আজ ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

একদিনে রেকর্ড ৩ লাখ ৮১ হাজার শনাক্ত, মৃত্যু ১১ লাখ ছাড়িয়েছে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: করোনাভাইরাস মহামারিতে বিশ্ব যখন একটি কার্যকর টিকার দ্বারপ্রান্তে, তখন সংক্রমণ নিয়ে একটি ভয়াল দিন পার হলো। গত বুধবার বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক তিন লাখ ৮১ হাজার ৩৬৭ জনের শরীরে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। গত ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহানে প্রথমবারের মতো মানবদেহে করোনা শনাক্তের পর এই প্রথম ২৪ ঘণ্টায় বিপুলসংখ্যক মানুষ সংক্রমিত হলো। মূলত ইউরোপে ফের উদ্বেগকজনক হারে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় সৃষ্টি হয়েছে এই পরিস্থিতির। এরই মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার বৈশ্বিক প্রাণহানি ১১ লাখ ছাড়িয়েছে। অবশ্য কয়েক মাস ধরেই মৃত্যুহার ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে।

করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি তাত্ক্ষণিকভাবে ওয়ার্ল্ডোমিটার ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে আসছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। সেখানকার তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক দৈনিক সংক্রমণ তিন লাখের কোঠা ছাড়িয়ে যায়। এরপর ৪১ দিনের মধ্যে ২২ দিনই এই পরিস্থিতি দেখা যায়। সর্বশেষ গত বুধবার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে শনাক্তের সংখ্যা পৌনে চার লাখ ছাড়িয়ে যায়।

ওয়ার্ল্ডোমিটারের লেখচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, করোনার ৯ মাসের মধ্যে শুরুর পাঁচ মাসে দৈনিক সংক্রমণ এক লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০ মে থেকে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। জুলাইয়ের শুরুতে দৈনিক সংক্রমণ দুই লাখের কোঠা পার করে। এ মাসেরই শেষে সংক্রমণ তিন লাখ ছুঁই ছুঁই করছিল। গত মাসের শুরুতে ২৪ ঘণ্টায় সেই তিন লাখ আক্রান্ত শনাক্তের ঘটনা ঘটে।

তবে স্বস্তির বিষয় হলো, সাড়ে ছয় মাস ধরে বৈশ্বিক মৃত্যুহার ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। বর্তমানে মৃত্যুহার কমে ৩.৬৩ শতাংশে নেমেছে। ওয়ার্ল্ডোমিটার জানাচ্ছে, গত ২ ফেব্রুয়ারি এক দিনে কভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠে ৫০৪ জন, প্রাণহানি ঘটে ৫৮ রোগীর। অর্থাৎ ২ ফেব্রুয়ারি এক দিনে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে সেরে ওঠে ৫৮.২০ শতাংশ আর প্রাণহানি হয় ৪১.৮০ শতাংশের। অবশ্য ওই মাসেরই শেষ দিন (২৯ ফেব্রুয়ারি) মৃত্যুহার নেমে আসে ৬.৫৭ শতাংশে। এরপর আরো দুই সপ্তাহ মৃত্যুহারে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। তবে মার্চের মাঝামাঝি থেকে মৃত্যুহার বাড়তে থাকে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এই হার দাঁড়ায় ২২ শতাংশে। এরপর আর মৃত্যুহার বাড়েনি। ধারাবাহিকভাবে কমে গত বুধবার নেমে এসেছে ৩.৬৩ শতাংশে। অর্থাৎ ওই দিন সুস্থতার হার দাঁড়ায় ৯৬.৩৭ শতাংশে। গতকাল পর্যন্ত বিশ্বের ২১৪টি দেশ ও অঞ্চলে কভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছে প্রায় দুই কোটি ৯৪ লাখ মানুষ। আর নথিভুক্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৯০ লাখে।

ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির কারণেই সর্বাধিক শনাক্ত
আক্রান্ত ও মৃত্যুর নিরিখে এখন পর্যন্ত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি মার্কিন মুলুকে সংক্রমণে ঊর্ধ্বমুখী ধারা দেখা যাচ্ছে। গত বুধবার সেখানে শনাক্ত হয় ৬০ হাজার রোগী, যেখানে আগের দিনই এই সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার।

এদিকে সম্প্রতি ইউরোপের অনেক দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ দেখা গেছে। এর মধ্যে কিছু দেশের পরিস্থিতি প্রথম ঢেউয়ের চেয়েও ভয়াবহ। গত বুধবার ইউরোপের ৪৫টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা শনাক্ত হয়েছে এক লাখ ৪০ হাজার মানুষের। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল এক লাখ ছয় হাজারের মতো। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত রোগী বাড়ছে ইউরোপে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নানামুখী বিধি-নিষেধ আরোপ করছে সেখানকার কর্তৃপক্ষ। অবশ্য কোনো দেশই আর ঢালাও লকডাউনের দিকে মনোযোগী হয়নি। সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও আরো আটটি শহরে আগামী শনিবার থেকে কারফিউ জারি করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ বুধবার টেলিভিশনে নতুন বিধি-নিষেধ ঘোষণা করে বলেন, সংক্রমণের বিস্তৃতি ঠেকাতে কারফিউ জারি করা হলো। স্থানীয় সময় রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাইরে বেরোনো যাবে না। এই বিধি আগামী ছয় সপ্তাহ বলবৎ থাকবে।

আর জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল গত বুধবার বলেছেন, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ৩৫ বা ৫০ জনের সংক্রমণের প্রবণতা দেখা দিলেই যেকোনো এলাকায় বেশ কিছু কড়াকড়ি চালু হবে। পানশালায় রাতে কারফিউ এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে পার্টির ক্ষেত্রে কড়া নিয়ম মেনে চলতে হবে। মার্কেল আরো বলেন, আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহে কী করা হয়, তার ওপর এই মহামারির প্রভাব নির্ভর করবে। কড়া বিধি-নিষেধ সত্ত্বেও সংক্রমণের হার বাড়তে থাকলে আরো পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন তিনি।

এদিকে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে আজ শুক্রবার মধ্যরাত থেকে নতুন বিধি-নিষেধ চালু করা হচ্ছে। এক বাড়ির লোকজন আরেক বাড়ির লোকজনের সঙ্গে খেলাধুলা বা পানশালায় যেতে পারবে না। আর স্কুল ও বার বন্ধ করা হয়েছে চেক প্রজাতন্ত্র ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে; নেদারল্যান্ডসে ক্যাফে-রেস্তোরাঁ বন্ধের পাশাপাশি আংশিক লকডাউন জারি করা হয়েছে।

উত্তর আয়ারল্যান্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্বেগজনক হারে সংক্রমণ বাড়ায় পরবর্তী নোটিশ না দেওয়া পর্যন্ত আতিথেয়তার মতো বিষয়গুলো বন্ধ রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, আগামী চার সপ্তাহ বার ও রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকবে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও বিয়ের অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ ২৫ জন উপস্থিত থাকতে পারবে। অন্যান্য ক্ষেত্রে ১৫ জনের বেশি সমবেত হওয়া যাবে না।

টিকার জন্য মুখিয়ে বিশ্ব:
মহামারি ঠেকাতে একটি কার্যকর ও নিরাপদ টিকার জন্য মুখিয়ে আছে দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ। আগামী দুই মাসের মধ্যে টিকা পরীক্ষার তৃতীয় ধাপ পার করার আশায় আছে কয়েকটি প্রকল্প। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে করোনার টিকার অনুমোদন দিয়ে গত আগস্টে বিশ্বজুড়ে হৈচৈ ফেলে পুতিনের দেশ রাশিয়া। এরই মধ্যে ‘স্পুিনক-ভি’ নামের এই টিকার ১২০ কোটি ডোজের ফরমাশ দিয়েছে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ১০টি দেশ। তবে বড় ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন দেওয়ায় টিকাটির নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় আছে। এরই মধ্যে গতকাল আরেকটি টিকার অনুমোদন দিয়েছে মস্কো। আর চীন জানিয়েছে, আগামী নভেম্বর বা ডিসেম্বর নাগাদ তাদের টিকা সাধারণের নাগালে আসতে পারে। বর্তমানে চীনের তৈরি চারটি টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের শেষ পর্যায়ে আছে।

এরই মধ্যে চীনের বায়োটেক কম্পানি সিনোভ্যাক উদ্ভাবিত টিকা করোনাভ্যাক নিয়ে আশা-জাগানিয়া খবর মিলেছে। সম্প্রতি ব্রাজিলে পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ওই টিকার ‘খুবই ইতিবাচক’ ফল পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সাও পাওলোর গভর্নর জেয়াও দোরিয়া। তিনি আশা করছেন, আগামী ডিসেম্বরে ব্রাজিলে এই টিকার প্রয়োগ শুরু হবে।

করোনার টিকা নিয়ে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩০০ টিকা প্রকল্প চলছে। এর মধ্যে ৪০টি টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবশরীরে পরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে অন্তত ৯টি টিকা আছে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে। রাশিয়ার টিকা ‘স্পুিনক-ভি’ও আছে এর মধ্যে। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে টিকাটি সাধারণ মানুষের দেহে প্রয়োগের অনুমতি পায়। অবশ্য চীন বলে আসছে, সেনাবাহিনী ও জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের ওপর তারা গত জুলাইয়েই টিকা প্রয়োগ করেছে।

করোনা মহামারির শুরুর দিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা তৈরি হয়। অ্যাস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি টিকাটির তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা চলাকালে একজন স্বেচ্ছাসেবী অসুস্থ হয়ে পড়েন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রায়াল স্থগিত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে ফের চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা চলছে। তৃতীয় ধাপে মোট ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর টিকাটির কার্যকারিতা পরখ করা হচ্ছে।

জার্মানির সংস্থা বায়োএনটেকের সঙ্গে যৌথভাবে করোনার টিকা তৈরি করেছে মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানি ফাইজার। সম্প্রতি ফাইজারের প্রধান নির্বাহী অ্যালবার্ট বাউরলা জানিয়েছেন, ২৩ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর ওপর তৃতীয় ধাপের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেককে আবার বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছে। এই তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা কতটা সফল হলো, তা অক্টোবরের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যাবে। ফল ইতিবাচক হলে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করবে ফাইজার। তাদের টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে মৃদু থেকে মাঝারি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

আর যুক্তরাষ্ট্রের টিকা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্না জানিয়েছে, চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই তাদের পরীক্ষামূলক করোনার টিকার দুই কোটি ডোজ তৈরি করা হবে। ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডোজ টিকা তৈরির লক্ষ্য ঠিক করে রেখেছে তারা। আগামী নভেম্বর নাগাদ এই প্রতিষেধকের চূড়ান্ত কার্যকারিতা জানা যাবে বলে আশা করছে মডার্না।

সূত্র : বিবিসি, ডয়চে ভেলে, গার্ডিয়ান, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।