আজ ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

আরবি ভাষার উৎকর্ষ ,কোরআনের ভূমিকা

প্রথমবার্তা,প্রতিবেদক:

পবিত্র কোরআনের ভাষা আরবি হওয়ায় মুসলিম জাতির কাছে আরবি ভাষার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আরবি মুসলমানের ধর্মচর্চা ও ইবাদতের অংশ। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবেই মুসলিমরা আরবি ভাষার চর্চা করে। তাই বলা যায়, কোরআনের ভাষা হওয়ায় আরবি ভাষার চর্চা, সংরক্ষণ, প্রসার ও উন্নয়নে পৃথিবীর বৃহৎ একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিকরা আরবি ভাষার ওপর কোরআনের সাতটি অবদান চিহ্নিত করেছেন। তা হলো—

১. বিলুপ্তি ও বিকৃতি থেকে রক্ষা : আরবি ভাষার স্থায়িত্ব ও সংরক্ষণে কোরআনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কেননা আরব জাতি, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, চিন্তা ও দর্শনের ওপর কোরআনের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। কোরআন তথা ইসলাম বিক্ষিপ্ত আরব জাতিকে সংঘবদ্ধ করেছে, তাদের আত্মবিশ্বাসী করেছে, তাদের স্বভাব-চরিত্র ও চিন্তাধারা পবিত্র করেছে। ফলে কোরআন আরবদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে বিশেষ স্থান লাভ করেছে; বরং কোরআন হয়ে উঠেছে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মানদণ্ড। কোরআনের এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি কোরআনের অনুরূপ কিছু উপস্থিত করতে মানুষ ও জিন জাতিকে একত্র করা হয়, তবু তারা তার অনুরূপ কিছু উপস্থিত করতে পারবে না। যদিও তারা পরস্পরের সহযোগী হয়।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৮৮)

২. সমৃদ্ধি লাভ : কোরআন আরবি ভাষা ও সাহিত্যকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আরবি শব্দের অর্থবোধকতা, শব্দ-বাক্যের নতুন বিন্যাস, উচ্চ ভাষাশৈলী ও অলংকারে শোভিত করেছে তাকে। আল্লামা মুস্তফা সাদেক রাফেয়ি (রহ.) বলেন, ‘কোরআন এই ভাষায় এমন রীতিতে অবতীর্ণ হয়েছে, যার অল্প ও বিস্তর উভয় পরিমাণ সমালোচকদের অক্ষম করে দেয়। কেবল আলোর সঙ্গে কোরআনের তুলনা করা যেতে পারে। কেননা আলো খণ্ডিত হলেও তার প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তন আসে না।’ (তারিখু আদাবিল আরব : ২/৭৪)

৩. গোত্রীয় প্রভাব মুক্তকরণ : কোরআন আরবি ভাষাকে গোত্রীয় ও আঞ্চলিকতার প্রভাবমুক্ত করে একটি প্রমিত রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা একই সঙ্গে বিশুদ্ধতম এবং অলংকারপূর্ণ। যদিও কোরআন আরবি ভাষারীতির বৈচিত্র্য অস্বীকার করেনি। এ জন্যই কোরআন পাঠে সাতটি রীতি অনুমোদিত। কোরআন একীকরণের সময় উসমান (রা.) বলেন, ‘যদি তোমরা ও জায়েদ ইবনে সাবিত কোনো ক্ষেত্রে পরস্পর ভিন্নমত পোষণ করো, তবে কোরাইশের ভাষারীতি গ্রহণ করো। কেননা কোরআন তাদের ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে।’ (লামহাতুন ফি উলিমিল কোরআন, পৃষ্ঠা. ১১৮)

৪. আন্তর্জাতিক ভাষার মর্যাদা দান : কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার আগে আরবি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। বেশির ভাগ আরব মরুচারী ও বেদুইন হওয়ায় তা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষাও হয়ে ওঠেনি। কিন্তু কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত হয়। ড. নুরুদ্দিন আত্তার বলেন, ‘আরবি ভাষার ব্যাপক প্রসার হলো। এমনকি ভারতবর্ষ, চীন ও আফগানিস্তানে আরবি চর্চার উদগিরণ হলো। ইমাম বুখারি, মুসলিম, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহর মতো বিশ্ববরেণ্য আলেমরাই তার প্রমাণ। তাঁরা এসব অঞ্চলের সন্তান ছিলেন।’ (আত-তুরাসুল আরাবিয়া, পৃষ্ঠা. ১২৫)

৫. অলংকার ও  সাহিত্য সমালোচনার বিকাশ : কোরআন ছিল আরব কবিদের জন্য এক মহাবিস্ময়। কোরআনের অলংকার ও শৈলী তাঁদের হতবাক করে দিয়েছিল। ফলে কোরআন নাজিলের পর আরবি ভাষার কাঠামো ও শৈলী উভয়টি নিয়ে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়, যা ‘ইলমুল বালাগা’ (অলংকারশাস্ত্র) ও ‘ইলমুল নকদ’ (সমালোচনাশাস্ত্র)-এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বরং মুসলিম সমাজে কোরআনচর্চার অংশ হিসেবেই অলংকার ও সমালোচনাশাস্ত্রের বিকাশ ঘটে। ড. তোহা হুসাইন বলেন, ‘এতে সন্দেহ নেই, কোরআন আরবি গদ্যের আদি গ্রন্থ। কিন্তু তোমরা এ-ও হয়তো জানো যে কোরআন গদ্য নয়। তদ্রূপ কোরআন কাব্যও নয়। কোরআন কোরআনই। … কোরআন একটি একক পদ্ধতি, অনুপম ও অতুলনীয়। আগেও এমনটি ছিল না এবং পরেও এর তুল্য কিছু হয়নি।’ (মিন হাদিসিশ শেরি ওয়ান নাসরি, পৃষ্ঠা. ২৫)