আজ ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

করোনা মহামারীতে জনগণের পাশে নেই আত্মপ্রচারকারী স্বঘোষিত নেতারা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদক:বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো চলমান করোনা মহামারীর সময়ে বাংলাদেশেও নানাবিধ সমস্যা দেখা যাচ্ছে। আপদকালীন সৃষ্ট এসব সমস্যা দূর করার মূল দায়িত্ব সরকার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের। এমন পরিস্থিতিতে সমাজের বিত্তবান , শিক্ষিত ও সামর্থবানদের দায়িত্ব কিন্তু কোনও অংশে কম নয়।

করোনা মহামারী শুরুর কিছু দিন পূর্বেও দেখেছি দেশজুড়ে হাজার হাজার নেতার দেশসেবার উদাত্ত আহ্বানে ও স্লোগানে সাধারণ মানুষের কান ঝালাপালা হওয়ার মতো অবস্থা। যেদিকে চোখ যায় সেদিকে শুধু পোস্টার-ব্যানার-বিলবোর্ডজুড়ে দেশপ্রেমিকের হিড়িক। এসব বড় বড় নেতার নিজ পরিচয় বহনের এত আয়োজন ফিকে হয়ে গেছে করোনা মহামারীতে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সততা, একাগ্রতা, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত। বলতে গেলে তাঁর একক প্রচেষ্টায় দেশ ও জাতি বর্তমানে স্বস্তিতে আছেন। কিন্তু জনগণের পাশে নেই আত্মপ্রচারকারী স্বঘোষিত মহান এসব নেতারা। এখন রাস্তায় বের হলেই কর্মহীন ও অভাবগ্রস্ত মানুষ জানান দিচ্ছে, এত জননেতা থাকা সত্ত্বেও তাদের কষ্ট ও অবহেলার কথা এবং তাদের বঞ্চনার কথা শোনার মতো কেউ নেই।

স্বঘোষিত বড় বড় নেতারা এমন নাগরিক যে, বৃক্ষরোপণের মৌসুম এলেও একটি বৃক্ষও রোপনের আগ্রহ দেখান না। তবে ঘটাকরে বৃক্ষরোপণের ছবি তারা প্রচার করেন। বৃক্ষহীন শহর, বন্দর, বাজার, রাস্তার দুইধার কিংবা জনসমাগম হওয়া বিভিন্ন দপ্তরে বৃক্ষ লাগানো না হলেও মাথার উপরে, চোখের সামনে দেয়ালে দেয়ালে, গাছে গাছে, ছোট-বড় ব্যানার, পোস্টার, বিলবোর্ড ভর্তি তাদের বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন। শত শত নেতাদের মুখ আর মুখ এসব বিজ্ঞাপনে। এসব দেখে মনে হয় পণ্য বিজ্ঞাপনের চেয়ে লাভজনক ব্যবসা যেন রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন। রঙিন পোস্টার, নিজের অনেক বড় একটি মুখ, কোনায় ছোট করে বিখ্যাত কোন প্রয়াত বা জাতীয় নেতানেত্রীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি। আহা ! হয়ে গেল সংগ্রামী জননেতা। কিন্তু তারা জানেনা সংগ্রাম কাকে বলে আর নেতৃত্ব কি জিনিষ?

আমরা নিকট বা দূর অতীতে তাকালে দেখি যারা সত্যিকারের দেশপ্রেম নিয়ে কাজ করেছেন তারা সকল সময় দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ নিয়ে চিন্তা করেছেন, গণমানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করেছেন। আজীবন দুস্থ ও গরীব মানুষের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের পরিবারের ও নিজের সুখ- শান্তি ভুলে গিয়েছিলেন। তারা কখনো আত্মপ্রচার করেন নাই এবং আত্মপ্রচারের প্রয়োজনও মনে করেন নাই।

এখন আমরা সেইরকম নেতা পাই না কেন?

কারণ আজকের প্রচারপ্রিয় নেতাদের নিজেকে পরিচিত করতে ব্যয় করতে হয় প্রচুর অর্থ। তারা তারকা জগতের তারার মতো ঝলমল করতে চান। সিনেমা মার্কা বিজ্ঞাপনভিত্তিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী উড়ন্ত নেতারা নিজেই নিজেকে পরিচিত করেন ‘সংগ্রামী জননেতা’ বলে। কিন্তু জনগণ জানে না তিনি কোন জাতীয় আন্দোলনে এমন মহান নেতা হলেন।

এভাবে কি জননেতা হওয়া যায়, নাকি কখনও হয়েছে কেউ?

জনকল্যাণে কোনও কাজ না করে, দলীয় পদ পদবী পাওয়ার জন্য কিংবা সমাজে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য যেসব মানুষের এই সাধারণ ভাবনাটুকু নেই যে, শুধুমাত্র একটি গাছের গায়ে বা কোনো দেয়ালে এমন বিজ্ঞাপন কতোটা অশোভন। সেই ব্যক্তি মানুষের কল্যাণের চিন্তা করবে কিভাবে?

এ রকম প্রচারে আজকাল অনেকেই সফল হচ্ছেন বিভিন্ন ক্ষমতাশীন বা প্রতাপশালী মানুষের সহযোগিতায়। প্রচারই যেন প্রসার সেই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বিভিন্ন পদ পদবী দখল করতে অনেকেই সক্ষম হলেও অল্পদিনের মধ্যেই তাদের পদও চলে যাচ্ছে, সেই সাথে তারা হারিয়ে যাচ্ছেন লোক চক্ষুর অন্তরালে। তাদেরকে জনগণ দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখেন না, কারণ তারা জননেতা নন। তারা আত্মপ্রচারকারী স্বার্থপর ও স্বঘোষিত নেতা।

জননেতারা কাজ করেন মানুষের ভালোবাসা অর্জনের জন্য। তারা কাজ করেন সমাজের অবহেলিত ও বিপদগ্রস্ত মানুষদের জন্য। তাদের দ্বারা সমাজ ও জনগণ কখনো ক্ষতির মুখে পড়ে না। তাদের ব্রতোই হচ্ছে জনগণকে ভালোবাসা ও জনগণের কল্যাণে কাজ করা। জনগণের মনের গভীরতর ভালোবাসা ছাড়া জননেতা হওয়া যায় না। অর্থাৎ জননেতা হতে হলে জনগণের ভালোবাসা পেতে হবে। ভালো কর্ম থেকে যোজন যোজন দূরে থেকে শুধু নেতার স্লোগান আউড়ে নেতার ছবির সঙ্গে নিজের ছবি প্রচারেই নেতার আদর্শ বা চেতনা ধারণ বা লালন করা যায় না। বরং নেতাকে ভালোবেসে আত্মত্যাগী, সৎ ও বিনয়ী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হয়।

যে পরিমাণ অর্থ নানা প্রচারে খরচ হয় তার কিছুও যদি নিজ পরিচয় বহনকারী জননেতারা রাস্তার ছিন্নমূল শিশুদের পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য, পড়াশোনার উপকরণ, গরীব ও অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করতেন, তবে সত্যিকার অর্থে তারা জননেতার কাজ করতেন। উপকৃত হতো অনেক ছিন্নমূল শিশু, উপকৃত হতো গরীব ও অসহায় জনগণ, উপকৃত হতো এ দেশ। অনিন্দ্যসুন্দর হতো কিছু মানুষের জীবনমান এবং আমাদের বাসভূমি।

আত্মপ্রচারে থাকা নেতারা যদি সত্যিই জনগণের হৃদয়ে স্থান করতে চান এবং নেতৃত্বকে যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে স্মরণীয় করতে চান তাহলে সত্যিকারের দেশপ্রেম ও জনসেবার কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন। এটা করতে পারলে আমাদের দেশ ও জাতি আপনাদের যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে।

এটাই জননেতার প্রকৃত চাওয়া নয় কি ?

আত্মপ্রচার কোনদিনই স্থায়ী ভালোবাসা বা সফলতা এনে দিতে পারে না। এইতো সেদিনের টিভি ও রেডিওর বাহারি ও  হৃদয় ছুয়ে যাওয়া গান ও দৃশ্যের বিজ্ঞাপন গুলো আর নাই। সেই সাথে বাহারি বিজ্ঞাপনের পণ্যটাও কিন্তু এখন বাজারে পাবেন না।