আজ ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নিজে অমানবিক ভাবে মেরে স্ত্রীকে পরিবারের হাতে তুলে দিলেন স্বামী

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ‘আমার সারা শইল্যে অনেক ব্যথা। যৌতুকের টাকার লাইগ্যা স্বামী-শ্বশুরবাড়ির লোকজন আমারে অনেক মারছে। তারা আমারে পাও দে-আ পারাইছে, কিল-ঘুসি দিছে। লাডি দে-য়া বাইরাইছে। কাঁটা কম্পাস দেয়া আমার জিব্বায় চাপ দিছে, ঘাই মারছে। এতে আমার মুখ থাইক্যা অনেক রক্ত পরছে। তাদের মাইরে আমি এখনো বিছানা থাইক্যা উঠতে বসতে পারছি না। ভাল কইরা কথাও কইতে পারি না।’ গতকাল বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মহিলা ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়ে অতি কষ্টে অস্ফুট কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, উপজেলার পুরুড়া গ্রামের আব্দুর জব্বারের মেয়ে মোছা. জান্নাত আক্তার। জান্নাত ভালুকা সরকারী কলেজের ডিগ্রি ক্লাসের শিক্ষার্থী।

ওই সময় অসুস্থ জান্নাত ও তার পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, মন দেয়া-নেয়া করে প্রায় দেড় বছর আগে একই উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের রান্দিয়া গ্রামের মেহের আলীর ছেলে সাঈদ আহম্মেদ জজের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের কিছু দিন পরই তারা পার্শ্ববর্তী গাজীপুর জেলার জয়নাবাজার এলাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি নেন এবং ওই এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। এদিকে, বিয়ের পর থেকেই জজ ফেইসবুকে বিভিন্ন মেয়ের সাথে চ্যাট ও মোবাইল ফোনে কথা বলতেন। এ নিয়ে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মাঝে প্রায়ই ঝগড়া হতো। একপর্যায়ে কারখানায় চাকরি করতে কষ্ট লাগে তাই চাকরি ছেড়ে ব্যবসা করার কথা জানালে জান্নাত তার বাবার নিকট থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে স্বামী সাঈদ আহম্মেদ জজকে দেন। পাশাপাশি, বিয়ের সময় জান্নাতকে তার বাবার দেওয়া দুই ভরি ওজনের স্বর্ণালংকারও তার স্বামী নিয়ে নেন। তাছাড়া, চাকরি করার সময় জান্নাতের বেতনের টাকাও নিজের মোবইলে উত্তোলন তার স্বামী নিয়ে নিতেন। পরবর্তীতে, জজ স্ত্রীর কাছে আরো তিন লাখ দাবি করতে থাকেন। কিন্তু ওই টাকা দিতে অস্বীকার করার ক্ষিপ্ত হয়ে জজ প্রায় দুই মাস আগে জান্নাতের পায়ে ভাতের ফুটন্ত পানি ঢেলে দেন। ওই ঘটনার পর জান্নাত তার বাবার বাড়ি অবস্থান করতে থাকেন।

এদিকে, মোবাইল ফোনে দেয়া স্বামীর আশ্বাসে গত মঙ্গলবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বাবার বাড়ির লোকজনকে না জানিয়ে স্বামীর বাড়িতে চলে যান জান্নাত। পরে, ওই দিন দুপুরে তার স্বামী তার কাছে আবারো তিন লাখ টাকা দাবি করেন। তবে, ওই টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় স্বামী ও শশুর বাড়ির লোকজন পরিকল্পিতভাবে জান্নাতকে দফায় দফায় মারধর করে তাকে গুরুতরভাবে আহত করে। ওই সময় তারা তার পায়ের রগ কেটে দেওয়ারও চেষ্টা করে। মারধরের সময় জান্নাতকে ব্লেড দিয়ে কেটে আগুনে পুড়িয়ে বস্তাবন্দি করে তার লাশ পাশের বিলে ফেলে দেওয়ার কথাও বলা হয়। ওই সময় হাতে পায়ে ধরে ওদের কবল থেকে রক্ষা পান জান্নাত।

পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে একটি অটোতে করে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিলে অটোচালক জান্নাতকে তার পিত্রালয়ে কাছে নামিয়ে দিয়ে চলে যান। পরে পরিবারের লোকজন তাকে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভালুকা মডেল থানা পুলিশ। ওই ঘটনায় জান্নাত আক্তার বাদী হয়ে ভালুকা মডেল থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। এতে, জান্নাতের স্বামী সাঈদ আহম্মেদ জজ, শ্বশুর মেহের আলী, ননাস লাইলী বেগম, ননাসের স্বামী হানিফ মিয়া, দেবর আতা ও রাকিবকে আসামি করা হয়েছে।

জান্নাত আক্তার বলেন, আমাকে বেদম প্রহারের পর ‘তার পর্ব শেষ’ উল্লেখ করে আমার স্বামী আমাকে তার পরিবারের লোকজনের হাতে তুলে দেয়। তারাও আমারে রুটি বানানোর বেলুন দিয়ে অনেক মারে। তাদের মাইরে আমার একটি দাঁত পড়ে যায়। তারা কাঁটা কম্পাস দিয়ে আমার জিহব্বায় ঘাই দেয় এবং চেপে ধরে। আমার পায়ের রগ কেটে ফেলার চেষ্টাও করে। তারা মারতে আমার মুখ থেকে স্বীকারোক্তি রেকর্ড করতে চায় যে, তাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নাই এবং তাদের কাছে আমার কোনো টাকাও পাওনা নাই। ওই সময় ব্লেড দিয়ে কেটে এবং আগুনে পুড়িয়ে বস্তা বন্দি করে আমার লাশ পাশের বিলে ফেলে দেওয়ার কথা বলেন তারা।

মোবাইলে কথা হলে জান্নাত আক্তারের স্বামী সাঈদ আহাম্মেদ জজ জানান, তিনি তার স্ত্রীর কাছে কোনো যৌতুক দাবি করেননি। তার এবং তার পরিবারের বিরুদ্ধে মারপিটের অভিযোগ মিথ্যা। বোনের ওপর নির্যাতনকারীদের উপযুক্ত বিচার দাবি করছেন মোছা. জান্নাত আক্তারের ভাই রাজিব।

ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন জানান, ওই ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।