আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

এসি বিস্ফোরণ ও আমাদের করণীয়

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: প্রতিদিন আমরা বিভিন্ন রকম দুর্ঘটনার খবর পাচ্ছি, পত্রিকার পাতা খুললেই দুর্ঘটনা আর লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। লাইভ টেলিকাস্টে যাচ্ছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে, আলোচনা হচ্ছে, তদন্ত হচ্ছে কিন্তু দুর্ঘটনা কমছে না। আমরাও সচেতন হচ্ছি না। কিছু দিনের মধ্যেই ঘটনাগুলো আমাদের মন থেকে মুছে যাচ্ছে।

 

দুর্ঘটনার খবর শুনা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। মৃত্যুর মিছিল শুধু দীর্ঘ হচ্ছে। হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ জনগণ হয়ে পড়ছে আতংকিত; আমরা এতোদিন গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার ও রান্না ঘরের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথাই শুনে এসেছি।

 

এসি বিস্ফোরণের ন্যায় অপ্রত্যাশিত এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এক ধরনের নতুন বিপদ হিসেবে যেন আত্মপ্রকাশ করেছে। মূলত এসিতে বিস্ফোরণ হয়ে আসা বেশিরভাগ রোগীর অবস্থা আশংকাজনক থাকে, কারণ তারা বদ্ধ ঘরে আবদ্ধ অবস্থায় থাকে, ঘর হতে বের হতে পারে না, ফলে শ্বাসনালি পুড়ে যায়। চিকিৎসকরা বলেন, শরীরের ১০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া মানুষটিরও যদি শ্বাসনালি পুড়ে যায় তিনি অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন।

 

এরকম দুর্ঘটনা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। সকল ক্ষেত্রে সচেতনতার মাধ্যমে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা বন্ধ করতে পারি, জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারি।

 

আসুন জেনে নেওয়া যাক এসির বিস্ফোরণের কারণসমূহ:

১। এয়ার কন্ডিশন সিস্টেমের অন্যতম প্রধান অংশ কম্প্রেসার। অনেক সময় কম্প্রেসারের ভেতরে জ্যাম, ময়লা লেগে থাকে, গ্যাস লিক হয়ে যেতে পারে। এই জ্যাম আর লিক সময়মতো সার্ভিসিং না করালে এটা বিস্ফোরণ ঘটানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।

 

২। এসির ফিল্টার ও ওয়াটার ড্রেনেজ লাইন নিয়মিত পরিষ্কার করা প্রয়োজন, নিয়মিত পরিষ্কার না করলে দুর্গন্ধযুক্ত বাতাস আসবে, একই সাথে দুর্ঘটনা ঝুঁকি থেকে যায়।

 

৩। অত্যাধিক ব্যবহার বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ সঠিকভাবে অনুসরণ না করার কারণে এসির প্রেসার বেড়ে গেলে কম্প্রেসার বিস্ফোরণ ঘটার সমুহ সম্ভাবনা থাকে।

 

৪। কেমিক্যাল বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতির কারণেও ঘটতে পারে এসি বিস্ফোরণের ঘটনা।

 

৫।  দূর্বল বা নেকেড ইলেকট্রিক কানেকশন, শর্ট সার্কিট ও অত্যাধিক বৈদ্যুতিক হাই ভোল্টেজ এর কারণে বিভিন্ন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। হাইভোল্টেজের কারণে যেকোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিসমূহ পুড়ে যেয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

 

৬। এসির ক্যাপাসিটি অনুযায়ী সঠিক মাত্রার ইলেকট্রিক ওয়্যার ব্যবহার না করলে ওয়্যার গরম হয়ে গলে গিয়ে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।

 

৭। নির্দিষ্ট বা স্ট্যান্ডার্ড রেটিং রেফ্রিজারেন্ট বা কুলিং গ্যাস ব্যবহার ও নিয়মিত সার্ভিসিং না করার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

 

৮। এসি চালু অবস্থায় ঘরের ভেতরে যেকোনো ধরনের আগুন জ্বালালে বা ধোঁয়া তৈরি হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে।

 

৭। বজ্রপাতও এসি বিস্ফোরণের মতো দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

 

আমাদের সচেতনতা ও সাবধানতাই পারে এসব দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে। এসি বিস্ফোরণের দুর্ঘটনা যেভাবে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে-

১। রুমের সাইজ ও অবস্থা বুঝে সঠিক ক্যাপাসিটির এসি ব্যবহার করা উচিত। কম বিটিইউ সম্পন্ন এসি বড় রকমের জন্য ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত নয়, ঝুঁকিপূর্ণ।

 

২। একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় এসি চালু রাখা যাবে না। সে ক্ষেত্রে এসি অতিরিক্ত গরম হয়ে আগুন ধরে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একনাগাড়ে আট ঘণ্টার বেশি এসি চালানো উচিত নয়। কয়েক ঘণ্টা চালিয়ে দু-এক ঘণ্টা বিরতি দিতে হবে, যেন এসি ঠাণ্ড হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়।

 

৩। বছরে কমপক্ষে একবার দক্ষ কারিগর দ্বারা এসি রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এসির বিভিন্ন পার্টস যেমন, কম্প্রেসার, কনডেনসার, এভাপুরেটর, ইত্যাদি পর্যবেক্ষণপূর্বক মেইন লাইন থেকে সকেট পর্যন্ত কোনো ফল্ট আছে কি না তা চেক করা প্রয়োজন।

 

৪। এয়ার কন্ডিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণের কাজের প্রধান অংশ হলো ফিল্টার পরিষ্কার রাখা ও প্রয়োজনীয় সময় ফিল্টার পরিবর্তন করা। এসির ভেতর প্রায় সময়ই ময়লা জমে থাকে, এটা খেয়াল রাখা প্রয়োজন। শীতের শেষে বা গরমের শুরুতে এসি ব্যবহার করার পূর্বে একবার ও গরমের শেষে যখন এসির ব্যবহার কমে যাবে সে সময় ফিল্টার পরিষ্কার করা বা প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে হবে।

 

৫। এসি দেয়ালে বসানোর সময় নির্দিষ্ট মাপ নির্ধারণ ম্যানুয়েল অনুসরণ পূর্বক বসানো উচিত। ছাদ হতে কতটুকু নিচে, সাইড ওয়াল থেকে দূরত্ব, ফ্লোর থেকে কতটুকু উপরে, কুলিং কম্প্রেসার এর অবস্থান এই সকল ম্যনুয়েল অনুযায়ী করা উচিত। আবার সঠিক জায়গায় এসি না বসানোর কারণে ঠাণ্ডা কম লাগার বিড়ম্বনাও থেকে যায়।

 

৬। বৈদ্যুতিক কানেকশন: কাজ শুরুর আগে মেইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নিতে হবে। সঠিক মাপের ওয়্যার, সুইচ ও অন্যান্য প্রটেকশন ব্যবহার করা হয়েছে কি না নিশ্চিত করতে হবে। সস্তা তার বা নিম্ন মানের কন্ট্রোল সিস্টেমের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকে যায়।

 

৭। সকল প্রকার লুজ কানেকশন পরিহার করতে হবে। এইটা শুধুমাত্র এসি নয়, সকল ক্ষেত্রেই। ওয়্যার বা কন্ট্রোল সিস্টেম গরম অনুভব বা অন্য কালার পরিলক্ষিত হলে দ্রুততম সময়েই প্রধান সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দক্ষ ইলেট্রিশিয়ানের সহায়তা নেয়া উচিত।

 

৮। ইদানিং বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়েই চলছে। বজ্রপাতের বৈদ্যুতিক হাই ভোল্টেজ এড়ানোর জন্য ভবনগুলোর ছাদে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। আর বজ্রপাতের সময় এসি বন্ধ রাখা নিরাপদ।

 

৯। এসি কেনার সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, বাজারে বিভিন্ন ব্রান্ডের নকল এসি পাওয়া যায়। এ সকল নকল পণ্যে সাধারণত নিম্নমানের ও পুরনো মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রাংশ ব্যবহৃত হয়। যা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সুতরাং এসি ক্রয় করার সময় এসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত।

 

১০। এসি চালনার পূর্বে রুমের ভেতর অস্বাভাবিক কোনো গন্ধ আছে কি না তা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। গরমের শুরুতে এসি পুনরায় ব্যবহার করার পূর্বে বৈদ্যুতিক সংযোগ, কন্ট্রোল সিস্টেম, ফ্যান ও ফিল্টার ইত্যাদি কি অবস্থায় আছে তা ভালোভাবে চেক করে চালনা করতে হবে।

 

১১। এসির সাইজ অনুযায়ী, ম্যানুয়েল অনুসরণ করে দক্ষ কর্মী দিয়েইএসি লাগানোও সার্ভিসিং করা উচিত। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর পুনরায় এসি চালু করতে গেলে অবশ্যই এসির সংযোগ পরীক্ষা করে নেওয়া প্রয়োজন।

 

এসির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নামমাত্র। বছরে এক কি দুই বার পরিকল্পনা মাফিক দক্ষ কারিগর দিয়ে সার্ভিসিং করা হলে সারা বছর নিশ্চিত থাকা যায়। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের সমন্নয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন এক জাতীয় দৈনিককে বলেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে এসি বিস্ফোরণে দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ১০০ থেকে ১৫০ জনের কাছাকাছি।

 

আমাদের দেশের বাজারে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্রান্ডের এসি বিদ্যমান। একই ক্যাপাসিটি কিন্তু ব্রান্ডের ভিন্নতার কারণে দামের পার্থক্য রয়েছে অনেক। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই সস্তার পিছনে ছুটি, আর বাণিজ্যিকগত কারণেই হোক অথবা নিয়মের বেড়াজালেই হোক বিভিন্ন অফার, গ্যারান্টি, ওয়ারেন্টি ও মূল্য ছাড়ের কারণে অনেক কিছু যাচাই-বাছাই না করেই পণ্য কিনে ব্যবহার করছি। ক্রয়ের ক্ষেত্রে এ সকল বিষয়সমূহ লক্ষ্য রেখে পণ্য ক্রয় করলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা যাবে। আমাদের সামান্য সচেতনতাই আমাদেরকে ও সমাজকে বিভিন্ন দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা ও ক্ষতি কমাতে পারে।

লেখক: পরিচালক লজিস্টিক
উত্তর পশ্চিম রিজিয়ন
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।