আজ ৩রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৭ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আম্ফানের ক্ষতে অসহায় জীবন

প্রথমবার্তা প্রতিবেদকঃ সাতক্ষীরা জেলাধীন আশাশুনি উপজেলার মাড়িয়ালা গ্রামের ২৯টি পরিবার স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে বসবাস করছে গত মে মাসের ২১ তারিখ থেকে। এর আগের ২০ মে রাতে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে নদীর বাঁধ ভেঙে গ্রাম প্লাবিত হয়।

 

খোলপেটুয়ার প্রবল দাপটে মাড়িয়ালা ও হাজরাখালী গ্রামের গোটা পঞ্চাশেক পরিবারের ঘরবাড়ি একেবারে ভেসে যায়। আর এই দুটি গ্রামসহ আশপাশের গ্রামগুলো পানিতে থইথই করতে থাকে।

 

উপায়হীন গ্রামবাসী আশপাশের উঁচু জায়গা, দুটি স্কুলঘর ও স্বজনদের বাড়িতে ঠাঁই নেয়। সাত মাসেরও বেশি সময় কেটে গেছে, এখনো গ্রামগুলো জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়, ভাটায় পানি নামে।

 

এভাবে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টায় দুইবার জোয়ারের পানিতে গ্রামগুলো ডুবছে। মানুষগুলোর স্বপ্নও ডুবছে। কাজ বলতে নেই। জীবন-জীবিকার চরম অনিশ্চয়তা। ঠাঁই হলেই তো হলো না, পেটের ক্ষুধা মেটানো চাই।

 

স্কুলঘরে ঠাঁই নেওয়া করিমন বেগম বলেন, ‘সেই থিকে এনজিওগে সাহায্যির উপর জীবন চলতিছে। চেয়ারম্যান আইয়েলো, মেম্বারও ছিল, তারা একবার কয়ডা চাল দেলো।’

 

দুর্যোগগ্রস্ত একাধিক মানুষ জানায়, একাধিক এনজিওর কাছ থেকে তারা সহায়তা পেয়েছে। তিন থেকে সাত হাজার টাকা নগদ সহায়তার পাশাপাশি চাল-ডাল-নুন, সাবান-সোডা-বালতি প্রভৃতি পেয়েছে।

 

ব্রিটিশ সরকারের সহায়তাপুষ্ট প্রতিষ্ঠানের স্টার্ট ফান্ড এসব সহায়তা করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানার পরপরই তারা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। বরাবরই উপকূলভাগ প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়।

 

স্বাভাবিকভাবেই উপকূলের মানুষরা এতে কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারের জরুরি সহায়তা তহবিল আছে, তারা বরাদ্দও দেয়; কিন্তু কোন মানুষ, কতজন মানুষ সহায়তা পায়, তা নিয়ে সব সময়ই প্রশ্ন ওঠে।

 

উপকূলে আঘাত হানা সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় আম্ফান ছিল খুবই ভয়ংকর। বাংলাদেশের বেশির ভাগ অঞ্চলে এই ঝড়টির আঘাত অনুভূত হয়েছে, তবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষত সাতক্ষীরা ও খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন উপজেলাগুলোতে এর ক্ষয়ক্ষতি ছিল অনেক বেশি।

 

মাড়িয়ালা গ্রামটি ছাড়াও শ্রীউলা ও প্রতাপনগর ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম এখনো পানির তলায় হাবুডুবু খাচ্ছে। কাজ হারিয়ে, দিনযাপনের সুযোগ বঞ্চিত হয়ে মানুষ অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছে।

 

নিঃসন্দেহে আমাদের অনেক অর্জনের মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা একটি বড় অর্জন। আমরা এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি ভালো করছি, বিশেষত দুর্যোগপূর্বকালীন প্রস্তুতি আমাদের অনেক ভালো।

 

এ কারণে সাম্প্রতিককালের দুর্যোগগুলোতে জীবন ও সম্পদহানির পরিমাণ অনেক কমেছে। দেশে-বিদেশে এই বিষয়টি বেশ আলোচিত ও প্রশংসিতও। তবে দুর্যোগ-পরবর্তী কার্যক্রম, বিশেষত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা বা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে, যা আম্ফানে আরো একবার প্রমাণিত হয়েছে।

 

আম্ফানের পর স্বাভাবিকভাবেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিকভাবে সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়। আপৎকালীন খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হয়। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল খুবই সীমিত পর্যায়ে।

 

দুর্যোগপীড়িত সব মানুষের কাছে তা পৌঁছায়নি। কিন্তু এসব দুর্যোগে মানুষের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, দীর্ঘ মেয়াদে যেসব প্রয়োজন দেখা দেয়, তা পুষিয়ে নেওয়া বা ওই মানুষকে আবারও উৎপাদনমুখী কাজে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের বড়ই দুর্বলতা দেখা দেয়।

 

সে ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে ভালো, যদিও তাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। অবশ্য স্টার্ট ফান্ড খুবই ব্যতিক্রম। তারা দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সহায়তা নিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে তাদের সহায়তা দিয়ে থাকে।

 

বলা চলে, সরকার বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা যেখানে দুই দিনেই শেষ হয় এবং দুর্গতরা যখন দিশাহীন অবস্থায় থাকে, তখন বেসরকারি এই উদ্যোগ শুরু ও কার্যকর হয়। এই ফান্ডের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, দ্রুত সময়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করা।

 

খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার ত্রাণ শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় যথাক্রমে তিন থেকে চার লাখ টাকা নগদ সহায়তা, ৩০০ থেকে ৩১০ মেট্রিক টন চাল, প্রতি জেলায় দুই হাজার প্যাকেট করে খাবার, দুই লাখ টাকার শিশুখাদ্য, দুই লাখ টাকার গোখাদ্য এবং ৫০০ বান্ডেল করে ঢেউটিন বিতরণ করা হয়েছে। অথচ সেখানে স্টার্ট ফান্ডের মাধ্যমে এখানকার কর্মরত এনজিওগুলো ৩০ কোটি টাকারও বেশি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যাতে লক্ষাধিক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সহযোগিতা পেয়েছে।

 

নীতিনির্ধারকদের ক্ষেত্রে একটি দুর্বলতা খুবই প্রকট, তাঁরা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেন না। ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই অনেকে এই এলাকা পরিদর্শনে এসেছেন, তাঁরা ক্ষয়ক্ষতি ও মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের বিষয়টি যথাযথভাবে আঁচ করতে পেরেছেন বলে মনে হয়নি। কারণ ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতেই সব ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়নি বা ঝুপঝুপ করে পড়ে যায়নি, বাঁধের ভাঙনে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তা-ও শুরুতে স্পষ্ট হয়নি।

 

পানি আটকে মাটির ঘরগুলো কয়েক দিন পর ঝুপঝুপ করে ভেঙে বা ধসে যেতে শুরু করে আর বাঁধের ভাঙন তো ধীরে ধীরে বড় হয়েছে এবং প্লাবিত এলাকার পরিমাণও বেড়েছে। আবার ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার এক মাস পর একটি অতি জোয়ারে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস বাঁধের ভাঙনে আবারও আঘাত হানে। মানুষ স্বেচ্ছায় বাঁধ বাঁধার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছিল; কোথাও কোথাও সফল হয়েছিল, কোথাও সফল হয়নি।

 

কয়রা উপজেলার একাধিক জায়গায় বাঁধ বারবার ভেঙেছে। পাইকাগাছাতেও একই ঘটনা ঘটেছে। স্বেচ্ছাশ্রমে মানুষ বাঁধ আটকানোর চেষ্টা করেছে। আশাশুনির শ্রীউলা ইউনিয়নের এই মাড়িয়ালা-হাজরাখালী গ্রাম সংলগ্ন খোলপেটুয়ার বাঁধভাঙা স্থানটিও আটকানোর একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে তা সফল হয়নি। দিন দিন ভাঙনের পরিমাণ বেড়েছে।

 

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবো অপেক্ষায় ছিল শীতকালে নদীর পানি কমে যাওয়া এবং শ্রোতহীন একটি অনুকূল পরিবেশের আশায়। তবে শীতকালও চলে যাওয়ার পথে, এখনো সেসব জায়গায় বাঁধ বাঁধার কাজ নজরে আসেনি। আর দিনের পর দিন এই কষ্টকর দিনগুলোর মুখোমুখি হয়ে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে গেছে।

 

মনে রাখতে হবে, সাগরের নোনা জল-জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর জন্য এখানকার বাঁধবন্দিদশা এই এলাকার স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ। বাঁধ ছাড়া এখানকার স্বাভাবিক জীবন অচল, যদিও গেল শতকের আশির দশকে বৈদেশিক মুদ্রার স্বার্থে ধানক্ষেতে নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষের কারণে যথেচ্ছভাবে বাঁধ কাটাছেঁড়া করা হয়, যাতে বাঁধ খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

 

এ কারণে ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় আইলায় শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা ও দাকোপ উপজেলায় বাঁধের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে আইলা এবং ২০২০ সালের ২০ মে আঘাত হানা আম্ফানের মধ্যকার ১০ বছর সময়কালেও এই এলাকার ভঙ্গুর, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো মেরামত-সংস্কার করা যায়নি; যার প্রতিক্রিয়ায় আম্ফানে শ্যামনগর, আশাশুনি ও পাইকগাছা উপজেলার বাঁধের একাধিক জায়গায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়।

 

দীর্ঘ সাত মাস পরও মানুষ পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন একেবারেই নেই। মানুষ খুবই মানবেতর জীবন যাপন করছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এসব এলাকা পরিদর্শনে এসেছেন। নানা আশ্বাসবাণী দিয়েছেন; কিন্তু পানি ওঠা-নামা বন্ধ হয়নি, মানুষের পানিবন্দি জীবনের অবসান হয়নি।

 

বলা বাহুল্য যে দুর্যোগ-পরবর্তীকালে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত, কার্যকর এবং দীর্ঘ মেয়াদে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে একমাত্র সরকারি উদ্যোগ বা প্রতিষ্ঠানগুলো।

 

এনজিওগুলোর তৎপরতা নানা সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে, বিশেষত দাতাদের অর্থ পেতে একটা বড় সময় পেরিয়ে যায়। অবশ্য স্টার্ট ফান্ড সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, তিন দিনের মধ্যেই তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অর্থ ছাড় করতে সক্ষম;

 

কিন্তু সরকার বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে পারে এবং প্রয়োজনে দীর্ঘ মেয়াদে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, যা একান্তই প্রয়োজন। আমরা কি দুর্যোগে-দুর্ভোগে পড়া এসব মানুষকে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য বা কর্মসৃজন প্রকল্পের আওতায় সহায়তা দিতে পারতাম না?লেখক : সাংবাদিক