আজ ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৮ই মে, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

Screenshot 20211121 041803

এলইডির জনপ্রিয়তায় সিআরটির দিন শেষ

বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের বাজারে এলইডি (লাইট এমিটিং ডায়োড) টিভির জনপ্রিয়তা ঊর্ধ্বমুখী। একসময় দেশের বাজারে সিআরটি (ক্যাথড রে টিউব) টেলিভিশনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। সিআরটি টেলিভিশনকে পেছনে ফেলে এলইডি টিভি বাজারের জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। প্রযুক্তির সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে সিআরটির দামেই এলইডি টিভি বাজারে ছেড়েছে দেশি কম্পানিগুলো। তাই সব শ্রেণির মানুষ এলইডি টিভির দিকে ঝুঁকছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ব্র্যান্ডের এলইডি কিনতে না পারলেও কম দামে চীনা কম্পানির নন-ব্র্যান্ডের এলইডি টিভি কিনছে।

জানা যায়, পুরনো ও ব্যবহৃত সিআরটি টিভির পিকচার টিউব স্বাস্থ্যের এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় সরকার আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তার পরও কিছু ব্যবসায়ী এসব পুরনো পিকচার টিউব সংগ্রহ করে নতুনভাবে সংযোজন করে সনি, স্যামসাং, এলজিসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে বাজারজাত করছেন। পণ্যমান যাচাই না করে বিদেশি ব্র্যান্ডের লোগো দেখে এবং স্বল্পমূল্য হওয়ায় এসব টিভি কিনে প্রতারণার শিকারও হচ্ছেন ক্রেতারা।

এদিকে এলজি, স্যামসাং, সিঙ্গার, ওয়ালটনসহ ব্র্যান্ডগুলো বেশ কয়েক বছর আগেই সিআরটি টেলিভিশন উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। সিআরটি মনিটর অ্যানালগ মনিটর হিসেবে পরিচিত হলেও এলসিডি ও এলইডি মনিটর ডিজিটাল মনিটর হিসেবেই পরিচিত। মূলত সিআরটি, এলসিডি ও এলইডি মনিটরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে প্রযুক্তিগত।

চিকিৎসাবিদদের মতে, পুরনো পিকচার টিউব হলো এক ধরনের বিষাক্ত পদার্থ। এসব দিয়ে তৈরি করা টেলিভিশন থেকে নির্গত গামা রশ্মি দেহ ও চোখের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। অন্যদিকে পুরনো পিকচার টিউবের অতিবেগুনি রশ্মি ওজোন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে পরিবেশকে বিপর্যয় করছে।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট ও ব্র্যান্ডের শোরুম ঘুরে জানা যায়, ব্র্যান্ডের কম্পানিগুলো ছয়-সাত বছর আগেই সিআরটি টেলিভিশনের উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এখন ব্র্যান্ডের নামে মার্কেটে ইলেকট্রিক পণ্যের দোকানে যেসব সিআরটি টেলিভিশন বিক্রয় হচ্ছে, তার সবই নকল।

বাড্ডায় জিকে ইলেকট্রনিকসের মালিক আমিনুল ইসলামের দোকানে এলইডি টিভির সঙ্গে ১৪ ও ২১ ইঞ্চির দুটি সিআরটি টেলিভিশন দেখা যায়। যদিও ১৪ ইঞ্চি সিআরটি টেলিভিশনে এলজি ব্র্যান্ডের নাম লেখা। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আসল এলজি না, লোকাল এলজি। সিআরটি টেলিভিশনের কিছু ক্রেতা এখনো রয়েছে। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষজন এখনো সিআরটি কিনছে। আবার এলইডি টিভি ভেঙে যাওয়ার ভয়ে সিআরটি কিনছে। তবে তিন-চার মাসে একটি বিক্রি হয়। এখন বাজারে নন-ব্র্যান্ডের একটি এলইডি টিভি ও সিআরটি টেলিভিশনের দাম একই।’

তিনি বলেন, ‘সিআরটি টেলিভিশন ১৪ ইঞ্চির দাম পাঁচ হাজার এবং ২১ ইঞ্চির দাম সাড়ে সাত হাজার টাকা। এদিকে সাড়ে সাত হাজার টাকায় নন-ব্র্যান্ডে বা চায়না ২৪ ইঞ্চি একটি এলইডি পাওয়া যাচ্ছে। নন-ব্র্যান্ডের ৩২ ইঞ্চি এলইডি স্মার্ট টিভি ১২ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আবার স্মার্ট ছাড়া ৩২ ইঞ্চি এলইডি সাড়ে ১০ হাজার টাকায় পাওয়া যায়।

হোসাইন মার্কেটে খান ইলেকট্রনিকসের দোকানের রাকিব হোসেন বলেন, ‘সিআরটি টেলিভিশনের চলন নেই এখন। বছরেও একটি ক্রেতা আসে না, তাই সিআরটি টেলিভিশন রাখা হয় না। তবে সিআরটি টেলিভিশন বাজারে যেগুলো পাওয়া যায় সেগুলো সব নকল। ব্র্যান্ডের নাম বসিয়ে বিক্রি করছে। এখন বাজারে কম দামে চীনের এলইডি টিভি পাওয়া যাওয়ায় কেউ আর সিআরটি টেলিভিশন নেয় না।’

টিভির বাজার এখন এলইডির দখলে। বর্তমানে বাজারে এলইডি স্মার্ট টিভির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সাধারণ এলইডির সঙ্গে এলইডি স্মার্ট টিভির প্রধান পার্থক্য হলো স্মার্ট টিভি ইন্টারনেটে সংযুক্ত থাকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত এই স্মার্ট টিভিগুলোতে আরো নতুন নতুন ফিচার সংযোজনের চেষ্টা করছে এবং বিভিন্ন সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজারজাত করছে। প্রতিটি স্মার্ট টিভিতে বিশেষ একটি অপারেটিং সিস্টেম থাকে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন অ্যাপ ও ফিচার সংযোজন করা যায়।

রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোডে ওয়ালটন শোরুমের ম্যানেজার মোস্তফা কামাল সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে সাধারণ এলইডি ও এলইডি স্মার্ট টিভি বাজারে চলছে। সিআরটি টেলিভিশন ও এলসিডি টিভি বাজার থেকে এখন হারিয়ে গেছে। এলইডির মধ্যে এলইডি স্মার্ট টিভির জনপ্রিয়তা বেশি। এলাইডি স্মার্ট টিভি ১০টি বিক্রি হলে সাধারণ এলইডি টিভি বিক্রি হয় দুই-তিনটি। এলইডি টিভির চেয়ে স্মার্ট টিভির দামও গড়ে আট থেকে ১০ হাজার টাকা বেশি।’

তিনি বলেন, ‘করোনার পর থেকে বাজারে সব ব্র্যান্ডের এলইডি ও স্মার্ট টিভির দাম আগের চেয়ে দুই হাজার টাকা বেড়ে গেছে। ওয়ালটনের এলইডি ৩২ ইঞ্চি টিভি বিক্রি হচ্ছে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং এলইডি স্মার্ট ৩২ ইঞ্চি টিভি বিক্রি হচ্ছে ২৮ হাজার টাকা।’

মধ্য বাড্ডার এলজি, বাটারফ্লাই শোরুমের ম্যানেজার মো. জুনায়েদ সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১০ সালের দিকে এলজি সিআরটি টেলিভিশন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। সিআরটির পরিবর্তে বাজারে এলসিডি আসে। সেটিও ২০১৪ সাল পর্যন্ত চলে। পরে আসে এলইডি। এলইডির বিভিন্ন মডেলের টিভি এখন বাজার দখল করে আছে। এলজি কম্পানিতে এলইডির সর্বশেষ মডেল ওএলইডি (অর্গানিক লাইট-এমিটিং ডায়োড)। এটির সর্বনিম্ন সাইজ ৪৮ ইঞ্চি, দাম এক লাখ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকা। এলজি কম্পানি সব সময় স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের পণ্য দেওয়া চেষ্টা করছে।’

তিনি বলেন, ‘আট থেকে ১০ বছর আগে এলজির ২১ ইঞ্চির একটি সিআরটি টেলিভিশন ১৮ হাজার টাকায় এবং ১৪ ইঞ্চি ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। বর্তমানে এলজির একটি এলইডি ৩২ ইঞ্চি টিভি ২০ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। সিআরটির তুলনায় এলইডির দাম হিসাব করলে অনেক কমেছে।’