আজ ৭ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

খাদ্য সুরক্ষায় অবহেলা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: মানুষকে সুস্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সুষম ও মানসম্পন্ন খাদ্য। বিশেষজ্ঞদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খাদ্যের ‘স্বাস্থ্য’ ঠিক রাখা বা সুরক্ষার বিষয়টি। অর্থাৎ মাছ, ভাতসহ আরো কিছু খাদ্যে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও মানুষ এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করতে পারছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে—উৎপাদন থেকে শুরু করে মানুষের মুখ পর্যন্ত পৌঁছতে নষ্ট ও অপচয় হয়ে যায় সর্বোচ্চ ৪৪ শতাংশ খাদ্য। খাদ্য গ্রহণ করা হলেও তার বড় একটি অংশের কার্যত কোনো মান বা পুষ্টিগুণ থাকে না। আর যে খাদ্যের কোনো মান বা গুণ নেই সেই খাদ্যকে পুরোপুরি ‘খাদ্য’ বলতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে একদিকে মানুষ এখনো নিত্য আহার্য খাবারগুলোর মধ্যে ভাত ছাড়া বাকি কোনো খাদ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে খাচ্ছে না। সবচেয়ে কম খাওয়া হচ্ছে ফল, সবজি আর দুধ; যদিও এই মুহূর্তে দেশে এ ধরনের খাবারের সংকট নেই বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) গবেষণার ফল অনুসারে, কৃষিজাত ফসলের ক্ষেত কিংবা প্রাণিজ উৎসর খামার থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাদ্যপণ্য মানুষের মুখে যাওয়ার পথে ধাপে ধাপে নষ্ট ও অপচয় হয়। সঠিক প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ না হওয়া, মানসম্মতভাবে সংরক্ষণ না করা, সতর্কতা বা উপযুক্তভাবে পরিবহন না করা, তাপমাত্রা ঠিক না রাখা, ভোক্তা পর্যায়ে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত বা খাদ্য হিসেবে প্রস্তুত করতে না পারায় অনেক খাদ্য পচে যায়, নষ্ট হয় কিংবা খাবারের উপযোগী থাকে না। এ ছাড়া রান্নার কৌশল কিংবা সঠিক তাপে রান্না না করায় অনেক খাবার তার খাদ্যগুণ বা মান হারিয়ে ফেলে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ ১৬ অক্টোবর দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি নিয়েছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘সবাইকে নিয়ে একসাথে বিকশিত হোন, শরীরের যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। আমাদের কর্মই আমাদের ভবিষ্যৎ’।

বাংলাদেশের উৎপাদিত খাদ্য নষ্ট, অপচয় ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিষয়ে এফএওর বিশেষজ্ঞ ড. আগাপি হারুতাওনায়ান প্রথমবার্তাকে জানান, মূলত খাদ্যপণ্য সংগ্রহ, সরবরাহ, বাজারজাত ও বাসাবাড়িতে ব্যবহারে সঠিক সচেতনতার ঘাটতির কারণে খাদ্য নষ্ট ও অপচয় হচ্ছে বেশি। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে খাদ্যের অপচয় বা নষ্টের ঘটনা সর্বোচ্চ। অবশ্য বিশ্বের সব দেশেই দিন দিন খাদ্য সুরক্ষার বিষয়টি এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। কৃষক পর্যায় থেকে শুরু করে পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে যেসব জনবল জড়িত তাদের দক্ষতা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানো জরুরি বলেও এই বিশেষজ্ঞ অভিমত তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে ভোক্তাদের সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ঘরেও প্রচুর খাবার নষ্ট হয়, অপচয় হয় এবং মান নষ্ট হয় শুধু ভোক্তাদের অসচেতনতা বা পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে। এরই মধ্যে জাতিসংঘ খাদ্যসামগ্রীর এই সুরক্ষা বিষয়ে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে যা দেশে দেশে স্থানীয়ভাবে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করেছে।
এফএওর ওই বিশেষজ্ঞ জানান, সর্বশেষ ২০১৬ সালের এক জরিপ অনুসারে বিশ্বে মোট উৎপাদিত খাদ্যের ১৪ শতাংশ বা প্রায় ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের খাদ্য নষ্ট ও অপচয় হয়। বিশ্বের খাদ্য নষ্ট ও অপচয় সূচকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে।

বাংলাদেশে খাদ্য নষ্ট ও অপচয় বিষয়ক এক গবেষণার মুখ্য গবেষক এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসান।

নিজের গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি প্রথমবার্তাকে জানান, চলতি বছরের বিশ্বখাদ্য পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশ এখন ধান উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে, আলু উৎপাদনে ষষ্ঠ অবস্থানে এবং আম ও পেয়ারা জাতীয় ফল উৎপাদনে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে সবজি উৎপাদনে বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—এই প্রতিটি ফসল নিরাপদ পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। অনেক ফসল কেবল সংগ্রহের সময় জমিতে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যায়, অনেক ফসল সংগ্রহের পর সংরক্ষণের জন্য নেওয়া কিংবা বাজার পর্যায়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াগত কারণে পচে নষ্ট হয়ে যায় কিংবা অপচয় হয়। যে খাদ্যদ্রব্য যে আকারের পাত্র বা ব্যাগে যতটুকু পরিমাণে বহন করলে তা ভালো থাকে তার চেয়ে বেশি পরিমাণে ঠাসাঠাসি করে বহন করা হয়। আবার তাপমাত্রা সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয় না। যেখানে সংরক্ষণ করা হয় সেখানকার ব্যবস্থাপনাও দ্রব্যটি সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত নয়। আলো-বাতাসও হয়তো উপযুক্ত মাত্রায় থাকে না; কখনো কম থাকে কিংবা কখনো বেশি থাকে। তিনি বলছেন, বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ফল ও সবজির ক্ষেত্রে ২২ থেকে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট ও অপচয় হয়।

খাদ্য নষ্টের বৈশ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে অধ্যাপক কামরুল হাসান জানান, বিশ্বে নষ্ট ও অপচয় হওয়া খাদ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ ফল ও সবজি জাতীয় খাদ্য। এর পরই ৩৫ শতাংশ হচ্ছে মাছ ও সমুদ্রজাত খাদ্য, ৩০ শতাংশ বীজ জাতীয় খাদ্য এবং ২০ শতাংশ করে মাংস ও শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য।

খাদ্য নষ্ট বা অপচয় হওয়ার প্রভাব কোথায় গিয়ে পড়ছে সে বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বশেষ একটি চিত্র তুলে ধরে ওই কৃষি ও খাদ্য বিজ্ঞানী জানান, দিনে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৩৫০ গ্রাম ভাত খাওয়া উচিত হলেও এখানে ২০১০ সালে খাওয়া হতো জনপ্রতি ৪৫০ গ্রাম করে, ২০১৬ সালে কিছুটা কমে ৪০০ গ্রামে নেমে এসেছে। কিন্তু বাকি সব খাদ্য প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে কম খাওয়া হচ্ছে সবজি ও দুধ। দিনে একজন মানুষের ৩০০ গ্রাম সবজি জাতীয় খাদ্যের দরকার থাকলেও বাংলাদেশে জনপ্রতি খাচ্ছে ১৬৬ গ্রাম পর্যন্ত, দুধ প্রতিদিন ১৩০ গ্রাম করে খাওয়া উচিত হলেও ২০১০ সালে খেত ৩৫ গ্রাম করে। কিন্তু সর্বশেষ চিত্র অনুযায়ী খাওয়া হচ্ছে মাত্র ২৫ গ্রাম করে। এ ছাড়া দৈনিক ১০০ গ্রাম ফল খাওয়া দরকার হলেও খাচ্ছে মাত্র ৪৫ গ্রাম, মাংস ৪০ গ্রামের জায়গায় ২০ গ্রাম, ডিম ১৩০ গ্রামের জায়গায় মাত্র ৩০ গ্রাম, গম জাতীয় খাদ্য ৫০ গ্রামের জায়গায় ১৫ গ্রাম খাওয়া হচ্ছে। তবে কিছু অগ্রগতি হয়েছে মাছের ক্ষেত্রে। মাছ ৬০ গ্রামের জায়গায় ২০১০ সালে খাওয়া হতো ৫০ গ্রাম। কিন্তু সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী খাওয়া হচ্ছে ৬২ গ্রাম।

বিক্রেতা বা ভোক্তাদের অসচেতনায় খাদ্যমান বা পুষ্টিমান নষ্ট হওয়ার উদাহরণ দিয়ে ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, দুধ সংগ্রহের পরে যদি ২০ মিনিট দিনের খোলা আলোতে কিংবা উজ্জ্বল বাতির আলোতে থাকে তবে তার মান ২৮ শতাংশ কমে যায়। দুধ যত সময় বেশি আলোতে থাকবে ততই তার মান হারাবে। একইভাবে লিচু গাছ থেকে পাড়ার পর ১২ ঘণ্টায় ৯ শতাংশ, ৪৮ ঘণ্টায় ১৬ শতাংশ ও ৯৬ ঘণ্টায় ১৮ শতাংশ পুষ্টিগুণ হারায়। এভাবে যত সময় যাবে ততই পুষ্টিগুণ কমতে থাকবে।

অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, নষ্ট হয়ে যাওয়া বা পচা খাদ্য যেমন মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তেমনই যথাযথ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য খেতে না পারলেও লাভ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এসব দিকে মানুষের তেমন কোনো নজর নেই। অথচ উন্নত বিশ্বে এসব বিষয়ে নজরদারি করা হয় এবং সেখানকার সাধারণ ভোক্তারাও এসব ব্যাপারে সচেতন। যে কারণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ সালে ৪৯০ মিলিয়ন মেট্রিক টন দুধ খাওয়া যায়নি।

এদিকে চাহিদা পূরণের জন্য বাংলাদেশে পর্যাপ্ত চাল, গম, আলু, ডাল ও ভুট্টার মজুদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে চালের যে মজুদ আছে তা দিয়ে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন ধান কৃষকের ঘরে উঠবে। ফলে ধান-চাল আমদানি করার প্রয়োজন হবে না। দেশে গমের যা মজুদ আছে তা দিয়ে আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত, আলু আগামী বছরের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত, ভোজ্য তেল চলতি বছরের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত, ডাল আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এবং ভুট্টার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত।

এফএওর ‘মিটিং দ্য আন্ডার নিউট্রেশন চ্যালেঞ্জ’ প্রকল্পের বাজার ও বাণিজ্যনীতি উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ মনিরুল হাসান কভিড-১৯ মহামারিকালে বাংলাদেশের খাদ্য মজুদ ও বাণিজ্য বিষয়ে বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বোরো ধানের উৎপাদন আগের একই সময়ের চেয়ে ৬.৫ শতাংশ বেশি হয়েছে। একই সময় গমের উৎপাদন হয়েছে ১.২৪৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর বাইরেও ৫.১ মিলিয়ন মেট্রিক টন গম আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা দিয়ে বাংলাদেশে গমের চাহিদা সহজেই পূরণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, চলতি বোরো সংগ্রহ মৌসুমে সরকার আট লাখ মেট্রিক টন ধান এবং ১১.৫ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২.২০ লাখ মেট্রিক টন ধান এবং ৭.৬৭ লাখ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ করেছে।

খাদ্য নষ্ট ও অপচয় রোধে করণীয় বিষয়ে খাদ্যসচিব মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা সমন্বয় করব। কারণ খাদ্য উৎপাদন করলেই হবে না, খাদ্য সাশ্রয় করতে পারলেও অনেক ঘাটতি কেটে যাবে। এ জন্য সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতামূলক বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালাতে হবে। শিশুদের মধ্যে অভ্যাসগত শিক্ষা দিতে হবে। পরিবারে যে খাদ্যের অপচয় হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে সেটা রোধ করা যাবে পারিবারিক সচেতনতার মাধ্যমে। এ ছাড়া রান্নার বিষয়েও সচেতন হতে হবে, না হয় পুষ্টিগুণ রক্ষা হবে না।’