আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নবাব সলিমুল্লাহর নাতি পরিচয় দিয়ে একের পর এক প্রতারণা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে ঢাকার নবাব পরিবারের বংশধর অর্থাৎ নওয়াব সলিমুল্লাহর নাতি হিসেবে পরিচয় দিতেন তিনি।

 

তার বাবা নিউ ইয়র্কে থাকেন বলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছেন। এমনকি তার বাবা ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং দুবাইতে তাদের গোল্ড কারখানা রয়েছে বলে প্রচার করতেন।

 

এভাবে তার সম্পর্কে যত খোঁজ নিচ্ছেন তদন্তকারীরা তার সম্পর্কে প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্য পাচ্ছেন। সেই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে তিনি কিভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন আর এই প্রতারণার কাজে সে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করে। এভাবে তদন্তে তার সম্পর্কে আরো অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে তদন্তে।

 

ঢাকার নবাব পরিচয়ে প্রতারণাকারী সেই আলী হাসান আসকারীকে রিমাণ্ডে নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, ২০০৫ সালে তার বাবা ‘আমান উল্লাহ’ ঢাকার উত্তরায় বসবাসরত অবস্থায় মারা যান।

 

পুরান ঢাকার ইসলামবাগে তাদের কাপড়ের ব্যবসা ছিল। নিউ ইয়র্কে থাকা, ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের পরিচয় এবং দুবাইয়ে ব্যবসার কথা বলে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করে প্রতারণা করতেন।

 

এছাড়া নবাব এস্টেটের সম্পত্তি দখলেরও পাঁয়তারা করছিল সে। এজন্য সে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের ভূমি অফিসে পাঁচটি ‘মিস কেস’ও করেছিল। তিন দিনের রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্যের পাশাপাাশি সে স্বীকার করেছে তার দীর্ঘ জীবনের অনেক প্রতারণার কথা।

 

এদিকে প্রতারণার অভিযোগে হাসান আলী আসকারীর বিরুদ্ধে আরো দুটি মামলা দায়ের করেছে দুই ভুক্তভোগী। রাজধানীর মিরপুর ও মতিঝিল থানায় গত শনিবার এই মামলা দুটি নথিভুক্ত হয়েছে।

 

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এই ভুয়া নবাবের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই প্রতারণার নানান তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখনও সে তার সঠিক নাম-পরিচয় সম্পর্কে কিছু বলেনি।

 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আলী হাসান আসকারী ঢাকার নবাব এস্টেটের সম্পত্তির মধ্যে শাহবাগের একটি অংশের মোতাওয়াল্লী হওয়ার জন্য ভূমি অফিসে দুটি মিসকেস (৭০৭/২০২০, ৮৯০/২০২০) করেছেন।

 

এছাড়া নারায়ণঞ্জেও নবাব এস্টেটের কিছু সম্পত্তির মোতাওয়াল্লী হওয়ার জন্য তিনটি মিসকেস (৬৬৬/২০২০, ৬৬৭/২০২০, ৬৬৮/২০২০) করেছেন। বর্তমানে এসব সম্পত্তি ভূমি সংস্কার বোর্ডের অধীনে কোর্ট অব ওয়ার্ডসের মাধ্যমে দেখভাল করা হয়।

 

নবাব পরিবারের বংশধর না হওয়া সত্ত্বেও এসব মিস কেস করার কারণ জানতে চাইলে হাসান আলী আসকারী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি মূলত নবাব পরিবারের কেউ নয়।

 

অনেকেই ভুয়া বংশধর সেজে নওয়াব এস্টেটের বিভিন্ন সম্পত্তির মোতাওয়াল্লী হয়েছেন। তাই তিনিও সেই উদ্দেশ্যে এসব কেস করেছেন। তবে এগুলোর কোনো কিছুতেই তিনি সফল হতে পারেননি।

 

নবাব নামে জাতীয় পরিচয়পত্র :

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালে ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলের কাছে নিজের নামে নবাব খাজা আলী আহসান আসকারী নামে একটি জন্ম নিবন্ধন নিয়েছেন তিনি।

 

মূলত সেই জন্ম নিবন্ধনের ভিত্তিতে তিনি নবাবের বংশধর হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। এছাড়া ২০১৫ সালে তিনি ঢাকার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে একটি পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন।

 

তার পাসপোর্টের নথিপত্র ঘেঁটে সেখানে পুলিশ ভেরিফিকেশনের কোনো নথি পাওয়া যায়নি। এখানেও সে বড় ধরনের প্রতারণা করেছে। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে সেখানে উত্তরার মাসকট প্লাজা লেখা রয়েছে।

 

তবে ধারণা করা হচ্ছে, কোনো অসাধু চক্রের মাধ্যমে তিনি পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই পাসপোর্ট হাতে পান। সেই সঙ্গে জন্ম নিবন্ধন ও পাসপোর্ট দিয়ে তিনি ২০১৭ সালে আবেদন করে নবাব খাজা আলী হাসান আসকারী নামে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেন।

 

তবে জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতেই জাতীয় পরিচয়পত্র না নিয়ে ২০১৭ সালে জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে আসকারী কোনো উত্তর দিতে পারেনি। এ কারণে ধারণা করা হচ্ছে আগে তার অন্য কোনো নাম ছিল। জন্ম নিবন্ধনের সূত্র ধরে সে পরে নতুন করে নতুন নামে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করেছে।

 

সংসদ নির্বাচনেও প্রতারণা:

ওই জাতীয় পরিচয়পত্রের সূত্র ধরেই আসকারী চলতি বছর ঢাকা-১০ আসনের উপ-নির্বাচনে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের হয়ে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন আসকারী।

 

জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বলেছেন, ওই নির্বাচনে ভোট পেয়েছিলেন মাত্র ১৫টি। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা ও সম্পদ বিবরণীতে বাত্সরিক আয় দেখিয়েছেন ৬ লাখ টাকা।

 

সম্পদবিবরণীতে নিজেকে নবাব খাজা হাসান আসকারী জুট মিলস লিমিটেড এবং আঞ্জুমান আসকারী বেওয়ারীশ লাশ দাফন নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আসকারী জুট মিলস নবাব এস্টেটের সম্পত্তি। সরকার এই মিল অধিগ্রহণ করেছিল। পরে তা পরিচালনার জন্য বেসরকারিখাতের শিকদার গ্রুপের কাছে দেওয়া হয়েছে।

 

এখন আলী হাসান আসকারী সেই জুট মিলসের চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করে আসছেন। এছাড়া আঞ্জুমান আসকারী নামে প্রতিষ্ঠানটিও নামস্বর্বস্ব। হলফনামায় নিজেকে মাস্টার্স পাস উল্লেখ করলেও জিজ্ঞাসাবাদে আসকারী এসএসসিও পাশ করেনি বলে জানতে পেরেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

 

সাবেক আইজিপির নাম ভাঙিয়েও প্রতারণা:

পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৭ সালের শেষের দিকে মাওলানা সিরাজী নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে আশকারীর সঙ্গে জামালপুরের মাহমুদুল হাসান নামে এক ব্যক্তির পরিচয় হয়েছিল।

 

পুলিশের সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীর সঙ্গে তার সখ্যতা রয়েছে জানিয়ে আশকারী তাকে এসআই পদে প্রার্থী দিতে বলেছিল। মাহমুদ জামালপুরের এক প্রার্থী যোগার করে বিশ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার জন্য চুক্তি করেছিল। সেই সঙ্গে মাহমুদসহ সাতজনকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২৩ লাখ টাকা নেয়।

 

মাহমুদ রিমাণ্ডে জানান, পুলিশের সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী নিজে ঘুষ খান না জানিয়ে তার স্ত্রীকে দিয়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলে আসকারী। এজন্য সাবেক আইজিপির স্ত্রীকে স্বর্ণালঙ্কার কিনে দিতে হবে বলে জানায়।

 

তারা আমীন জুয়েলার্স থেকে ১০ লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ১০ লাখ টাকা দেন আসকারীকে। মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়ের সামনে থেকে এসব স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা গ্রহণ করেন তিনি।

 

এর বাইরে সিঙ্গাপুর যাওয়ার জন্য সিরাজীর মাধ্যমে কয়েক দফায় ২৩ লাখ টাকা দেন। মাহমুদ জানান, প্রতারিত হয়ে তিনি এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে আসকারীকে দিয়েছিলেন তারা তাকে খুঁজছে। এজন্য তিনি ভয়ে দুই বছর ধরে নিজের গ্রামের বাড়িতেও যেতে পারেন না।

 

প্রতারণার অভিযোগে আরো ২ মামলা:

সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নার্স নিয়োগের নামে ফেনীর ৪০০ ব্যক্তির কাছ থেকে তিন কোটি ৩৪ লাখ টাকা নিয়েছিলেন প্রতারক আসকারী। প্রতারিত ব্যক্তিদের পক্ষে সালমান নামে এক মাদরাসা শিক্ষকের দায়ের করা মামলায় গত বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাঁচ সহযোগীসহ আসকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসকারীর গ্রেপ্তারের খবর চাউর হওয়ার পর প্রতারিতদের অনেকেই ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটে যোগাযোগ শুরু করে।

 

এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার মানজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি মিরপুর থানায় আসকারীর বিরুদ্ধে ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছেন। আর গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) তাজুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেদ হাসপাতালে চাকরি দেওয়ার নাম করে আসকারী তার কাছ থেকে ৪৩ লাখ টাকা নিয়েছে বলে তিনি মামলায় অভিযোগ করেছেন।

 

‘সামনে টিভি ক্যামেরা ছিল, তাই একটু বানিয়ে বলেছি: প্রতারক আসকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউ ইয়র্কে গিয়ে তার বাবা আমানুল্লাহ আসকারীকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন বলে নামসর্বস্ব একটি অনলাইন টিভির কথিত সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন।

 

ওই সাক্ষাৎকারে প্রতারক আসকারী বলেন, ‘আমার জন্ম হলো মক্কাতে, বড় হয়েছি নিউ ইয়র্কে, সেটেলড আমস্টার্ডাম নেদারল্যান্ড। যদিও আমার বিজনেস দুবাইতে। আমি আমার বাবার বিজনেস দেখি, আমার বাবা হলেন- নবাব আমানুলাহ সাহেব, উনি ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ওয়ার্ল্ডে যত গোল্ড সাপ্লাই হয়, সেটা আমাদের ফ্যাক্টরি থেকে হয়। আমাদের ফ্যাক্টরি প্রথমে ছিল নিউ ইয়র্কে।

 

পরবর্তীতে এই ফ্যাক্টরি আমি রাসেলফাইমাতে নিয়ে আসি, দুবাইতে। এখন আমাদের গোল্ডগুলো দুবাইতে রিফাইন হয় এবং পুরা ওয়ার্ল্ডে সাপ্লাই হয়।’ওই সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও মিথ্যাচার করেন আসকারী।

 

তিনি বলেন, ‘আজ থেকে দুই বছর আগে শেখ হাসিনা যখন নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন আমার বাবার কাছে বলেছিলেন, যে ভাই আমি অনেক অসুবিধায় আছি, আপনি বাংলাদেশে আসেন, সুষ্ঠু একটা নির্বাচন দেন, যে নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান আপনি হবেন এবং সুন্দর একটা নির্বাচন আপনি উপহার দেন।

 

তখন আব্বা বলেছিলেন, না আমার বয়স হয়ে গেছে, আমার পক্ষে হয়তো এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যাওয়া সম্ভব না, তবে আমার একমাত্র ছেলে আলী হাসান আসকারী ও বাংলাদেশে যাবে। দেন আমি বাংলাদেশে আসি।’

 

সঠিক পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা:

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আলী হাসান আসকারীর আসল পরিচয় জানার চেষ্টা করছেন। জিজ্ঞাসাবাদে আলী হাসান আহসান উল্লাহ সড়কে তাদের দুই কাঠার ওপর একটি বাড়ি ছিল বলে জানিয়েছেন।

 

তবে আহসান উল্লাহ রোডে ওই বাড়ির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জানতে পেরেছেন, আলী হাসান আসকারী প্রায় এক যুগ আগে চুয়াডাঙ্গার এক নারীকে বিয়ে করেন।সেই স্ত্রীর আগেও বিয়ে হয়েছিল। তার দুই সন্তান। বড় সন্তান নিয়েও প্রতারণা করেছেন আসকারী।

 

 

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আলী হাসান আসকারীর প্রতারণার কোনো শেষ নেই। প্রতিদিনই তার সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তার সহযোগীদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।