আজ ১১ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সারাদেশে ব্যাপক হারে চলছে মাদক ব্যবসা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ততম এলাকা মগবাজার রেললাইন কেন্দ্রীক সন্ধ্যা হলেই কিশোর তরুণ ও যুবকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এদের মধ্যে বেশিরভাগ মাদক কারবারি। আবার অনেকে আছেন সেখানে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করেন। এ কারণে সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের তেমন বিচরণ নেই।

অতি সম্প্রতি সরেজমিনে সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইয়াবা কারবারি বাচ্চু আরমান, জুলমতসহ অন্তত ২০/২৫ জন ঘুরে ঘুরে এলাকায় মাদক বিক্রি করছিলেন। ঠিক একইভাবে কারওয়ান বাজার রেলগেট এলাকাসহ মতিঝিল, ফকিরাপুল, চানখারপুল ও ঢাকা মেডিক্যালের আশপাশের এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাস্তার দুপাশে ছোটখাটো টং বা ভাসমান দোকানের অভাব নেই। এসব এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাদক কারবারীরা ঘুরে ঘুরে মাদক বিক্রি করছে।

এছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কমলাপুর, খিলগাঁও, নয়াপল্টন, কাকরাইল, সায়েদাবাদ, মুগদা, বাসাবো, মীরপুর, মহাখালীসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে একইভাবে মাদক বিক্রি হয়। এসব মাদকের ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছেন, ভাসমান ও পথশিশু, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী, পাড়া মহল্লার বখাটে কিশোরদের একটি বড় অংশ। এদের বেশিরভাগ বিভিন্ন ধরনের নেশায় আসক্ত।

শুধু ঢাকাতেই নয়, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকার বাইরে কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন আগের চেয়ে মাদক কারবার কয়েকগুণ বেড়েছে। অভিভাবকদের অগোচরেই ভয়াল এই মাদক গিলে গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যত প্রজন্মকে। এতে অন্ধকারে ডুবছে শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যত।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যত প্রজন্ম শেষ হয়ে যাবে। চিকিৎসকরা বলছেন, মাদকের কারণে সমাজে বাড়তে পারে প্রতিবন্ধী শিশু। বাধাগ্রস্ত হতে পারে মানুষের স্বাভাবিকতা। নষ্ট হতে পারে মানসিক, শারীরিক বিকাশ। বাড়তে পারে আত্মহত্যার প্রবণতাও। তাই যেকোনো মূল্যে শিশুদের সমাজকে মাদক থেকে রক্ষা করতে হবে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের উৎপাদন ও চোরাচালান বন্ধ করতে হবে। কঠোরভাবে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে একটি আলোকিত প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। মাদকাসক্তির কারণে সমাজে নানা রকম বিশৃঙ্খলা বাড়বে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের সহায়তায় মাদক কারবার চলছে। মাদকের টাকায় বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। মাদকের কারণে তরুণ সমাজ ছিনতাই, খুনসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তবে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা কতটুকু আন্তরিকতার সঙ্গে চলছে তা নিয়ে তা বিভিন্ন এলাকার চিত্র দেখলেই বোঝা যায়।

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার ডুমাইন ইউনিয়ের ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডুমাইন গ্রামের গড়াই খেয়া ঘাটে প্রতিদিনই বসছে জুয়ার আসর। প্রতিদিন কয়েক লাখ লক্ষ টাকার জুয়া কেনা বেচা চলে এখানে। এছাড়া এ এলাকার বিভিন্ন জায়গায় অবাধে চলছে মাদকের কেনাবেচা। এসব চিহ্নিত মাদক কারবারী ও মাদক সেবীদের প্রকাশ্য বিচরণ আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এলাকা বাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তাদেরকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নেমে আসে খড়গ। বিশেষ করে এ এলাকায় মাদক কারবারিদের নিরাপদ স্থান হওয়ায় নির্বিঘ্নে ইয়াবার পাশাপাশি চলে ফেনসিডিল, টাফেনটা ট্যাবলেট, গাঁজা ও হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক।

এলাকাবাসীর তথ্যমতে, এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেশি লক্ষ্য করা যায় বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। নাম প্রকাশে অনিচ্চুক এ এলাকার কয়েক মুরব্বির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারীদের মধ্যে রয়েছে, আলী মোল্লাহ, জাফর সেক, সাইফুল মোল্লাহ, আমিরুল, শিমুলসহ আন্তত ২০ জন। এরা মাদকের টাকায় এলাকায় আলিশান বাড়ি গাড়ির মালিক হয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

তবে মাঝে মধ্যে পুলিশ এসব মাদক কারবারীদের দু-একজনকে আটক করলেও গডফাদাররা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী একজন সচেতন ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এসব মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে বলেও অজ্ঞাত কারণে এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোন জোড়ালো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই বন্ধও হচ্ছে না তাদের মাদক কারবার।

সম্প্রতি এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি সালমান মোল্লাহ ছেলে ছেলে টিটো মোল্লাহসহ ৯ জন। তবে তাদের কয়েকজন এখন জামিনে রয়েছে। তাই ডুমাইন গ্রামের এসব মাদকের ব্যাবসা বন্ধে প্রয়াজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় ডুমাইন গ্রাম ছিল পরিদপুর জেলার মধ্যে শিক্ষিত ও ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরী সবকিছুতে এ গ্রামের অনেক সুনাম ছিল।

অনেক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার অফিসার, আর্মি অফিসার এর জন্ম হয়েছে এই গ্রামে। কিন্তু গত কয়েক বছরে অত্র গ্রমে মাদক ছড়িয়ে পরার পর তরুন সমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। ঠিক একইভাবে কুষ্টিয়ার খোকসা, কুমারখালী, মিরপুর ও কুষ্টিয়া সদরসহ প্রতিটি থানায় ব্যাপকভাবে বেড়েছে মাদক কারবার। স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা মাদকের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে অভিভাবকরা আছেন চরম দুঃচিন্তায়।

মাদকের রুট বাড়ছে: সারাদেশে মাদক ছড়িয়ে পরার পাশাপাশি রুটও পরিবর্তন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গতকাল শুক্রবার বিমানবন্দরের কাস্টমস এবং এভিয়েশন সিকিউরিটি কর্তৃপক্ষ সোয়েটারের তিনটি কার্টন থেকে ৩৮ হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা জব্দ হয়েছে। সৌদি আরবে তৈরি পোশাকের নামে এ চালানটি পাচার করা হচ্ছিল।

ঢাকা কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার সানোয়ারুল কবীর বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে আপারিজ ইন্টান্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পোশাক রপ্তানি করা হচ্ছিল। এসএস সিয়াম অ্যান্ড সমি এটারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে ৪৩৯টি কার্টনে এসব পোশাক পাঠাচ্ছিল। ৪৩৯টি কার্টনের তিনটিতে সোয়েটারের পকেটে ইয়াবার প্যাকেটগুলো পাওয়া যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর এগুলো বিমানবন্দরের গুদামে আসে। পরে এভিয়েশন সিকিউরিটি কর্তৃপক্ষের এসব রপ্তানি পণ্যের ব্যাপারে সন্দেহ হলে কাস্টমসের সহায়তায় কার্টনগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়। এর মধ্যে তিনটি কার্টনে ইয়াবা পাওয়া যায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ (ডিএনসি) বিভিন্ন সংস্থার উপস্থিতিতে কার্টন থেকে ইয়াবাগুলো বের করা হয়। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’