আজ ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

বগুড়া ধুনটের ঘাসি পরিবারের দুর্দিন

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ‘চরের জমিতে ঢ্যাড়স আর বেগুন লাইগাছিলাম, হ্যাতো বইন্নায় নস্ট হইয়া গ্যাছে। ফি বছর এসময় চরের ঘাঁস ক্যাইটা তা ব্যেচ্চা খাছি। এবার অসময়ের বইন্নায় বেমাক খায়া হালাইছে। অনেক জাগায় এহুনও পানি, আর যেহানে পানি নামছে, হে সব জমির ঘাসও পইচ্চা গ্যাছে। চরত কাম নাই, এহুন কী করমু ? ঘাস বেচপার না পারলি খামু কী?’ এভাবে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেন বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভুতবাড়ি গ্রামের জয়নাল আবেদীন।

জয়নাল আবেদীন একা নন, বালুচরে প্রাকৃতিকভাবে গজানো ঘাস কেটে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করা অন্তত ৫০০ পরিবারে একই চিত্র। দীর্ঘমেয়াদি বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় চরের ঘাস পচে গেছে। নতুন করে ঘাস জন্ম নিতে সময় লাগবে তিন-চার মাস। চরে এখন ঘাসের কোনো অস্তিত্ব নেই। তাই ঘাস কেটে বাজারে বেচে জীবিকা নির্বাহ করা পরিবারগুলোর এখন চরম দুর্দিন।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৪০ বছর ধরে ভাঙছে যমুনা নদী। এই ভাঙনের খেলার যেন শেষ নেই। দীর্ঘ সময়ের ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ১৪টি গ্রাম। ভাঙা-গড়ার মধ্যেই জীবন চলে যমুনা পাড়ের মানুষের। নদীর একূল ভাঙলে ওকূলে গিয়ে ঠাঁই নেন। এভাবেই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। সারাজীবন কষ্ট করেও অভাব পিছু ছাড়ে না তাদের। যমুনার ভাঙন, করোনাকালের কর্মহীনতা এবং বন্যায় মানুষগুলো চরম কষ্টে দিন পার করছেন। খাবারের সংকট চলছে ঘরে ঘরে।

প্রতিবছর বন্যায় যমুনাচরের বিশাল এলাকাজুড়ে পলি পড়ে। চরের কিছু অংশে আবাদ হয় বিভিন্ন জাতের ফসল। আর পরিচর্যার অভাবে অধিকাংশ এলাকায় কোনো ফসলের চাষ হয় না। চরের বড় একটি অংশ পতিত পড়ে থাকে। সেই জমিতে প্রকৃতিকভাবে বিভিন্ন জাতের ঘাস জন্মে। যমুনা নদীর দুই পাশের প্রায় ৫০০ পরিবার চরের ঘাস কেটে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। তাদের সংসারের উপার্জনের একমাত্র পথ এই ঘাস কেটে বাজারে বিক্রি করা।

স্থানীয়ভাবে তারা ‘ঘাসি’ নামে পরিচিত। এসব পরিবারের নারী ও পুরুষরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চরের ঘাস কাটায় ব্যস্ত থাকেন। প্রতিদিন বিকেলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে ঘাসের (ঘাসবিক্রির হাট) হাট বসে। চরের ঘাস গরু-মহিষসহ গবাদিপশুর পুষ্টিকর ও উৎকৃষ্টমানের খাবার। জীবাণু ও ক্ষতিকর কেমিক্যালমুক্ত পরিবেশে এই ঘাস গজায়। তাই গৃহস্থের কাছে চরের ঘাসের চাহিদাও ব্যাপক। এলাকার গরু-মহিষ পালনকারীরা ঘাসিদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘাস কিনে থাকেন।

নিউসারিয়াকান্দির নান্নু মিয়া জানান, একজন ঘাসি দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার ঘাস বিক্রি করেন। ঘাস বেচার টাকায় চলে পরিবারের ভরন-পোষণ। বছরের পর বছর ধরে যমুনাপাড়ের হতদরিদ্র পরিবারের লোকজন ঘাস কাটা পেশার সাথে জড়িত।

কৈয়াগাড়ির আব্দুল বারিক জানান, এ বছর যমুনা নদীর পানি বেড়ে চর এলাকা তলিয়ে ছিল। ফলে চরের পতিত জমিতে গজানো ঘাস পচে নষ্ট হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় বন্যার পানিতে তলিয়ে থাকায় চরে প্রাকৃতিকভাবে ঘাস বলতে কিছু নাই। ঘাস কেটে আয়ের পথও তাই বন্ধ।

স্থানীয় ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতিকুল করিম আপেল জানান, চরে ঘাস না পেয়ে পরিবারগুলো বেকার হয়ে পড়েছে। পুঁজির অভাবে তারা অন্য কোনো কাজে বা ব্যবসায় নামতে পারছে। তাছাড়া চর এলাকায় এখন কৃষিকাজও নেই। এজন্য দিনমজুরের কাজও মিলছে না তাদের। আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতি কষ্টে বেঁচে আছে যমুনাচরের ঘাসি পরিবারের মানুষ।