আজ ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

অভিবাসী প্রত্যাশিরা বাইডেনের জয়ের দিকে তাকিয়ে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: নিউ ইয়র্কের অ্যালমহার্স্ট এলাকায় প্রায় পাঁচ বছর ধরে বসবাস করেন শফিক হাওলাদার নামের এক ব্যক্তি। ভ্রমণ ভিসা বি ওয়ান/বি টু-তে যুক্তরাষ্ট্রে এসে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের আশায় আবেদন করেছিলেন ছয় মাসের মাথায়। কিন্তু সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁকে সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য এখনো ডাকা হয়নি। ফলে বৈধভাবে এ দেশে থাকার ক্ষেত্রে তাঁর আদৌ কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, তা নিয়ে রয়েছে গভীর সংশয়।

শফিক হাওলাদারের মতো বহু বাংলাদেশি অভিবাসনের জন্য আবেদন করে ঝুলে আছেন বছরের পর বছর। আর যাঁরা অবৈধ উপায়ে এসেছেন তাঁদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়টায় অভিবাসনব্যবস্থা এগোচ্ছে ধীরগতিতে। টেনেসিতে বসবাসকারী অ্যাটর্নি রাজু মহাজন কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিবাসন ট্রাম্প সরকারের অগ্রাধিকারের কোনো বিষয় নয়।

একদিকে করোনা মহামারি, তার মধ্যে নির্বাচনী ডামাডোলের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা রয়েছেন গভীর শঙ্কা ও দুশ্চিন্তায়। তাঁদের প্রশ্ন, কী হতে যাচ্ছে? করোনায় প্রায় স্থবির অভিবাসনব্যবস্থা কি নির্বাচনের পর গতি পাবে, নাকি অবস্থা আরো খারাপ হবে? এমন অনেক প্রশ্নের কোনো উত্তর পাচ্ছেন না অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। এই অবস্থা কেবল বাংলাদেশিদেরই নয়, সবার জন্যই প্রযোজ্য।

বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাটর্নি রাজু মহাজন পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন নিজের মতো করে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে যদি ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেন বিজয়ী হন, তাহলে বর্তমানের অনেক ইমিগ্রেশননীতিতে পরিবর্তন আসবে। খুব সহজ করে বললে, বারাক ওবামার আমলে যে অভিবাসননীতি ছিল, আমরা সেই অবস্থায় ফিরে যাব। অর্থাৎ মানবিক অনেক ক্ষেত্র, যেমন অ্যাসাইলাম, উদ্বাস্তু সংকট দ্রুততার সঙ্গে সমাধান হবে। যেগুলো কার্যত অনেকটা বন্ধ রয়েছে, সেগুলো চালু হবে। অভিবাসনের বিষয়গুলো সহজ হবে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে।’ তিনি বলেন, জো বাইডেন বিজয়ী হলে অভিবাসনের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাবে। ইমিগ্রেশন বিচারপতির সংখ্যা বাড়বে। সিদ্ধান্ত দ্রুত আসবে।

কিন্তু রিপাবলিকান প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি আবারও বিজয়ী হন, তাহলে কী হবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে অ্যাটর্নি রাজু বলেন, ‘বর্তমান যে অবস্থা রয়েছে, এটাই বজায় থাকবে। অথবা এর চেয়ে আরেকটু খারাপও হতে পারে। আশ্রয়প্রার্থী ও উদ্বাস্তুদের কেসগুলো আগের মতোই ঝুলে থাকবে। এমনকি বিষয়গুলো আরো কঠিন হতে পারে।

অ্যাটর্নি রাজু মহাজন বলেন, ‘একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়, মেধাভিক্তিক অভিবাসন চালু হবে। দেখুন মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা এমনিতেই এখানে চালু রয়েছে। এই যে ইবি ক্যাটাগরি এটি তো মেধাভিত্তিকই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিজয়ী হলেও অভিবাসনব্যবস্থায় বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।’ তিনি মনে করেন, চেইন ইমিগ্রেশন বা পারিবারিকভাবে যাঁরা এ দেশে আসেন সেই ব্যবস্থা বন্ধ হবে না। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনব্যবস্থা পুরোপুরি মেধাভিত্তিক হয়ে যাবে, এমনটাও মনে করেন না তিনি।

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে এর আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ দেশে কারো জন্ম হলে সঙ্গে সঙ্গে যে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়, সেটা সাংবিধানিক একটি অধিকার। ফলে এটা পরিবর্তন করা অনেক বেশি কঠিন।

ডেমোক্রেটিক দল যাঁরা সমর্থন করেন, তাঁরা মনে করেন এই দলটি অভিবাসীদের জন্য ভালো। নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট ও শিক্ষাবিদ শেখ আল মামুন বলেন, ‘ডেমোক্র্যাট মানেই অভিবাসীবান্ধব। এটি তাদের কাছে অগ্রাধিকারের একটি বিষয়। কেননা এই দেশটি গড়ে তুলেছেন অভিবাসীরা। ডাকা কর্মসূচির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামাই এই ব্যবস্থাটি চালু করেছিলেন।

জানা যায়, ডেফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভাল বা ডাকা নামে একটি কর্মসূচির অনুমোদন দিয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। যেটিকে ড্রিম অ্যাক্ট বলা হয়। ২০১২ সালের ১৫ জুন সই করা ওই আদেশে যাঁরা শৈশবে মা-বাবার হাত ধরে অবৈধ উপায় এ দেশে এসেছিলেন কিন্তু কার্যত কোনো কাগজপত্র নেই, তাঁদের এ দেশে থাকার এক ধরনের বৈধতা দেওয়া হয়। প্রতি দুই বছর পর পর সেটি নবায়ন করতে হয়। এর মধ্য দিয়ে একজন আবেদনকারী যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ও কাজ করার অনুমতি পান। তবে শর্ত হিসেবে তিনি কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারবেন না। এই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় আট লাখ মানুষ নিবন্ধিত রয়েছেন।

তবে রিপাবলিকান পার্টির সমর্থকরা মনে করেন না যে তাদের দল অভিবাসীবান্ধব নয়। বাংলাদেশি আমেরিকান রিপাবলিকান ককাসের চেয়ারম্যান ওয়াসি চৌধুরী বলেন, ‘অনেকেই ভুলে যান, রিপাবলিকানদের কারণেই তাঁরা এই দেশে আসতে পেরেছেন।’ তিনি উল্লেখ করেন ‘১৯৮৬ সালের এমিনেস্টি দিয়েছিল রিপাবলিকানরাই। ওপি ওয়ান এবং ডিভি বা ডাইভারসিটি লটারির মাধ্যমে অনেকে এ দেশে এসেছেন, সেটাও দিয়েছে রিপাবলিকানরাই।’

ওয়াসি চৌধুরী মনে করেন, রিপাবলিকানরা আনডকুমেন্টেড অভিবাসীদের ক্ষেত্রেই কেবল একটা সিদ্ধান্তে আসতে চায়। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অপরাধীদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার পক্ষে। তিনি সীমান্তে দেয়াল দিতে চান, দিচ্ছেন। দেশকে সুরক্ষিত করতে চান তিনি।’

এই রিপাবলিকান সমর্থক অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রেসিডেন্টের চেয়ে অনেক বেশি মানুষকে ডিপোর্ট বা অবৈধদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা।

জানা গেছে, ওপি ওয়ান চালু করেছিলেন জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ ১৯৮৯ সালের দিকে। রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট যিনি সিনিয়র বুশ নামে পরিচিত, তিনি ‘ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট অব ১৯৯০’ সই করেছিলেন। ডেমোক্রেটদের সমর্থন নিয়েই ১৯৯০ সালের ২৯ নভেম্বর এই কার্যক্রমে সই করার মধ্য দিয়ে চালু হয় ডিভি লটারি বা ডাইভারসিটি ভিসা কর্মসূচি। এর মধ্য দিয়ে পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর জন্য লটারির মাধ্যমে বছরে ৫৫ হাজার অভিবাসী ভিসা ইস্যু করা হয়।