আজ ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৩০শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

অবশেষে এসআই আকবর গ্রেপ্তার

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:ভোল পাল্টে খাসিয়া সেজেও শেষরক্ষা হয়নি। সিলেটে পুলিশ হেফাজতে রায়হান হত্যা মামলায় মূল অভিযুক্ত বরখাস্ত এসআই আকবর অবশেষে ধরা পড়েছেন। ঘটনার ২৮ দিন পর গতকাল সোমবার সকালে জেলার কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে সন্ধ্যায় তাঁকে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গোপন সূত্রের খবরে তাঁকে গ্রেপ্তার করার কথা জানানো হয়েছে। তবে একটি সূত্র জানায়, সীমান্তের ওপারে ভারতের ডনা বস্তি এলাকায় স্থানীয় খাসিয়ারা আকবরকে আটক করে এবং পরে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেয়। একটি ভিডিও চিত্রেও আকবরকে খাসিয়ারা আটক করেছে-এমন দৃশ্য দেখা গেছে। তাতে আকবরকে বলতে শোনা যায়, দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরামর্শেই তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। তবে তিনি ওই কর্মকর্তাদের নাম বলেননি।

আকবরকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে জেলা পুলিশ। এ সময় সিলেটের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন আহমদ জানান, গতকাল আকবর সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন—এমন সংবাদ তাঁদের কাছে ছিল। সে জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। সকাল ৯টার দিকে কানাইঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আকবরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতীয় খাসিয়ারা আকবরকে আটক করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে—এমন তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু বিশ্বস্ত বন্ধুর সহযোগিতায় পুলিশই তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে।

আকবর ভারতে পালাতে চেয়েছিলেন নাকি ভারত থেকেই এসেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য ছিল যে সে ভারতে পালিয়ে যাবে। এখন দুটোই হতে পারে। হয়তো সে ভারতে পালাচ্ছিল অথবা ভারতে আগেই গিয়েছিল। এখন ফিরে আসতে চেয়েছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য জানা যাবে।’ সংবাদ সম্মেলনে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহমেদও বক্তব্য দেন।

এদিকে অন্য একটি সূত্র জানায়, কানাইঘাট সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডনা বস্তি এলাকায় গত রবিবার গভীর রাতে স্থানীয় খাসিয়ারা আকবরকে আটক করে। সেই বস্তিতেই তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। এ সময় তিনি তাঁর বেশভূষাও পরিবর্তন করেন। দাড়ি রাখেন, গলায় পুঁতির মালাও পরেন। গতকাল সকালে ভারতীয় খাসিয়ারা আকবরকে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেয়।

এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পাহাড়ি ছড়ায় পাথরের ওপর আকবর হোসেনকে বসিয়ে রেখে হাত-পা বাঁধছেন কয়েক যুবক। আকবর হোসেন হাত জোড় করে কাঁদছেন এবং তাঁর হাত-পা না বাঁধার অনুরোধ করছেন। বাঁধার আগে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে স্থানীয়রা। এ সময় কেঁদে কেঁদে আকবর বলেন, ‘আমি মারিনি ভাই, আমি তাকে (রায়হানকে) প্রাণে মারার জন্য মারিনি। চার-পাঁচজন মিলে মেরেছিল। ওই সময় ছেলেটা মরে গেছে। অসুস্থ হওয়ার পর আমি তাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছি।’

তুমি কেন পালিয়ে গেলে—স্থানীয়দের এমন প্রশ্নের জবাবে বহিষ্কৃত এসআই আকবর ভুঁইয়া বলেন, ‘সাসপেন্ড করছে, অ্যারেস্ট হতে পারি। আমাকে কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছিল—তুমি আপাতত চলে যাও, কয় মাস পরে আইসো। দুই মাস পরে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আবার সব হ্যান্ডেল করা যাবে।’ তবে কারা এমনটি বলেছিলেন বা কার নির্দেশে তিনি পালিয়ে যান এ সম্পর্কে আকবর কিছু বলেননি। ‘ইন্ডিয়াতে কিভাবে এলে?’ এ প্রশ্নের জবাবে আকবর বলেন, ‘তারা বলেছিল তুমি সীমান্তের ওখানে গিয়ে থাকো।’ তখন ওই লোকটি বলেন, ‘কোথায়?’ আকবর উত্তর দেন, ‘মাঝেরগাঁও, ভোলাগঞ্জ।’

তদন্তের দায়িত্বে র‌্যাবকে চান রায়হানের মা : গ্রেপ্তার হওয়া এসআই আকবর হোসেন ভূঁইয়াকে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে পুলিশের নির্যাতনে নিহত রায়হান আহমেদের মা সালমা বেগম। আকবর গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি এই দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আকবরকে কিন্তু পুলিশ বা পিবিআই কেউ গ্রেপ্তার করেনি। তাকে আটক করেছে জনগণ। এ জন্য আমি জনগণকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। এখন আমার দাবি হচ্ছে—আকবরকে যেন র?্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।’

এদিকে রায়হানের খালা আয়শা আক্তার জানান, তিনি বাইরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলছেন। পরিবারের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আয়শা বলেন, ‘পিবিআইয়ের ওপর আমাদের ভরসা নেই। এখন আমাদের দাবি হচ্ছে মামলা র‌্যাবকে দেওয়া হোক। র‌্যাব তদন্ত করুক, আসামিকে রিমান্ডে নিক। তদন্তের দায়িত্বে থাকা পিবিআইয়ের পাঁচজন একসঙ্গে করোনায় আক্রান্ত হয়ে গেলেন? বিষয়টি নিয়ে আমাদের খটকা লেগেছে। এটাকে তদন্তকাজ বিলম্বিত করার পাঁয়তারা মনে হচ্ছে।’

প্রসঙ্গত, সিলেটের আখালিয়ার নেহাড়িপাড়া এলাকার বাসিন্দা রায়হান আহমেদকে গত ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে তুলে নিয়ে কোতোয়ালি থানাধীন বন্দরবাজার ফাঁড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। পরদিন সকালে তিনি মারা যান। পরদিন রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন।