঁরা চাকরির জন্য যাচ্ছেন তাঁরা বিশেষ কোনো পেশায় পারদর্শী না হয়ে অদক্ষ কর্মী হিসেবে কোনোভাবে সে দেশে পা রাখছেন। ফলে কাজ পেলেও তা হয় অনেক কম বেতনের।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীরা বিদেশে গিয়ে অনেক পরিশ্রম করেন বটে, কিন্তু কারিগরি শিক্ষা না থাকায় তাঁদের অদক্ষ, আধা দক্ষ শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁরা তাঁদের শ্রমের উপযুক্ত মূল্য পান না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে।

 

নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার কারণে তাঁদের স্বল্প বেতনে চাকরি করে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। এখন সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশে চাকরি নিয়ে যাওয়ার আগে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি শিক্ষা লাভের জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

 

এ জন্য সরকারি উদ্যোগে দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষালাভের জন্য অনেক ইনস্টিটিউট, ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। যেখানে মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সিভিল অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

 

এসব প্রতিষ্ঠান স্বল্প খরচে নানা ধরনের কারিগরি বিষয়ে জ্ঞান লাভের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ, অভিজ্ঞ, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে চাহিদাসম্পন্ন করে তোলা সম্ভব।

 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দক্ষ প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

 

এ জন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) যৌথভাবে ‘অ্যাক্টিভিটি প্ল্যান ফর স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড মাইগ্রেশন ম্যানেজমেন্ট’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রতিষ্ঠান দুটি ২০২১ সাল পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করবে।

 

এই মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬৮টি দেশে প্রবাসীরা অবস্থান করছেন। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল—এই ১০ বছরে ৬০ লাখ কর্মী বিভিন্ন দেশে গমন করেছেন। সব মিলিয়ে এক কোটি ২১ লাখ ১২৪ জন পুরুষ ও মহিলা কর্মী বর্তমানে বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন।

 

জনশক্তি, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান ব্যুরো সূত্র বলছে, দক্ষতার অভাবজনিত কারণে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ৩৪ হাজার কর্মী কম গেছেন বিদেশে। ২০১৮ সালে সাত লাখ ৩৪ হাজার ১৮১ জন কর্মী বিদেশে গেলেও ২০১৯ সালে গেছেন সাত লাখ ১৫৯ জন কর্মী।

 

সে হিসেবে ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে ৩৪ হাজার ২২ জন কম কর্মী বিদেশে গেছেন। এমনকি, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী ফেরতও আসছেন বিভিন্ন দেশ থেকে।

 

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো. শামছুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) এবং ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি)সহ মোট ৭০টি প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে। এগুলোর মাধ্যমে আমরা ৫৫টি ট্রেডে ট্রেনিং দিচ্ছি।

 

করোনার কারণে প্রায় ছয় মাস যাবৎ বন্ধ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। করোনা-উত্তর পৃথিবীতে দক্ষ শ্রমিকের কদর বাড়বে। এ জন্য আমাদের সরকার ও মন্ত্রণালয় আরো ৪০টি উপজেলায় ৪০টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার তৈরি করছে।

 

এরপর আরো ৭১টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার হবে। দক্ষতা বাড়ানোর জন্য পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলায় প্রশিক্ষণ সেন্টার তৈরি করা হবে। করোনার কারণে যেসব প্রবাসী বিভিন্ন দেশ থেকে চলে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা আবার বিদেশে যেতে চান তাঁদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।

 

এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রাথমিকভাবে এর খরচ সরকার গ্রহণ করবে। আমরা চাই মানুষজন যাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষ হয়ে কম খরচে বিদেশে যেতে পারেন এবং কোনো দালালের খপ্পরে যেন না পড়েন। বৈধ পথে যান, বৈধ পথে টাকা পাঠান। এ জন্য আমরা প্রচার প্রচারণা বাড়িয়েছি।’