আজ ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

পরিবর্তনের আশা বিশ্বে

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক: ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অনিশ্চয়তা ভর করেছিল বিশ্বব্যবস্থায়। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মুসলিমপ্রধান কয়েকটি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপসহ একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে দেশটিকে প্রত্যাহার করে নিয়ে ট্রাম্প বিশ্বে নজিরবিহীন এক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলেন। প্রায় চার বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ে নতুন এক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এরই মধ্যে বলেছেন, তিনি মুসলিমপ্রধান দেশগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জারি করা সেই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করবেন। এ ছাড়া তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিসহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ফেরাবেন। ‘আমেরিকাই প্রথম’ নীতি ধারণ করে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে বিশ্বে দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল, এর বিপরীতে বাইডেন প্রশাসনের নীতি হবে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও তার বৈশ্বিক নেতৃস্থানীয় অবস্থানে ফেরানো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠ’র প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিশ্বে পরিবর্তন আসার বিশাল একটি সুযোগ আছে। কিন্তু এটি হয়তো খুব দ্রুত হবে না। ধাপে ধাপে হবে। এখনো সিনেট ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে নয়। বাইডেন বলেছেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার ৭৭ দিনের মধ্যে জলবায়ু চুক্তিতে যোগ দেবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সিনেট এ ব্যাপারে অনুমোদন দেবে কি না?’ তিনি বলেন, ‘একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির আন্তর্জাতিক ভূমিকার জন্য সেসব নীতির অভ্যন্তরীণ গ্রহণযোগ্যতা লাগে। বাইডেনের প্রথম কাজ হবে বিশ্বের কাছে একটি ঐক্যবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র উপহার দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজে ঐক্যবদ্ধ না হয়, তাহলে বিদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই অবস্থানটি দেখাতে পারে না।’

অধ্যাপক লাইলুফার বলেন, “নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স থেকে শুরু করে অনেক দেশে বাইডেনের বিজয় উদযাপন করা হচ্ছে। ন্যাটো ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্নিমাণ করার বিশাল একটি সুযোগ আছে বাইডেনের। তবে মধ্যপ্রাচ্য বা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা পরিবর্তন হবে, তা নিয়ে আমি খুব একটা আশাবাদী নই। চীনকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলের মধ্যে ঐকমত্য আছে। অন্তত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির কারণে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক যে খুব সহযোগিতাপূর্ণ হবে, তা আমরা আশা করতে পারি না।”

তিনি আরো বলেন, ‘ট্রাম্পের পরাজয় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইসরায়েল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের জন্য সুখবর নয় বলে অনেকে বলছেন। ব্যক্তি নেতানিয়াহু, বরিস জনসন বা অন্য নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক প্রভাবিত বা পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য বা অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খুব বেশি বদলাবে বলে মনে করি না।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, জো বাইডেন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশই কাটিয়েছেন সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটিতে। পররাষ্ট্রনীতিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর বেশ জানাশোনা ও দক্ষতা আছে। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে পররাষ্ট্রবিষয়ক ইস্যুতে জো বাইডেন দিকনির্দেশনা দিতেন।

জো বাইডেন তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকারে যে পররাষ্ট্রনীতির কথা বলেছেন, তাতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মতামত এবং নিজ দেশ ও অভীষ্ট দেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি। তিনি দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি সাজাবেন। যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিশ্বকেও গণতন্ত্রের চোখে দেখার অঙ্গীকার করেছেন তিনি।

বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ওয়াশিংটন ডিসিতে গণতান্ত্রিক মিত্রদের নিয়ে একটি সম্মেলন এবং জলবায়ুবিষয়ক আরেকটি সম্মেলন করার কথা বলেছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, বাইডেন প্রশাসনের কাছে এ দুটি বিষয় যে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, তা ওই সম্মেলন আয়োজনের অঙ্গীকার থেকেই স্পষ্ট। এ ছাড়া তিনি অভিবাসনব্যবস্থাও সহজ করার কথা বলেছেন।

বিবিসির যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সংবাদদাতা বারবারা প্লেট উশার মতে, মিত্রদের সঙ্গে বোঝাপড়া, জলবায়ু পরিবর্তন, ইরান, ইয়েমেন, আরব-ইসরায়েল সংঘাতের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের নীতিগত পার্থক্য দেখা যেতে পারে। রাশিয়া ও চীনের ক্ষেত্রে দেখা যেতে পারে অনেকটা একই ধরনের নীতি।

জো বাইডেন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের এবং গণতন্ত্রমনা দেশগুলোকে নিয়ে জোট গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রায় চার বছরে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করেন। বিশ্বে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কার্যত উদাসীন ছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এই সুযোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একনায়কতন্ত্রের উত্থান ঘটেছে। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাইডেন প্রশাসন মনোযোগী থাকবে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

ট্রাম্পের আমলে পুরনো যে মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের চিড় ধরেছে, তা ঠিক করার অঙ্গীকার করেছেন জো বাইডেন। বিশেষ করে, ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হবে বাইডেন প্রশাসনের অন্যতম প্রথম কাজ। একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আবারও যোগ দিয়ে কভিড-১৯ মহামারি মোকাবেলায় বৈশ্বিক নেতৃত্ব নেওয়ার কাজ করবে বাইডেন প্রশাসন।

ক্ষমতায় আসার পর প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জো বাইডেন ওই চুক্তিতে ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। একই সঙ্গে কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনাও আছে তাঁর।

ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট। জো বাইডেন সেই চুক্তিতেও ফেরার অঙ্গীকার করেছেন। ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এক তরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিলে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবসহ অন্য মিত্ররা অসন্তুষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাইডেন ইরানের ওপর চাপ রাখতে চান; কিন্তু তা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়। ইয়েমেনে সৌদি আরবের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে সমর্থন দেবেন না বাইডেন। এটি নিয়ে টানাপড়েনের আশঙ্কা আছে দুই দেশের।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আরব দেশগুলোর শান্তিচুক্তি সইয়ের বিরোধী নন বাইডেন। ইসরায়েলের নিরাপত্তার ব্যাপারে তিনিও অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে তিনি ‘দুই রাষ্ট্র সমাধানের’ সম্ভাবনা নষ্ট হয়, এমন কিছু করতে চান না। জেরুজালেমে ট্রাম্পের স্থাপন করা যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস তিনি আবার তেল আবিবে ফিরিয়ে আনবেন এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

রাশিয়া ও চীনের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান বাইডেনও ধরে রাখবেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছুটা কৌশলগত পরিবর্তনও দেখা যেতে পারে। জো বাইডেন মিত্রদের নিয়ে চীন ও রাশিয়াকে মোকাবেলার কথা বলেছেন। অর্থাৎ বাইডেন প্রশাসন আশা করতে পারে, তার মিত্ররাও এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অনুসরণ করবে। আবার উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে বাইডেন চীনসহ অন্য মিত্রদের কাজে লাগানোর কথা বলেছেন।