আজ ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাতিল করলেও দেশে ব্যবিহার করা হবে রেমডিসিভির

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: মাত্র কিছুদিন আগেও যেসব ওষুধ সবচেয়ে বেশি আশার আলো দেখিয়েছিল করোনার উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসায়, একে একে সেই ওষুধগুলোর কার্যকারিতার হতাশাজনক প্রমাণ মিলছে। আগেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাতিল করেছিল প্রথম বহুল আলোচিত ওষুধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন। সেই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হলো আরো বেশি ভরসা তৈরি করা রেমডেসিভির ইঞ্জেকশন, লোপিনাভির-রিটোনাভির ও ইন্টারফেরন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংস্থাটির উদ্যোগে সলিডারিটি গ্রুপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রমাণ মিলেছে যে করোনায় আক্রান্তদের মৃত্যু ঠেকাতে এসব ওষুধ কার্যকর নয়। গত ১৫ অক্টোবর এসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। তবে স্টেরয়েড ব্যবহারে এখনো তুলনামূলক ভালো ফল পাওয়ার কথা বলেছে সংস্থাটি।

তবে রেমডেসিভির নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণার ফলাফল বা তথ্য আমলে নিচ্ছেন না দেশের বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, ওই ফলাফলে চিকিৎসার ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব আপাতত পড়বে না, বরং তুলনামূলকভাবে এখনো রেমডেসিভিরের কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ফার্মাকোলজি সোসাইটির সভাপতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘রেমডেসিভির যে একেবারে কাজ করছে না, তেমনটা কিন্তু বলা হয়নি নতুন গবেষণার ফলাফলে। বলা হয়েছে, ২৮ দিনের মধ্যে মৃত্যু কমাতে পারছে না। অর্থাৎ কার্যকারিতার গতি কম। তাই এ ক্ষেত্রে এখন আমাদের দেশের চিকিৎসকদের উচিত হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনার দিকে নজর রাখা এবং হঠাৎ করে বন্ধ না করে ধীরে ধীরে রেমডেসিভিরের ব্যবহার কমানো।’

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাসপাতালে যাওয়া জটিল রোগীদের এই ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই। বাংলাদেশেও এভাবে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের এই ওষুধটি দেওয়া হয়। শুরু থেকেই এর কার্যকারিতা কম বলেও জানানো হচ্ছিল। অন্য তিনটি ওষুধ বাংলাদেশে এমনিতেই খুব ব্যবহৃত হচ্ছিল না।

বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে সলিডারিটির মাধ্যমে এই কাজটি করেছে তার ওপর আস্থা রাখা যায় না। কারণ এটি কোনো মৌলিক গবেষণা নয়। বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে তাদের মতো একটি তথ্য জানিয়েছে। এরই মধ্যে রেমডেসিভিরের মূল কম্পানি ওই ফলাফলে আপত্তি জানিয়েছে। তাই এটির চূড়ান্ত কোনো সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত এই ওষুধটি চলতে কোনো বাধা নেই।’

সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন আহম্মেদ প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শুধু একটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেছে। তারা কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি বা দিতেও পারে না। অন্যদিকে এখন পর্যন্ত এফডিএ (যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন) বা এমন ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠান এটি বন্ধের কথা বলেনি। তাই আপাতত আমরাও এখানে রেমডেসিভির বন্ধের কোনো সিদ্ধান্তে যাব কি না, সেটি দেখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে হয়তো পরামর্শ দেবেন।’

শুরুতে যখন করোনা চিকিৎসায় হাইড্রেক্সিক্লোরোকুইন কাজ করছিল বলে প্রচার পায়, তখন দেশের যে কম্পানিগুলো আগে থেকে ওই ওষুধ তৈরি করে আসছিল, তারা উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছিল। এমনকি বিদেশেও রপ্তানি হয়েছে ওই ওষুধ। সরকারিভাবেও দেশে কয়েক লাখ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন কেনা হয়েছিল। একপর্যায়ে সেটি এফডিএ থেকে বন্ধের কথা বলা হলে বাংলাদেশেও করোনা চিকিৎসায় ওই ওষুধটির ব্যবহার থমকে যায়। পরে রেমডেসিভির নিয়েও আশার আলো দেখা দিলে সেটির উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় বড় কয়েকটি দেশীয় কম্পানি। রপ্তানিও হয় বিদেশে। বাংলাদেশেও সব কভিড হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে যাদের অবস্থা জটিল, তাদের চিকিৎসায় এই ওষুধটি ব্যবহার করা হয়। এখন সেটির ব্যবহার নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

যদিও একাধিক ওষুধ কম্পানির সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণার ফলাফল প্রকাশের আগে থেকেই তারা রেমডেসিভির উৎপাদন ও বাজারজাত কমিয়ে দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ওষুধ কম্পানির এক কর্মকর্তা প্রথমবার্তাকে বলেন, রেমডেসিভির ওষুধটি শুধু করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়া জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে এটি ব্যবহারের সুযোগ নেই। দেশে করোনা সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা এবং রোগীদের জটিলতা কমে যাওয়ায় রেমডেসিভিরের চাহিদাও কমে গেছে। রপ্তানিও কমে গেছে। শুধু রেমডেসিভিরই নয়, ফেবিপিরাভিরের ব্যবহারও কমে এসেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।