আজ ২রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৬ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

রেকর্ড ঘাটতির আগামী বাজেট

প্রথমবার্তা প্রতিবেদক:করোনার আঘাতে দ্বিতীয় বছরেও টালমাটাল দেশের অর্থনীতি। ফলে সরকারকে আবারও ব্যয়ের ফর্দ ভারী করতে হচ্ছে। এতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ঘাটতির রেকর্ড হতে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ভাঙবে ‘গোল্ডেন ফাইভ রুলস’। অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন অর্থবছরের জন্য দুই লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি বাজেটের প্রাক্কলন করেছে। স্বাধীনতার পর কখনোই এত বেশি ঘাটতি বাজেট পরিকল্পনা করা হয়নি। ঘাটতি অর্থায়নে নতুন অর্থবছরেও সরকারের মূল ভরসা হতে যাচ্ছে ব্যাংক খাত। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সম্পদ সীমিত আবার রাজস্ব আয়ও কাঙ্ক্ষিত হয় না। ফলে ঘাটতি বাজেট দিতে হয়। আর ঘাটতি অর্থায়নে যেসব রাস্তা রয়েছে, সেগুলোও সীমিত।’ তিনি বলেন, ঘাটতি অর্থায়নে দেশীয় ও বিদেশি উৎস ভরসা। বিদেশি উৎস থেকে অর্থায়ন করলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগপ্রবাহ ঠিক থাকে। আর দেশীয় মানেই ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র। ব্যাংক থেকে অনেক বেশি অর্থ নিলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।

সূত্র মতে, ঘাটতি বাজেট করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সব সময় ‘গোল্ডেন ফাইভ রুলস’ অনুসরণ করা হয়। এই রুলস বা নিয়ম মতে, ঘাটতি বাজেট সব সময় জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়।

করোনার কারণে চলতি অর্থবছর এ নিয়ম ভাঙা হয়। নতুন বাজেটেও ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আগামী বাজেটে এটি জিডিপির ৫.৮ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। নতুন বাজেটে অনুদান ছাড়া মোট ঘাটতির পরিমাণ প্রাক্কলন করা হয়েছে দুই লাখ সাত হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে নতুন বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ১৭ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা বাড়ছে।

অভ্যন্তরীণ উৎস : বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার আগামী অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছে অভ্যন্তরীণ উৎসর ওপর। আগামী অর্থবছরের বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এটি জিডিপির ৩.৪৬ শতাংশ। চলতি বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা নেওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। সে হিসাবে নতুন বাজেটে ১৩ হাজার ১৭ কোটি টাকা বাড়ছে। এর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এটি জিডিপির ২.৬ শতাংশ। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ খাতে সরকারের মূল ভরসা ব্যাংক খাত। বাকি ৩০ হাজার কোটি টাকা আসবে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে।

বিদেশি উৎস : আগামী বাজেটে বিদেশি উৎস থেকে সরকার ৮৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। বিদেশ থেকে সরকার সহজ শর্তে ঋণ সংগ্রহের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৭৬ হাজার চার কোটি টাকা। সে হিসাবে আট হাজার ৫৬১ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে।

একনজরে গত কয়েক বছরের ঘাটতি বাজেট : ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। মূল বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চার লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। ঘাটতি ছিল ৬৮ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ওই বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬৫ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের জিডিপির ৫ শতাংশ।

২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের জিডিপির ৪.৬ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মোট ব্যয় ধরা হয় এক লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। সামগ্রিক ঘাটতি ছিল ৫২ হাজার ৬৮ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের জিডিপির ৫ শতাংশ।