আজ ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির গবেষণার ফল নিয়ে সংশয় অনেকের

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: হঠাৎ করেই যেন দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হলো স্বাস্থ্য খাতের গবেষক থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত। গত সোমবার দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতির ওপর আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির গবেষণার ফল প্রকাশের পর গতকালও চলে ওই গবেষণার ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ এবং জল্পনাকল্পনা।

 

গবেষণাটির গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ। বিশেষ করে গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে ঢাকার অর্ধেকের বেশি মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার হিসাব মিলে যাওয়ায় প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। সমালোচনাকারীরা বলছেন, গবেষণাটি ছিল খুবই ছোট পরিসরে, যা ঢাকা মহানগরীর সব বাসিন্দার সঙ্গে হিসাব করা যাবে না। কেউ কেউ এই গবেষণার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও প্রক্রিয়াগত কারণে বেশ দুর্বল বলে মত দিয়েছেন।

 

কেউ কেউ বলছেন, গবেষণার ফলাফল পুরো ঢাকাকে প্রতিনিধিত্ব করলেও অ্যান্টিবডির ক্ষেত্রে পুরো ঢাকা প্রযোজ্য হবে না সীমিত পরিসরে গবেষণার কারণে। একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, গবেষকরা হয়তো কোনো না কোনো কারণে তাঁদের অবস্থান থেকে পিছু হটেছেন।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজির অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘আমরা সবাই দেশের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি দেখার জন্য একটি গবেষণার তাগিদ দিচ্ছিলাম।

 

সেটা হয়েছে। কিন্তু এর ভেতরে গলদ রয়ে গেল, যা দুঃখজনক। আর এই ছোট পরিসরের গবেষণাকে আমরা ঢাকার সব মানুষের সঙ্গে তুলনা করতে পারব কি না সেটাও পরিষ্কার করা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘তিন মাসব্যাপী যখন একটি সংক্রমণ নিয়ে কাজ করা হবে, তখন সময়ভিত্তিক আলাদা বিশ্লেষণ থাকা দরকার ছিল।

 

কারণ এপ্রিল মাসের সংক্রমণ আর জুলাই কিংবা আগস্টে সংক্রমণ পরিস্থিতিও যেমন এক ছিল না; আবার অ্যান্টিবডি অর্জনের হারও এক হবে না, অবশ্যই সময়ে সময়ে পরিবর্তন হয়েছে। এমনকি জুলাই-আগস্টের পরও গত দুই-আড়াই মাসে পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সেভাবে বিশ্লেষণগুলো আমরা পেলাম না। ফলে একটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে এবং গবেষণাটির গুরুত্ব কমে গেছে।’

 

অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, বস্তিবাসীর মধ্যে সংক্রমণের হার ৬ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশের অ্যান্টিবডি তৈরি হলে আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত বস্তিতে শতভাগ মানুষের অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার কথা।

 

সেটা কি হয়েছে বলে আমরা ধরে নিতে পারব? অন্যদিকে বস্তির বাইরে এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ৯ শতাংশ সংক্রমণের বিপরীতে ৪৫ শতাংশ অ্যান্টিবডি তৈরি হলে গত আড়াই মাসে তা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

 

এ ক্ষেত্রে বস্তির বাইরে ৯০ শতাংশের অ্যান্টিবডি হওয়ার কথা। এই দুই সমীকরণে ঢাকায় বস্তি কিংবা বস্তির বাইরে নিশ্চিতভাবেই হার্ড ইমিউনিটি হয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি জোগায়।

 

আর যদি তা-ই হয়, তবে এখন প্রতিদিন সরকারি হিসাবে যে ১১ থেকে ১২ শতাংশ শনাক্ত হার দেখানো হচ্ছে, তা হওয়ার যুক্তি মিলে না। অন্যদিকে মোট শনাক্ত হার ১৮ শতাংশের নিচে নামছে না, সেটারও যুক্তি কী?

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইইডিসিআরের একজন সাবেক বিজ্ঞানী প্রথমবার্তাকে বলেন, দেশে অ্যান্টিবডি টেস্টের তাগিদ ছিল বিশেষজ্ঞ কমিটি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকেও।

 

কিন্তু সরকার কোনোভাবেই অ্যান্টিবডি টেস্টে যেতে রাজি হয়নি নানা অজুহাতে। এখন ওই ইস্যুটি ধামাচাপা দেওয়ার কৌশল হিসেবেও বেশির ভাগ মানুষেরই অ্যান্টিবডি হয়ে গেছে বলে প্রকাশের চেষ্টা করা হয়েছে কি না সেটাও ভাবার সুযোগ রয়েছে।

 

এ ছাড়া অ্যান্টিবডিকেন্দ্রিক কোনো কারসাজির অংশ হিসেবেও এটাকে দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন এই বিজ্ঞানী। তিনি এই গবেষণাকে হার্ড ইমিউনিটির এক ধরনের ফানুস দেখানোও বলেছেন।

 

তবে গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের অবস্থান থেকে পিছুটান দেইনি।

 

আমরা ঠিক জায়গাতেই আছি। তবে এটা ঠিক যে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার কারণে গবেষণাটির ব্যাপ্তি আর বাড়ানো যায়নি। এ ছাড়া অন্য কোনো কারসাজি বা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো বিষয় নেই।’

 

তবে তিনি যোগ করেন, ‘গবেষণাটি কোনো অবস্থাতেই পুরো ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। এটি একটি ছোট পরিসরের ক্লিনিক্যাল গবেষণা। এক কোটি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে বলে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে আমরা এমন কোনো তথ্য দিইনি এবং এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও নেই।’

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘গবেষণার মাধ্যমে গবেষকরা নিজেরা টার্গেট এলাকা ঠিক করে মানুষের ঘরে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং তা আরটিপিসিআরে টেস্ট করেছেন।

 

অন্যদিকে অ্যান্টিবডির জন্য রক্ত সংগ্রহ করে তা আলাদা টেস্ট করেছেন। আর আমাদের তথ্য হচ্ছে, যারা নিজেরা আমাদের কেন্দ্রগুলোতে এসে নমুনা দিচ্ছে, তাদের নমুনা আরটিপিসিআর ল্যাবে টেস্ট করে করোনায় আক্রান্ত কি না, সেটা দেখা হয়। আমরা কোনো অ্যান্টিবডি টেস্ট করিনি। ফলে দুটি দুই ধরনের ব্যবস্থাপনা। একটির সঙ্গে আরেকটি মিলবে না।’

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘আমার কাছে এই গবেষণার ফলাফল গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়েছিল। তবে এখন যদি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকেই বলা হয়, এটি খুবই ছোট পরিসরের এবং পুরো ঢাকাকে প্রতিনিধিত্ব করে না, তবে প্রশ্ন আসতেই পারে, দেশের সবচেয়ে বড় দুটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমন একটি গবেষণার নামে কি করল?

 

কেন তারা এত ছোট দুটি কাজ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করল। নাকি এর আড়ালে অন্য কিছু আছে।’ তিনি বলেন, ‘এত দিন সবাই বলছিল, বস্তিতে বসবাসকারীরা করোনায় আক্রান্ত হয় না।

 

যদি গবেষণার তথ্য ঠিকই হবে, তবে এই যে ৭৪ শতাংশ আক্রান্ত হয়ে গেল—এর জবাব কি বা কে দেবে। আবার যদি বস্তির বাইরের প্রায় ৫০ শতাংশ লোক আক্রান্ত হয়ে থাকে, তাদের আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ কেন রাখা হলো। এর দায় এখন কে নেবে?’

 

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন প্রথমবার্তাকে বলেন, গবেষণায় আরটিপিসিআর টেস্টের ভিত্তিতে যে সংক্রমণ হার দেখানো হয়েছে, সেটা পুরো ঢাকা মহানগরীকে প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু অ্যান্টিবডি যতটুকু পর্যায়ে করা হয়েছে, সেটা পুরো ঢাকাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে অ্যান্টিবডি টেস্টের যে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে, সেটা সীমিতই বলতে হবে। এই গবেষণার পরিধি আরো বাড়ানো দরকার ছিল।

 

 

গবেষণার ফল প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের ব্যাখ্যা : এদিকে গতকাল মঙ্গলবার রাতে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরিন এক বিবৃতিতে সোমবার করোনা সংক্রমণ নিয়ে আইইডিসিআর ও আইসিডিডিআরবির যৌথ গবেষণার অন্তর্বর্তীকালীন ফল নিয়ে তাঁদের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন।

 

ওই ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, গবেষণাটি ঢাকা মহানগরীর প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র তুলে ধরেছে বলে দাবি করা হয়নি। কিন্তু কোনো কোনো গণমাধ্যমে গবেষণাটিতে সারা ঢাকা মহানগরীর চিত্র তুলে ধরেছে বলায় এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

 

এত কমসংখ্যক নমুনা পরীক্ষার ফলকে সারা ঢাকা মহানগরীর প্রতিনিধিত্বকারী চিত্র বলে সিদ্ধান্তে আসা উচিত হবে না। ঢাকা মহানগরীর প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে হলে ভবিষ্যতে প্রতিনিধিত্বমূলকসংখ্যক নমুনা সংগ্রহ করে আরো বড় পরিসরে গবেষণা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোকে এই বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে বিভ্রান্তি নিরসনে সহায়তা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।