আজ ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নিরাপদ সড়ক : প্রয়োজন সমন্বয় ও সচেতনতা

মো. আবু নাছের: মুজিব বর্ষের শপথ, সড়ক করব নিরাপদ প্রতিপাদ্য নিয়ে চতুর্থবারের মতো দেশে পালিত হতে যাচ্ছে নিরাপদ সড়ক দিবস। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার।

 

যদিও বিশ^ব্যাপি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে তথাপি দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে প্রচেষ্টাও চলছে অবিরাম। আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারকারিদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে সরকার কাজ করছে।

 

আশার কথা হলো, নানামুখি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস এবং অংশিজনদের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে সড়কদুর্ঘটনা কমে আসছে। যদিও এ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। পাড়ি দিতে হবে সুদীর্ঘ পথ। তবে সরকারের সদিচ্ছা এবং অগ্রাধিকার এ কঠিন পথকে সুগম করবে নিঃসন্দেহে।

 

প্রতিটি মৃত্যুই বেদনার। সড়ক দুর্ঘটনায় যিনি মৃত্যুবরণ করেন তাঁর পরিবারকে দীর্ঘকাল ধরে বয়ে বেড়াতে হয় দুঃসহ যন্ত্রণা। আর যাঁরা প্রাণে বেঁচে যান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়ে, তাঁদের জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ। বেঁচেও তাঁরা ভোগ করেন মৃত্যুসম যন্ত্রণা।

 

কর্মশক্তি হারিয়ে পরিবার ও সমাজের জন্য হয়ে যান বোঝা। তাই নিরাপদ সড়কের দাবি যেমনি দিন দিন জোরালো হচ্ছে তেমনি এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি-বেসরকারি প্রয়াসও হচ্ছে শক্তিশালী।

 

দুর্ঘটনায় প্রাণ ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি বিশ্বব্যাপী একটি অন্যতম প্রধান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় এক কোটি চল্লিশ লাখ লোক দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং এগারো লাখেরও বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এআরআই’র প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অর্থোপেডিক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মোট রোগীর শতকরা ছাপ্পান্ন ভাগ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার।

 

সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর শতকরা ষাট ভাগই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, যাদের বয়স ষোলো থেকে পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে। দুর্ঘটনায় শুধু ব্যক্তির জীবনহানীই ঘটে না বরং পারিবারিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্র তার অবদান থেকে বঞ্চিত হয়।

 

নিরাপদ ও ভ্রমণবান্ধব সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সরকারের অগ্রাধিকার। টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট্য অর্জনে এবং জাতিসংঘ ঘোষিত ইউএন ডিকেড অভ একশন ফর রোড সেফটির আওতায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও এর ক্ষতি হ্রাসে আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে।

 

ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ কার্যকর করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইনগত কাঠামোর সাথে সমন্বয় করে ন্যাশনাল রোড সেফটি স্ট্রাটেজিক একশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

 

প্রতিপালন করা হচ্ছে সড়ক নিরাপত্তায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা। নিরাপদ সড়ক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি, সড়ক পরিবহণ উপদেষ্টা পরিষদ এবং জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

 

এছাড়া কাউন্সিল অনুমোদিত একশ এগারটি সুপারিশ বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করছে একটি টাস্কফোর্স। বিভিন্ন সময়ে গঠিত কমিটির সুপারিশের আলোকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

 

এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন তদারকিতে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে জাতীয় মনিটরিং কমিটি। এ কমিটি সড়ক নিরাপত্তাছাড়াও যানবাহনে শিশু ও নারীদের হয়রানি বন্ধেও কাজ করছে।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী মহাসড়কের পাশে পণ্যবাহি যানবাহন চালকদের জন্য প্রথমপর্যায়ে চারটি সড়ক-বিশ্রামাগার নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। দুর্ঘটনার জন্য অনেক সময় সড়ক-মহাসড়কের নির্মাণ-ত্রুটিকে দায়ি করা হয়।

 

ত্রুটি অপসারণের পাশাপাশি এআরআই’র সহায়তায় দেশব্যাপী বিভিন্ন মহাসড়কে একশ চুয়াল্লিশটি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। এরই মাঝে গৃহীত প্রকল্পের আওতায় একশ’ একুশটি স্পটের ঝুঁকি প্রবণতা হ্রাস করা হয়েছে।

 

একসময়ে মরণফাঁদ নামে পরিচিত ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এখন দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে সাইন-সিগনাল ও রোড মার্কিং স্থাপন, বাস-বে নির্মাণসহ হাইওয়ে পুলিশ ও সওজ কর্তৃক চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ স্পট ও করিডোরের উন্নয়নে গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়ন প্রকল্প। সড়ক নিরাপত্তা বিধানে সড়ক-মহাসড়কের স্থায়িত্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

এ বিষয়ে সরকার অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে স্থাপন করেছে ওজন স্কেল। দেশব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আরো অধিক সংখ্যক ওজন স্কেল স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়কমোহনা দুর্ঘটনার ঝুঁকিমুক্ত করার কাজও এগিয়ে চলেছে।

 

এর পাশাপাশি সড়কের পাশে যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধে পরিকল্পিত বাস স্টপেজ নির্মাণ করা হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে অপরিকল্পিত গতিরোধক দুর্ঘটনা ঘটায়, তাই সাড়ে পাঁচশ’ অপরিকল্পিত গতিরোধক এরই মাঝে অপসারণ করা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার কারণ, পরবর্তি ব্যবস্থাগ্রহণ এবং গবেষণাকাজে প্রত্যেকটি দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

 

আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে উন্নত বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও চালু করা হয়েছে রোড সেফটি অডিট। এ পর্যন্ত সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রায় পাঁচশ’ কিলোমিটার মহাসড়কে রোড সেফটি অডিট পরিচালনা করা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় তিনশ’ কিলোমিটারে এ অডিট কার্যক্রম চলমান।

 

গবেষণায় দেখা যায়, মহাসড়কের মাঝখানে বিভাজক স্থাপনের ফলে যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাপ বেড়ে যাওয়ায় সরকার মহাসড়কসমূহ পর্যায়ক্রমে চার বা ততোধিক লেনে উন্নীতকরার কাজ হাতে নেয়। বিগত এক দশকে প্রায় সাড়ে চারশ’ কিলোমিটার মহাসড়ক চার বা তদুর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে, ফলে এসকল মহাসড়কে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

 

একই সাথে প্রায় সাড়ে চারশ’ কিলোমিটার মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরার কাজ চলমান রয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি মহাসড়কের পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন নির্মাণ করা হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা তথা যানবাহন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে গত একদশকে ছোটবড়ো বারো শতাধিক সেতু, আঠারোটি ফ্লাইওভার ও ওভারপাস এবং সাতাশটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। এ সকল অবকাঠামো নিরাপদ সড়ক তৈরিতে রাখছে ইতিবাচক ভূমিকা।

 

সড়ক দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পদের ক্ষতির কমিয়ে আনতে সড়ক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মহাসড়কে ছোট আকারের যানবাহন দুর্ঘটনা বাড়াচ্ছে, তাই সরকার বাইশটি জাতীয় মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিক্সা চলাচল নিষিদ্ধ করে। এতে মহাসড়কগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তায় হাইওয়ে পুলিশ গঠন এবং এর জনবল বাড়ানো হয়েছে। সড়কের পাশে হাইওয়ে থানা স্থাপনের পাশাপাশি গতিসীমা লঙ্ঘনকারী মোটরযানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

 

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতকরণে প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে সরকার পেশাজীবী গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়িয়ে চলেছে। গাড়িচালকদের জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হবে। বিগত দুই অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রায় এক লাখ পঁচাত্তর হাজার পেশাজীবী চালককে সড়ক নিরাপত্তা ও অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

 

নারী গাড়িচালক তৈরির সুযোগও বাড়ানো হয়েছে। কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় চালকদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ড্রাইভিং কম্পিটেন্সি পরীক্ষা কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর লাইসেন্স প্রদান সহজতর করা ছাড়াও আরো পঁচিশটি মোটর ড্রাইভিং স্কুলের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে।

 

ডিজিটাল পদ্ধতিতে মোটরযানের ফিটনেস প্রদানে মিরপুরে স্থাপন করা হয়েছে ভেহিক্যল ইন্সপেকশন সেন্টার বা ভিআইসি। এ সুবিধা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। গাড়িচালকদের লাইসেন্স এবং যানবাহন রেজিস্ট্রেশনে জালিয়াতি বন্ধে বায়োমেট্রিক্সসমৃদ্ধ স্মার্টকার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। নাম্বারফলকে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সরবরাহ করা হচ্ছে রেট্রোরিফ্লেক্টিভ ট্যাগ।

 

 

বিআরটিএর পরিবহণ বিষয়ক সেবা সহজিকরণ করা হয়েছে। পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। ঘরে বসে এবং ভোগান্তি ছাড়া সেবা গ্রহণ করছে সেবা গ্রহিতারা। মহাসড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবহণ মালিকদের সহযোগিতায় ইতোমধ্যে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের অননুমোদিত বাম্পার অপসারণ করা হয়েছে সফলভাবে।

 

সড়ক নিরাপত্তায় পথচারি তথা সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাফিক আইন মেনে চলার পাশাপাশি যানবাহন চালানো অবস্থায় সিটবেল্ট বাঁধা এবং চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফুটওভার ব্রীজ ব্যবহারে জনগণকে সচেতন করতে নেয়া হয়েছে বিশেষ কর্মসূচি। বাধ্যতামূলক করা হয়েছে মোটর সাইকেল চালক ও আরোহীর জন্য হেলমেট ব্যবহার।

 

ঢাকা শহর ও দেশের অন্যান্য স্থানে পুরনো ও ত্রুটিপূূর্ণ মোটরযান এবং অদক্ষ লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি সড়ক-মহাসড়কে নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ নন-মটরাইজড যানবাহন চালনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সচেতনতা তৈরির অংশ হিসেবে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাক-প্রাথমিক থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

 

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রকৌশলগত ত্রুটি অপসারণের পাশাপাশি আইনের বাস্তবায়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা এ তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এ বাস্তবতায় জনসচেতনতা তৈরিতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাসমূহ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

 

 

একক কোনো কর্তৃপক্ষ বা সংস্থা নয়, সড়ক নিরাপদ করতে সকল অংশীজন এবং সরকারি উদ্যোগসমূহের কার্যকর সমন্বয় জরুরি। আমারা প্রত্যেকেই সড়ক ব্যবহারকারি।

 

 

তাই আসুন, নিজে সচেতন হই, অপরকে সচেতন করি এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলি; তবেই পূরণ হবে আমাদের নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা। নিশ্চিত হবে সড়ক নিরাপত্তা।