আজ ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

গোদাগাড়ীতে রফিকুল হত্যায় হেরোইন আত্মসাত ৫ জন পুলিশ সদস্য জড়িত

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: কথায় বলে লোভে পাপ আর পাপ বাবাকেও ছাড়ে না, হত্যা যেভাবে যতই গোপনীয় ভাবে করা হউক না কেন সত্যটা একদিন প্রকাশ হবেই। এবছরের ২২ মার্চ পদ্মার চরে পাওয়া যায় একটি লাশ।

 

ওই ব্যক্তি বজ্রপাতে মারা গেছেন বলে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলাও করা হলো। পরে থানায় হত্যা মামলা হলো। ঘটনার সাত মাস পর এ মামলায় গ্রেপ্তার এক ব্যক্তি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে হেরোইন আত্মসাত করার জন্য পুলিশের পাঁচজন সদস্য ওই ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন।

 

ঘটনাটি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার। নিহত ব্যক্তির নাম রফিকুল ইসলাম (৩২)। তার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার পোলাডাঙ্গা গাইনাপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম ফজলুর রহমান। নিহত রফিকুল টাকার বিনিময়ে সীমান্ত থেকে হেরোইন এনে দেয়ার কাজ করতেন।

 

 

গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রফিকুল হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ইসাহাক আলী ওরফে ইসা (২৮) নামে ওই যুবক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। ইসা গোদাগাড়ী পৌরসভার মাদারপুর মহল্লার রেজাউল ইসলামের ছেলে। তিনি গোদাগাড়ীর একজন বড় মাপের হেরোইন ব্যবসায়ী।

 

ইসার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, গোদাগাড়ী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান, এসআই আবদুল মান্নান, এসআই রেজাউল ইসলাম, কনস্টেবল শাহাদাত হোসেন ও কনস্টেবল শফিকুল ইসলাম হেরোইন বহনকারী রফিকুল ইসলামকে হত্যা করেন। ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন।

 

আদালত সূত্র জানায়, রফিকুলের কাছ থেকে হেরোইন উদ্ধারের অভিযানে কনস্টেবল শাহাদাত অংশ নিলেও তার সেদিন ডিউটি ছিল না। এ অভিযানের বিষয়ে আগে থানায় কোন সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করা হয়নি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই ২১ মার্চ রাতে ওই পাঁচ পুলিশ অভিযানে যায়।

 

২২ মার্চ সকালে গোদাগাড়ীর মাটিকাটা দেওয়ানপাড়া এলাকার পদ্মার চর থেকে রফিকুলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সেদিনই থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরে গত ১৭ জুন নিহতের স্ত্রী রুমিসা খাতুন বাদী হয়ে দুইজনের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলার আসামিরা হলেন- চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আবদুল মালেকের ছেলে শরিফুল ইসলাম (৩২) এবং একই এলাকার আজাদ আলীর ছেলে জামাল উদ্দিন (৩২)।

 

এদের মধ্যে জামালকে পুলিশ ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করে। যে রাতে রফিকুল খুন হন সেই রাতেই জামালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়। রাতেই দায়ের করা ওই মামলায় পলাতক আসামি হিসেবে নিহত রফিকুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে সকালেই তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

 

পরে মাদক মামলায় পুলিশ জামালকে দুই দিনের রিমান্ডে নেয়। রিমান্ড শেষে জামাল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেন। জামাল আদালতে বলেছিলেন, ২১ মার্চ রাতে তিনি এবং রফিকুল পদ্মা নদীর ওপারের সীমান্ত থেকে হেরোইন নিয়ে আসছিলেন। পদ্মার চরে হঠাৎ বজ্রপাত হয়। তখন তিনি রফিকুলকে হারিয়ে ফেলেন এবং নিজে অচেতন হয়ে পড়েন। পরে পুলিশ তাকে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করে। তিনি জানতে পারেন রফিকুল বজ্রপাতে মারা গেছেন।

 

তবে রফিকুল হত্যা মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামালের এই জবানবন্দী ছিল সাজানো। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভিন্নখাতে নিতেই বজ্রপাত বলা হয়। প্রথমে রফিকুল হত্যা মামলার তদন্ত করছিলেন গোদাগাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক নিত্যপদ দাস। ওই সময় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটির তদন্তভার নেয়।

 

২৩ জুন আদেশ হওয়ার পর ৭ জুলাই পিবিআইকে থানা থেকে মামলার নথিপত্র হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে পিবিআইয়ের রাজশাহী কার্যালয়ের এসআই জামাল উদ্দিন মামলাটির তদন্ত করছেন। তিনি সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে আসছিলেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিনি ইসাহাক আলী ইসাসহ তিনজনকে আটক করেন।

 

অন্য দুইজন হলেন- গোদাগাড়ীর মাদারপুর মহল্লার আজিজুল ইসলামের ছেলে ফরিদুল ইসলাম (২৫) এবং একই এলাকার আজাদ আলীর ছেলে মাহাবুর আলী (৩১)। তাদের পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

 

এ সময় ইসা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে রাজি হন। শুক্রবার সকালে তিনজনকেই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। এরপর দুপুরে রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উজ্জ্বল মাহমুদের কাছে শুধুমাত্র ইসা জবানবন্দী দিতে শুরু করেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে তার জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। ইসার জবানবন্দী গ্রহণ করা শেষ হলে তিনজনকেই রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

 

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ইসা তার জবানবন্দীতে নিজেকে কৃষক বলে দাবি করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, হেরোইন নেয়ার জন্য তিনি ভারতের মুর্শিদাবাদের কাশেম নামে এক ব্যক্তিকে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কাশেম প্রথমে তাকে নকল হেরোইন পাঠান। হেরোইনসেবীকে দিয়ে সেবন করালে বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর তিনি নিজেই ভারতে কাশেমের কাছে যান।

 

তখন কাশেম তাকে এবার আসল হেরোইন পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন।কথা অনুযায়ী, গত মার্চে ৫০০ গ্রাম হেরোইনের ওই চালানটি সীমান্ত পার হয়ে আসে। ইসা পুলিশের সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন। তিনি পুলিশের সঙ্গে চুক্তি করেন, হেরোইনের একটি চালান তিনি ধরিয়ে দেবেন। বিনিময়ে তাকে দুই লাখ টাকা দিতে হবে।

 

এ চুক্তির পর রফিকুল ও জামাল যখন তার হেরোইন নিয়ে আসছিলেন তখন ইসা এসআই মিজানুর, আবদুল মান্নান, রেজাউল ইসলাম এবং কনস্টেবল শফিকুল ও শাহাদাতকে নিয়ে মাটিকাটা দেওয়ানপাড়া সিঁড়িঘাট এলাকায় যান। জামাল ও রফিকুল হেরোইন নিয়ে ওই পথে এলে পুলিশ তাদের ধরে ফেলে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে রফিকুলের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। মারধরের একপর্যায়ে রফিকুল মারা যান। পুলিশ চরে তার লাশ ফেলে আসে। আর রফিকুলের সঙ্গে থাকা জামালকে ধরে এনে ১০০ গ্রাম হেরোইনের মামলা দেয়া হয়। আর অবশিষ্ট ৪০০ গ্রাম হেরোইন পুলিশ আত্মসাত করে।

 

ইসা তার জবানবন্দীতে বলেছেন, রাত সাড়ে ৯টার দিকে হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনাটি ঘটে। পুলিশের হাতে রফিকুলের মৃত্যু দেখে ইসা ভয় পেয়ে যান। তখন তিনি পুলিশকে তার এক আত্মীয় মারা যাওয়ার কথা বলে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যান। এই ঘটনার পর পুলিশ আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তাকে দুই লাখ টাকাও দেয়া হয়নি। পরে তিনি জানতে পারেন, ঘটনাটিকে বজ্রপাত বলে চালানো হয়েছে। জামালও মাদক মামলার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছেন যে তার সঙ্গে থাকা রফিকুল বজ্রপাতে মারা গেছেন।

 

তবে রফিকুলের লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এদিকে রফিকুলের সঙ্গে জামালও হেরোইন নিয়ে এসেছিলেন বলে তার স্ত্রী রুমিসা খাতুন যে হত্যা মামলা দায়ের করেন তাতে জামালসহ দুইজনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়। পিবিআই তদন্তভার পাওয়ার আগে গোদাগাড়ী থানা পুলিশ এ মামলাতেও জামালকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। তবে হত্যা মামলায় জামাল স্বীকারোক্তি দেননি। আর হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আরেক আসামি শরিফুল এখনও পলাতক।

 

গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল ইসলাম বলেন, তিনি গোদাগাড়ীতে যোগ দেয়ার কয়দিন পরই পদ্মার চরে রফিকুলের লাশটি পাওয়া যায়। তিনি বজ্রপাতে মারা গেছেন বলে প্রথমে শোনেন। এরপর হত্যা মামলা হলে জামালকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এর কয়দিন পরই মামলাটি পিবিআইতে চলে যায়। ওই হত্যাকাণ্ডে কোন পুলিশ জড়িত কিনা সে ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। পুলিশের জড়িত থাকার বিষয়টি এ প্রতিবেদকের কাছে প্রথম শুনলেন।

 

ওসি জানান, প্রায় দুই বছর ধরে এসআই মিজানুর রহমান গোদাগাড়ী থানায় কর্মরত আছেন। থানায় এ নামে আর কোন এসআই নেই। রফিকুলের লাশ উদ্ধারের পর মিজানুর নামে কোন এসআই আসেওনি। আর মাস দুয়েক আগে জেলাজুড়ে বিতর্কিত পুলিশ সদস্যদের ‘বদলি অভিযান’ শুরু হলে এসআই মান্নান, এসআই রেজাউল ও কনস্টেবল শাহাদাতকে অন্যত্র বদলি করা হয়। তবে কনস্টেবল শফিকুল এখনও গোদাগাড়ী থানায় আছেন। তিনি গাড়িচালক। এসআই রেজাউল বর্তমানে পাবনার ঈশ্বরদী থানায় আছেন। তবে এসআই মান্নান ও কনস্টেবল শাহাদাত এখন কোথায় আছেন ওসি তা জানাতে পারেননি।

 

রফিকুল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের এসআই জামাল উদ্দিন বলেন, মামলায় এ পর্যন্ত চারজন গ্রেপ্তার। এদের মধ্যে শুধু ইসা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। আদালতের কাগজপত্র হাতে পাওয়ার পর এ ব্যাপারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। রফিকুল হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন হিসেবে এসআই জামাল সম্প্রতি গোদাগাড়ীর ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপর তাকে চেয়ারম্যানের জিম্মায় দেয়া হয়। তখন বলা হয়েছিল, ডাকলেই গ্রাম পুলিশ রুহুলকে আবার আসতে হবে। কিন্তু চেয়ারম্যানের জিম্মায় যাওয়ার পর রুহুল লাপাত্তা। এ প্রসঙ্গে এসআই জামাল বলেন, রুহুলের সম্পৃক্ততার বিষয়টি এখনও তদন্তাধীন।

 

পুলিশের হাতে রফিকুল খুনের কথা জবানবন্দীতে উঠে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহীর পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ঘটনাটি আমি রাজশাহী আসার আগের। এই প্রথম শুনলাম। কেউ জবানবন্দীতে পুলিশের নাম দিলেই যে পুলিশ জড়িত সেটা বলা যাবে না। আবার জবানবন্দী দিয়ে থাকলে পুলিশ জড়িত নয় সেটাও একেবারে বলা যাবে না। বিষয়টা কী সেটা আমরা তদন্ত করে দেখব। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।