আজ ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

অটোপাস সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটোপাস বলে বিদ্রুপ করার কোনো সুযোগ নেই। তারা কিন্তু পরীক্ষা দেয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি নিয়েছিল। তাই তাদের কোনোভাবেই দোষ নেই।

গতকাল (২৮ অক্টোবর) ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির কলা অনুষদ আয়োজিত ‘এইচএসসি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষাঃ সমস্যা ও সম্ভাবনা’ বিষয়ে এক অনলাইন গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেছেন।

কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক তাহমিনা আহমেদের সভাপতিত্বে এই গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অধ্যাপক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড লিবার্টির পরিচালক ড. ফকরুল আলম।

তিনি বলেন, ‘আমি ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার পক্ষে। কিন্তু প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এজন্য যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করতে হবে। কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই পরীক্ষা যেন গতানুগতিক না হয়, তা খেয়াল রাখতে হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে ৭১ সালের পরিস্থিতির সাথে তুলনা করা মোটেই ঠিক হবে না।’

তিনি এইচএসসি পরীক্ষা না নেয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় অতিথি হিসেবে অংশ নেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইন, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক নেহাল আহমেদ এবং ভাসানটেক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন।

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড সহিদ আকতার হুসাইন বলেন, সরকার একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জীবনের চেয়ে পরীক্ষা বড় নয়। যেহেতু এই শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের একটি বিষয় আছে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হওয়াটা প্রয়োজন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ছিল মনুষ্যসৃষ্ট সংকট। আর এটি প্রাকৃতিক। প্রকৃতি সৃষ্ট করোনা নামের এই মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতেই পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। সেই জীবন রক্ষায় সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

উপাচার্য এ সময় নিজের এইচএসসি পরীক্ষার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমি ১৯৬৯ সালে এসএসসি পাস করেছি। আর ১৯৭১ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি দুইভাগে। মুক্তিযুদ্ধের আগে এক ভাগ হয়ে যায়। আর মুক্তিযুদ্ধের পরে ১৯৭২ সালে বাকি পরীক্ষা হয়েছে খুব সীমিত সিলেবাসে। কাজেই এবার যারা এইচএসসি পরীক্ষার্থী, তাদের কোনোভাবেই মনঃকষ্ট পাওয়ার কারণ নেই। হতাশ হওয়ার কিছু নেই।’

প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বলেন, সরকার দুটি সিদ্ধান্ত খুব ভালো নিয়েছে। একটি হলো –যথাসময়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে দেয়া। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি খুব জটিল ছিল। আরেকটি হলো- উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা না নেয়ার ঘোষণা। তিনি বলেন, ‘আমি বরাবর সব পরীক্ষায় ভালো করেছি। আমি পরীক্ষার পক্ষেরই মানুষ। এবার এইচএসসির ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম হলো। তবে পরীক্ষার্থীরা তাদের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। মানে তাদের পড়াশোনা যা করার, তা কিন্তু করেছিল। এই পরীক্ষা লাগে পরবর্তী পর্যায়ে ভর্তির জন্য। কিন্তু আমরা জানি সব বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদা পরীক্ষা নেয়। কাজেই এইচএসসির ফলাফলটা শুধু প্রাথমিক একটা বাছাইয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলে ভর্তির প্রক্রিয়া কিছুটা শিথিল করে দিতে পারে।’

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ নেহাল আহমেদ বলেন, কেউ যদি এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অটোপাস বলে বিদ্রুপ করে, তা অন্যায় হবে। জীবনের থেকে কোনো কিছুই মূল্যবান হতে পারে না।

তিনি বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে আমি আমার সন্তানকে কোনোভাবেই পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠাবো না। শুধুমাত্র সিলেবাস মানার স্বার্থে শিক্ষার্থীদের জীবনকে আমি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারি না।’

৮ অক্টোবর এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের পেছনে অন্যান্য দেশের পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ভারতে সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি বোর্ডের আওতায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা কোভিড-১৯ শুরুর আগেই শুরু করেছিল এবং তিনটি পরীক্ষা গ্রহণের পর স্থগিত করা হয়। এ ছাড়া হংকং, চীনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর কথায় সহমত পোষণ করে বৈশ্বিক কিছু তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন ভাসানটেক সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহমুদা খাতুন।

তিনি বলেন, ২০২০ সাল একটি অভিশপ্ত বছর। এ বছর অন্য অনেক কিছুর মতো সারা পৃথিবীতে শিক্ষাব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে। ইউনিসেফের একটি পর্যবেক্ষণের প্রসংগ টেনে তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় সারা বিশ্বের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৮ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিসেফের ওই পর্যবেক্ষণে ৪৮ টি দেশে স্কুল চালু রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে স্কুল চালু রাখা প্রসঙ্গে বলা হয়, এসব স্কুলের প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৪৭ কোটি ৩৯ লাখের বেশি শিক্ষার্থী এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ৭ কোটি ৭৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থী করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে একাধিক গবেষণা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার সংক্রমণ কম হয়েছে এবং ৪০ হাজারের বেশি মৃত্যু এড়ানো গেছে।

মাহমুহা খাতুন বলেন, করোনা সংক্রমণের কারণে বিশ্বব্যাপী মারাত্মক পরীক্ষাজট সৃষ্টি হয়েছে। এই জট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে।

এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের কোভিড এডুকেশন ট্র্যাকারের মাধ্যমে ১০০টি দেশের ওপর এক জরিপের কথা উল্লেখ করেন। সেই জরিপে দেখা গেছে, এসব দেশে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাগুলো বাতিল করা হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, হরিয়ানা, রাজস্থান, উড়িষ্যা, কেরালা, দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশসহ রাজ্য ও বোর্ড পর্যায়ে স্কুল-কলেজের বোর্ড পরীক্ষা ও সমাপনী পরীক্ষাসহ শত শত পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান আকন্দ। তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় সত্যি যে, আমাদের দেশে পরীক্ষা নেয়া ছাড়া বিকল্প উপায়ে শিক্ষার্থীদের মুল্যায়নের কোনো ব্যবস্থা আমরা কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। তবে এটি ঠিক যে, আমাদের গতানুগতিকতার বাইরে আসতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সেটা বুঝিয়ে দিয়ে গেল।’

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির জনসংযোগ পরিচালক সাজেদ ফাতেমী। অনুষ্ঠানটি ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল জুম বাংলার ফেসবুক পেইজ থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়।