আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেপরোয়া ও স্বার্থপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে গত চার বছরে বেপরোয়া ও অপ্রতিরোধ্য মন্তব্যের জন্য বিশেষ পরিচিতি পেয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময়ের মধ্যে যদি তাঁর ১০টি সেরা মন্তব্যের তালিকা করা হয় তাহলে নিঃসন্দেহে ওপরের দিকেই স্থান পাবে তাঁর টুইট, ‘কভিডকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনার জীবনের রাশ কোনোভাবেই এর হাতে তুলে দেবেন না।’ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ট্রাম্প গত সপ্তাহে এ মন্তব্য করেন। এই ‘ভয়ডরহীন’ প্রেসিডেন্ট হয়তো ভুলে গেছেন তাঁর দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সোয়া দুই লাখ লোক মারা গেছে। আক্রান্ত হয়েছে ৮০ লাখ মানুষ।

ট্রাম্প এই টুইট করেন গত ৫ অক্টোবর ওয়াল্টার রিড হাসপাতালে তাঁর চার রুমের বিলাসবহুল স্যুটে বসে, যেখানে তিনি বিশ্বসেরা চিকিৎসকদলের সেবা পেয়েছেন। অ্যান্টিবায়োটিকের যে পরীক্ষামূলক ককটেল ডোজটি তাঁকে কভিড নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়েছে তা সাধারণ আমেরিকানদের নাগালের বাইরে।

ট্রাম্প যখন টুইটটি করেন তখন বাকি যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফা করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কারণ শীত আসছে। যদিও প্রথম দফার সংক্রমণ পুরোপুরি শেষ হয়েছে, সংখ্যাত্বত্ত্বের বিচারে এমন কথা জোর দিয়ে বলা যাবে না। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন করোনার নির্মমতা নিয়ে একটি সংস্করণ বের করতে যাচ্ছে (এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে) যেখানে দাবি করা হয়েছে, ‘অন্য কেউ মানুষের জীবন নিয়ে এমন বেপরোয়াভাবে ছিনিমিনি খেললে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতো।’

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্রের মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক জনাথন রেইনার বলেন, ‘ট্রাম্পের কথা শুনে আমার রাগ হচ্ছিল। সোয়া দুই লাখ আমেরিকান মারা গেছে। এদের বেশির ভাগই মৃত্যুর সময় একদম একা ছিল। এরা সবাই অবধারিতভাবে ভয় পেয়েছিল। এত স্বার্থপর প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্র আর পায়নি।’

গত দুই সপ্তাহ ধরেই ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা চরম বেপরোয়া আচরণ করেছেন। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার থেকে জারি করা সাবধানতা তাঁরা ন্যূনতম পালন করেননি। এই অবহেলার ফলও পাওয়া গেছে হাতে হাতে। হোয়াইট হাউস এবং রিপাবলিকান পার্টির ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের লোকজনের মধ্যে অন্তত ৩৪ জন এই সময়ের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। এদের মধ্যে ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়াও রয়েছেন। যদিও সরকারিভাবে হোয়াইট হাউসের প্রকৃত পরিস্থিতি জানানো হচ্ছে না। জানানো হচ্ছে না ট্রাম্পের স্বাস্থ্যের প্রকৃত হালও। তিনি প্রচারে বের হয়ে গেছেন অথচ তিনি করোনা নেগেটিভ কি না তা কেউ জানে না।

মাস্ক পরায় ট্রাম্পের অরুচি ছিল আগে থেকেই। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। এমনকি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের সঙ্গে বিতর্কের সময়ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। একই পরিস্থিতি ছিল গত ২৬ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের আসনে মনোনীত ব্যক্তির নাম ঘোষণার জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানেও। সে অনুষ্ঠানে ২৫০ জন অতিথিকে দাওয়াত দেওয়া হয়। তাঁদের প্রায় কেউ মাস্ক পরে ছিলেন না। এর পর ১ অক্টোবর ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত হন।

বিষয়টি নিয়ে এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের আফ্রিকান আমেরিকান সম্পর্কবিষয়ক বিভাগের অধ্যাপক ক্যারোল অ্যান্ডারসন বলেন, ‘রাষ্ট্র নামের এই জাহাজে রিপাবলিকানরা হচ্ছে আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী।’

২৬ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠান নিয়ে গণস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও উদ্বিগ্ন। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত বহু মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলেও বাকিদের আলাদা করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তারা কোথায় গেল, কাদের সংস্পর্শে এল সে বিষয়টি নিশ্চিত করারও কোনো চেষ্টা নেই। ফলে এরা সম্ভবত পাগলা ঘোড়ার মতো চারপাশে ছুটে জীবাণু ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। অধ্যাপক রেইনারের মতে, হোয়াইট হাউস থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সম্ভবত একটি মাত্র কারণে। তা হলে তারা জানত এই ভাইরাসবাহী প্রধান ব্যক্তিটি ছিলেন ট্রাম্প নিজে। তিনি বলেন, ‘প্রতি আক্রান্ত ব্যক্তি তার বৃত্তের গড়ে আড়াইজনের ওপর এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। ওই অনুষ্ঠানে যদি ৩০ জন আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে মোট কত জনকে তারা সংক্রমিত করেছে?’

তবে ট্রাম্প যে শুধু এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন তা নয়। কভিড নিশ্চিত হওয়ার পরও তিনি শুধু সমর্থকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গাড়ি নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যান। এ সময় তিনি এন-৯৫ মাস্কও ব্যবহার করেননি। সাধারণ কাপড়ের মাস্ক পরেছিলেন। যে চালক গাড়ি চালাচ্ছিলেন এবং যে নিরাপত্তাকর্মী তাঁর সঙ্গে ছিলেন তিনি নিঃসন্দেহে ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। শুধু তা-ই নয়, হোয়াইট হাউসে পৌঁছানোর পর তিনি ছবি তোলার জন্য তাঁর মাস্কটি খুলে ফেলেন। ঝুঁকিতে পড়েন ওই প্রাসাদের বাকি কর্মীরা। ট্রাম্পের যেদিন কভিড পজিটিভ হয় সেদিনই রিপোর্ট পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ানে করে নিউ জার্সিতে তাঁর গলফ ক্লাব ব্যাডমিনিস্টারে যান। সেখানে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। প্রায় ২০০ রিপাবলিকান ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ১৯ জন আড়াই লাখ ডলার করে চাঁদা দেন। অনুষ্ঠানে ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের ১৯ জন অতিথিকে আপ্যায়ন করেন। সেখানে সামাজিক দূরত্বের কোনো বালাই ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তখনই ট্রাম্পের মধ্যে করোনার লক্ষণ ছিল।

স্যান্ড্রা ডিয়ান ব্যাডমিনিস্টারে কাজ করতেন ২০১৪ পর্যন্ত। এখনো তাঁর অনেক বন্ধু ওখানে কাজ করেন। ডিয়ান বলেন, ‘আমার শহরের বহু মানুষ করোনায় মারা গেছে। আমার পরিবারের অনেক সদস্যকেও এ সময় হারিয়েছি। ব্যাডমিনিস্টারে কাজ করছে আমার এমন বন্ধুরা এখন ভয় পাচ্ছে। গরিব মানুষের কাছে অসুখের অর্থই হচ্ছে বেকার হয়ে যাওয়া। আর হাসপাতালগুলোতে এখন শয্যা খালি পাওয়াই কঠিন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এদের কথা ভাবেন না। তিনি শুধু নিজেকে নিয়েই আছেন।’

সূত্র : সিএনএন।