আজ ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মাদারীপুরে ঘাস-জঙ্গলে ভরে গেছে শিক্ষাঙ্গনের মাঠ

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: পৃথিবীর এমন দুঃসময় আগে দেখেনি মানুষ, অধরা স্বপ্নেরা আসে-আবার নিঃশব্দে ফিরে যায়। কবির এই বোধের উচ্চারণ বলে দিচ্ছে বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ কতটা ভয়ঙ্কর।

এখন পর্যন্ত এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ চলছে অবিরত। কবে শেষ হবে অদৃশ্য শত্রুর আস্ফালন-এ শঙ্কা এখনো কাটেনি। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণরোধে সরকার চলতি বছর ১৮ মার্চ থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করে।

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তায় সরকার সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসী ও বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রশংসা পেয়েছেন। দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থা আপাতদৃষ্টিতে অনুকুলে রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে।

তবে শঙ্কামুক্ত নয় বিবেচনা করে সরকার আরো এক মাস ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করেছে। এই দীর্ঘ ছুটির ফাঁদে পড়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষকরা। এরই মধ্যে ছুটির কবলে পড়ে শিক্ষাঙ্গনে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

ছাত্র-ছাত্রীদের কলরবে মুখরিত বিদ্যালয়গুলোতে বিরাজ করছে শুনশান নিরবতা। ঘাস-জঙ্গলে ভরে গেছে শিক্ষাঙ্গনের মাঠ। ইতোমধ্যে গ্রামের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বেশকিছু দরিদ্র শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে নেমে পড়েছে।

জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা মহামারি আকার ধারণ করায় চলতি বছর ১৮ মার্চ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৭ মাস শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকছে। এরই মধ্যে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৬ মাস স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার ছুটি পার হয়ে গেছে। আরো এক মাস বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর পরেও আগামী পরিস্থিতি অন্ধকারে। করোনার মহামারি নিয়ন্ত্রনে না আসলে হয় তো ছুটির মেয়াদ আরো বাড়তেও পারে বলে মনে করছেন শিক্ষকরা।

শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী গত এপ্রিল মাস থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে। আগস্ট মাস থেকে অনলাইন ক্লাসের ওপর আরো জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসে ক্লাস নিচ্ছেন। কিন্তু অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়ে নানামুখী সমস্যার কারণে কাঙ্খিত অর্জন আসছে না বলে জানান শিক্ষকরা। এসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফলের আশায় গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে শহরের স্কুলে আসে। তারা দরিদ্র পরিবারের এবং তাদের স্মার্টফোন ক্রয়ের কোনো সামর্থ নেই। হাতে গোনা দু‘একজনের থাকলেও তারা পায় না ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা, ব্রাডব্যান্ড ইন্টারনেট বা এমবি‘র খরচ বহনের সামর্থ নেই। এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারিভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সরবরাহ করা হয়নি, নিম্নমানের রাউটার, ইন্টারনেট ধীরগতি ও মানসম্পন্ন নয়। কখনো থাকে কখনো থাকে না। সুবিধা বঞ্চিত গ্রামীণ জনপদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ সমস্যা আরো প্রকট। ফলে ৮ থেকে ১০ ভাগ শিক্ষার্থীর বেশি অনলাইনে ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারছে না।

বেসরকারি এমপিও বহির্ভূত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাইরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক অতিথি বা খন্ডকালীন শিক্ষক কর্মচারী রয়েছে। বিগত মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সব ধরণের আয় বন্ধ। ফলে তারা ভাতা বা পারিশ্রমিক না পেয়ে চরম অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করছেন। পাশাপাশি এমপিওভূক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রাতিষ্ঠানিক বেতনের অংশ পাচ্ছে না। বহু শিক্ষক শহরে বাসা ভাড়া দিতে না পেরে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। অপর দিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরণের খরচ রয়েছে যেমন-বিদ্যুৎ বিল, ইন্টারনেট বিল, পানির বিল, দৈনন্দিন অফিস খরচ, অনলাইন ক্লাস পরিচালনাসহ আনুসাঙ্গিক ব্যয় বহন করা বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে করোনার মহামারিতে সৃষ্ট সমস্যার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

করোনায় দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মফস্বলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা করছেন শিক্ষক ও শিক্ষক নেতারা। পরবর্তীতে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানমুখী করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তাদের আশঙ্কা। রাজধানী ও বড় বড় শহরে সুযোগ সুবিধার তুলনায় মফস্বল শহর এবং গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অধিকতর সুবিধা বঞ্চিত বলে মনে করেন জেলা পর্যায়ের শিক্ষক নেতারা।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলার চরমুগরিয়া মার্চেন্টস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সরদার আব্দুল হামিদ বলেন, “করোনা মহামারি সবচেয়ে ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার। এর ক্ষতিকর প্রভাব আগামী কয়েক বছর থাকতে পারে। যা পুষিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। আর শিক্ষার্থী তো ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চিরতরে ঝরে যেতে পারে। আয় বন্ধ তাই খন্ডকালীন শিক্ষক-কর্মচারীদের পারিশ্রমিক দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের বেতনের প্রাতিষ্ঠানিক অংশ দিতে পারছি না।”

মাদারীপুর জেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও আলহাজ আমিনউদ্দিন হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক সৈয়দ আকমল হোসেন পিলু বলেন, “করোনা মহামারি আমাদের অগ্রসরমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে পিছিয়ে দিচ্ছে। ২৫/৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার সম্ভবনা রয়েছে। জানামতে আমাদের বিদ্যালয়ের বেশকিছু ছাত্র কেউ কৃষি শ্রমিক, কেউ ভ্যান রিকসা চালায়, কেউ অন্যান্য শ্রম বিক্রি করে দরিদ্র সংসারে সহায়তা করছে। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। আগামীতে সেসনজটের আশঙ্কা তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। করোনার কারণে বহুমুখী সমস্যায় জর্জরিত জেলার বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো।”

জেলা শিক্ষা অফিসার সুবল চন্দ্র দাস বলেন,“করোনা একটি বৈশ্বিক সমস্যা যা বিশ্বব্যাপি। শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও প্রভাব পড়বে। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। তবে ভালো শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বই পড়ে। গত এপ্রিল থেকে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। আগস্ট মাস থেকে এর ওপর আরো জোর দেওয়া হয়েছে। যাদের সুযোগ সুবিধা আছে তারা বাড়িতে টিভি দেখে, ল্যাপটপে বসে, গেম খেলে অলস সময় পার করছে। অনলাইন কা¬স নিচ্ছে কি নিচ্ছে না। হাটা-চলা করছে না। তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। আবার নানা কারণে অনেকে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। মোবাইল কোম্পানী চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে লিমিটেড এমবি বিক্রি করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রী কতজনের ক্ষমতা আছে লিমিটেড এমবি কিনে অনলাইন ক্লাসে অংশ নিতে পারে? বিষয়টি কর্তৃপক্ষ ও সরকারের নজরে আসা প্রয়োজন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিপর্যয় না হলেও প্রভাব পড়বে।”

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান শহরে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়। পর্যায়ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। ইউরোপ আমেরিকার মতো উন্নত দেশে মহামারি আকার ধারণ করে কোভিড-১৯। এরই মধ্যে বিশ্ব মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৩জন।