আজ ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

তেল ফসল সরিষা : আমদানিনির্ভর ভোজ্য তেল খাতে আশার আলো

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: একসময় বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রধান ও অপরিহার্য ভোজ্য তেল হিসেবে সরিষার তেল ব্যবহার করা হতো। ঘানির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ এক অদ্ভুত দেশীয় ছন্দের অনুরণন তুলত বাংলার আনাচকানাচে।

 

সরিষা ও এর তেলের ব্যবহারের পরিধিও ব্যাপক, যেমন—তরকারি রান্না, ভর্তা-ছানা, হালকা দেশীয় নাশতায় মাখানো, চুল ও গায়ে মাখা এবং ঔষধি গুণ থাকায় সর্দিতে নাকে, গলায়, মাথায় ব্যবহার করা হয়।

 

তেল থেকে প্রাপ্ত চর্বি আমাদের দেহের এক গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যোপাদান, যা প্রধানত শরীর নামের যন্ত্রের জ্বালানি হিসেবে পুড়ে শক্তি উত্পন্ন করে। শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় দুটি চর্বি (Poly unsaturated fatty acid) ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ আমরা সরিষা তেল থেকে পেয়ে থাকি, যা আমাদের দেহ তৈরি করতে পারে না। ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিহত করে আর ওমেগা-৬ ফ্যাটি এসিড হূদেরাগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

 

তেলের পাশাপাশি সরিষার খৈলও জমির সার ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহূত হয়। সরিষার কঁচি গাছ ও পাতা শাক হিসেবেও অসাধারণ। কিছু গবেষণায় উঠে এসেছে সরিষা শাকের ভেতরে থাকা গ্লুকোসাইনোলেট ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে, রক্তের কোলেস্টেরল কমায়, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজমশক্তি বৃদ্ধি করে।

 

এ ছাড়া সরিষার শাকে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল, যা শরীর রাখে সুস্থ ও কর্মক্ষম। এতে বিদ্যমান ভিটামিন ‘সি’তে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-এক্সিডেন্ট, যা ভাইরাসজনিত রোগ থেকে শরীরকে সুস্থ রাখে। আরো আছে ভিটামিন ‘এ’, যা দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে এবং ভিটামিন ‘কে’, যা কি না আমাদের মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে।

 

এ ছাড়া আছে আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ, পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, জিংক, সেলেনিয়াম, প্রোটিন ও ফাইবার। সবুজ পাতা ও গাছ সালাদ হিসেবে এবং সবুজ পাতা প্রক্রিয়াজাত রুচিবর্ধক খাদ্য হিসেবেও ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এসব কারণে সরিষা শাক রক্তের কোলেস্টেরল কম রাখাসহ গর্ভবতী মায়ের সুস্থ সন্তান জন্মদানে উপকারী খাদ্য হিসেবে ভূমিকা রাখে।

 

কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যচাহিদা বৃদ্ধি, সরিষা চাষের জমির ঘাটতি, সবুজ বিপ্লবের ফলে ইরি উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের বোরো ধানকে সেচের আওতায় আবাদ করা, ঘানিতে তেল নিষ্কাশনের হার হতাশাজনক কমসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সিদ্ধান্তে দ্রুতই সরিষার জায়গা দখল করে নেয় সয়াবিন ও পামঅয়েল।

 

উল্লেখ্য, সয়াবিন তেল ও পামঅয়েল শতভাগ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ষাটের দশকের দিক থেকে সরিষার নাম ক্রমান্বয়ে চলে যেতে থাকে অবহেলিত ফসলের তালিকায়। কিন্তু কলুর বলদ, ঘানি, সরষে-ইলিশ, ঝাঁঝালো স্বাদের ভর্তা অথবা মুড়ি-চানাচুর মাখা খাবারগুলো বাঙালিকে সরিষার কথা ভুলতে দেয় না।

 

যখন ক্ষুধার চাহিদা মেটাতে প্রধান খাদ্যশস্য ধানের চাষ মুখ্য, তখন সরিষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুঁজতে থাকা হয় এমন ধরনের জাত, যা কি না ধানের চাষাবাদ অব্যাহত রেখেই তেলের চাহিদা পূরণের জন্য আবাদ করা সম্ভব। কৃষিবিজ্ঞানীসহ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয় অধিক ফলনশীল ও স্বল্প জীবনচক্রের সরিষার জাত নিয়ে। সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) তৈলবীজ গবেষণাকেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা নিরলসভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।

 

সরিষার বেশ কয়েকটি প্রজাতি এই উপমহাদেশে আবাদ করা হয়। বারির তৈলবীজ গবেষণাকেন্দ্র টরি-৭ নামের একটি জাত সামনে নিয়ে আসে, যা হলুদ বর্ণের, ন্যূনতম যত্নে ও অত্যন্ত নিম্নমানের মাটিতেও কম সময়ে ফলন দিতে সক্ষম। দানা হলুদ বর্ণের হওয়ায় বীজে তেলের পরিমাণও বেশি। নতুন করে আশা জাগে সরিষা চাষিসহ ভোক্তা ও সম্প্রসারণ কর্মীদের মাঝেও।

 

যে সরিষা একদিন হারিয়ে যেতে বসেছিল তা ধানভিত্তিক শস্য বিন্যাসে, পতিত জমিতে, বিশেষ করে দুই ধানের মধ্যে বাড়তি একটি ফসলের সম্ভাবনা জাগায় এবং কৃষির উচ্চ পর্যায়েও তা ব্যাপক আশার সঞ্চার করে। এরই ধারাবাহিকতায় বারির তৈলবীজ গবেষণাকেন্দ্রের পাশাপাশি বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (বিনা) বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিষার ওপর গবেষণা জোরদার করা হয়।

 

এর ফলে স্বল্প জীবনচক্রের, পোকা-মাকড় ও রোগবালাই সহনীয়, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ও অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ সরিষার জাত উদ্ভাবনের গবেষণা কর্মসূচি হাতে নিতে দেখা যায়, ক্ষেত্রবিশেষে কিছু সফলতাও আসতে থাকে। অদ্যাবধি বারির তৈলবীজ গবেষণাকেন্দ্র থেকে ১৮টি অধিক ফলনশীল সরিষার জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং আরো দুটি জাত অবমুক্তির পথে, যার মধ্যে বেশ কিছু জাত ব্যাপকভাবে কৃষক ও ভোক্তা পর্যায়ে সমাদৃত হয়।

 

বারি সরিষা-১৪ তেমনি একটি জাত। এই জাতের ফলন হেক্টরে ১.৫ থেকে দুই টন, ফলগুলো (সিলিকুয়া) কোনাকুনিভাবে খাড়া, গাছের আকার ছোট, শক্তিশালী ও মাত্র ৮০ থেকে ৮৫ দিনে পরিপক্ব হয়। বীজ বর্ণ হলুদ বলে এতে তেলের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেশি (৩৫-৪০%)।

 

দেশের কৃষির সার্বিক উন্নতির ফলে আমরা আজ দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। আর তাই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসছে পুষ্টি নিরাপত্তার কথাটিও।

 

মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বর্তমান সরকারের আমলে বেশ কিছু ফসল ভিত্তিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা চলমান আছে। শুধু সরিষা নয়, অন্যান্য দেশীয় অথচ অপ্রচলিত তেলবীজ ফসল, যেমন—তিল, চিনাবাদাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিশি ও গুজিতিলের বিভিন্ন প্রকল্প বা কর্মসূচি বারি, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলছে।

 

পুষ্টির কথা মাথায় রেখে বারির তৈলবীজ গবেষণাকেন্দ্র থেকে বারি সরিষা-১৮ নামের একটি জাত ২০১৮ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধন করা হয়। এটি একটি ‘ক্যানোলা’ গুণাবলিসম্পন্ন জাত, যা সাধারণত অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপে ভোজ্য তেল হিসেবে প্রচলিত। সমগ্র বাংলাদেশে চাষ উপযোগী এ জাতের তেলে ইরুসিক এসিডের পরিমাণ শতকরা ১.০৬ ভাগ, যেখানে বর্তমানে বাংলাদেশে চাষকৃত অন্যান্য উন্নত সরিষার জাতে ইরুসিক এসিডের পরিমাণ শতকরা ৩৫-৪০ ভাগ। ন্যাপাস প্রজাতির অন্তর্গত এ জাত পরিমাণমতো সেচ ও সার পেলে হেক্টরপ্রতি ২.০-২.৫ টন পর্যন্ত ফলন দেয়।

 

খাদের কিনারে থাকা সরিষা ও এর তেল আজ পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে কৃষক, পুষ্টিবিদ ও সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। অনেক মানুষই এখন সরিষা বীজ কিনে তা ভাঙিয়ে ভেজালমুক্ত ও পুষ্টিসমৃদ্ধ তেল তৃপ্তি নিয়েই ব্যবহার করছে। শুধু তা-ই নয়, অধুনা ইন্টারনেট ভিত্তিক অনলাইন মার্কেটিংয়ে খাঁটি সরিষার তেলের চাহিদা ও সরবরাহ ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে।

 

একসময় যে সয়াবিন তেল সরিষার তেলকে টিকতে দেয়নি আজ সেই সরিষার তেলই সয়াবিন তেলের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যভাবে ফিরে আসছে। একদিকে বিভিন্ন জনপ্রিয় জাতের বীজ বর্ধনের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) আন্তরিকভাবে নিয়োজিত আছে, অন্যদিকে এ আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাতগুলো কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াসহ উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এটিকে লাভজনক করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নতুন নতুন কর্মসূচি হাতে নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আগামী দিনে সরিষার প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার সুনজর আবারও ফিরিয়ে আনতে পারে এর হারানো মর্যাদা ও ব্যবহার। পাশাপাশি বাংলাদেশও পারবে আমদানিনির্ভর ভোজ্য তেলের এ খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে।

 

লেখকদ্বয় : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা,
তৈলবীজ গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর