আজ ২৬শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১০ই জুলাই, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সেই সুশ্রী চেহারা কেবিন ক্রুদের হারিয়ে গেল করোনায় অন্যরকম আকাশযাত্রা

প্রথমবার্তা, প্রতিবেদকঃ ‘সন্মানিত যাত্রী, আপনার সিট বেল্ট বেঁধে নিন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চট্রগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবো। করোনা সংক্রমণরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, এয়ারক্রাফট থেকে নামার সময় সামাজিক ‌দূরুত্ব মেনে চলুন…’।

 

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিএস-১০১ ফ্লাইটের অবতরণী ঘোষণায় যাত্রীদের এমন আহবান জানাচ্ছিলেন কেবিন ক্রু সুমাইয়া আক্তার। চিরায়ত পোশাকের বদলে মাস্ক, ফেস শিল্ড, পিপিই, গ্লাভসে মোড়া ছিলেন। মাস্কের আড়ালে হারিয়ে গেছে তাঁর চির চেনা মিষ্টি হাসি, সুশ্রী চেহারা।

 

করোনাভাইরাসের মধ্যে অন্যরকম আকাশযাত্রার অভিজ্ঞতা জানালেন সুমাইয়া আক্তার। প্রথমবার্তাকে তিনি বলছিলেন, ‘জীবনে প্রথম কোনো ফ্লাইটে ডিউটি করলাম, যেখানে সবার মুখ ছিল মাস্কে ঢাকা।

 

পুরো এয়ারক্রাফটে এক ছিট খালি রেখে বসেছেন যাত্রীরা। সবার চোখে-মুখে করোনা নিয়ে উদ্বেগের ছাপ। করোনা সংক্রমণরোধে দেড় ঘণ্টার কম ফ্লাইটে খাবার না দেওয়ার নির্দেশনা থাকায় এসব নিয়েও ব্যস্ততা ছিল না।

 

তবে ফ্লাইটের পুরো সময়জুড়ে বাড়তি সতর্কতা ছিল করোনা নিয়ে। নিরাপত্তা সতর্কতার পাশাপাশি এখন দেখার বিষয় ফ্লাইটে যাত্রীরা মাস্কসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছেন কি না। তাই যাত্রীদের ওপর বেশি বেশি নজর রাখতে হচ্ছে।’

 

চট্টগ্রামগামী যাত্রী সোহেল আহমেদ প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘মাস্ক, গ্লাভস আর পিপিইতে ঢাকা কেবিন ক্রুদের দেখে মনে হচ্ছিল আমরা মহাকাশযানে আরোহন করেছি।

 

তাদের চিরচেনা হাসিমুখ কিংবা আপ্যায়নের আন্তরিকতা এখন আমাদের কল্পনা করেই নিতে হবে। তারাও কিন্তু যাত্রী সাধারণের হাসিমুখ থেকে বঞ্চিত। কারণ আমারও মাস্কের আড়ালে ঢাকা পড়েছি।’

 

করোনাভাইরাসের কারণে এভাবেই বদলে গেছে আকাশ ভ্রমণ। দীর্ঘ দুই মাসের বেশি বন্ধ থাকার পর সোমবার শুরু হওয়া অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে চিরচেনা অনেক কিছুই আর দেখা যায়নি।

 

প্রথম দিনে অভ্যন্তরীণ তিনটি রুটে (ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম, সিলেট, সৈয়দপুরে) ২৪টির মধ্যে পাঁচটি বাতিল হওয়ায় ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে ১৯টি। ১৫ জুন পর্যন্ত তিনটি রুটে ২৪টি ফ্লাইটের মধ্যে ইউএস-বাংলা চট্টগ্রামে ৬টি, সৈয়দপুরে তিনটি ও সিলেটে একটি করে ফ্লাইট চলবে।

 

নভোএয়ারের প্রতিদিন চট্টগ্রামে তিনটি, সৈয়দপুরে তিনটি ও সিলেটে একটি করে ফ্লাইট রয়েছে। বিমানের প্রতিদিন চট্টগ্রামে দুইটি, সিলেটে দুইটি ও সৈয়দপুরে তিনটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করার কথা ছিল। এ ছাড়া কার্যক্রম বন্ধ থাকায় উড়তে পারেনি রিজেন্ট এয়ারওয়েজ।

 

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) আসনসংখ্যার সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ যাত্রী বহনের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু যাত্রীদের বাড়তি সতর্কতায় অনেকটাই ফাঁকা গেছে উড়োজাহাজ।

 

অন্যান্য গণপরিবহনের তুলনায় বেশি সুরক্ষা এবং ভাড়া বৃদ্ধি না করেও কাঙ্খিত যাত্রী পায়নি তিনটি বিমান সংস্থা। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ছেড়ে গেছে মাত্র চার জন যাত্রী নিয়ে।

 

জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উপ-মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার প্রথমবার্তাকে বলেন, ‘ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম, সিলেট ও সৈয়দপুরে আমাদের দুটি কওে মোট ছয়টি ফ্লাইট ছিল।

 

এর মধ্যে যাত্রী সংকটে পাঁচটিই বাতিল করা হয়েছে। সকালেই চট্রগ্রাম ও সিলেটের ফ্লাইট বাতিল করা হয়। সৈয়দপুরের ৭৪ আসনের উড়োজাহাজ ছেড়ে গেছে চার জন নিয়ে, আর ফিরেছে ২০ জন যাত্রী নিয়ে। সন্ধ্যার ফ্লাইটও বাতিল করা হয়েছে।

 

কম যাত্রী থাকায় তাদের অন্য বিমান সংস্থায় পাঠিয়ে ফ্লাইট স্থগিত করা হয়েছে।’ তিনি জানান, যাত্রী সংকটে আজ মঙ্গলবারের ৬টি ফ্লাইটও বাতিল করা হয়েছে।

 

করোনাভাইরাসের মধ্যে বিমান চলাচলে ৩৫টি নির্দেশনা সম্বলিত আদেশ জারি করেছে বেবিচক। নতুন নিদেশনায়, উড়োজাহাজে উঠে ইনফ্লাইট সেবাদানকারী কেবিনক্রুদের পিপিই, গুগলস, ফেসশিল্ড পরতে হবে।

 

দেড় ঘণ্টার কম ফ্লাইটে দেওয়া হবে না খাবার। যাত্রীদেরও বাধ্যতামূলকভাবে পরতে হবে হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক। সামজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে প্লেনে উঠতে হবে, বসতে হবে পাশের ছিট খালি রেখে।

 

প্রতি ফ্লাইট শেষে বিমান সংস্থাকে পুরো প্লেন, যাত্রিবাহী বাস জীবানুমুক্ত করতে হবে। বেবিচকের কাছ থেকে ফ্লাইট ছাড়ার আগে ‘সার্টিফিকেট অব ডিসইনফেকশন’ নিতে হবে, তারপর আরেকটি গন্তব্যে যেতে পারবে।

 

প্রতি গন্তব্যের যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা, হেলথ ডিক্লারেশন ফর্ম পূরণ করতে হবে। এসব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফ্লাইট ছাড়তেও বেশি সময় লাগছে।

 

বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা নভোএয়ারের সিনিয়র ম্যানেজার (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) একেএম মাহফুজুল আলম বলেন, ‘উড়োজাহাজ জীবানুমুক্ত করার কারণে আমরা ৪৫ মিনিট বিরতীতে ফ্লাইট চালাচ্ছি।

 

৭২ আসনের এটিআর ৭২-৫০০ এয়ারক্রাফট চলছে সৈয়দপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম রুটে। তবে যাত্রীর পরিমাণ কম ছিল। দ্বিতীয় দিনেও যাত্রীর চাপ কম আছে।’

 

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ৭২ আসনের এটিআর ৭২-৬০০ এবং ৭৬ আসনের ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ দিয়ে আভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালাচ্ছে। এয়ারলাইনসটির জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যাবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম বলেন,

 

‘প্রথমদিন সকাল ৭টায় ২৮ জন যাত্রী নিয়ে তাদের প্রথম ফ্লাইট ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গেছে। ফিরেছে ৩৫ জন যাত্রী নিয়ে। এ ছাড়া ৫১ জন যাত্রী নিয়ে সৈয়দপুরে গিয়ে ৫৪ জন যাত্রী নিয়ে ফিরেছে ইউএস বাংলার আরেকটি উড়োজাহাজ।

 

সোমবার সারাদিনে আসা যাওয়া মিলিয়ে চট্টগ্রাম রুটে ১২টি, সৈয়দপুর রুটে ৬টি এবং সিলেট রুটে ২টি ফ্লাইট ছিল বলে জানান তিনি।

 

তিনি বলেন, করোনার মধ্যে আমাদের গুয়াংজু ফ্লাইট পরিচালনার অভিজ্ঞতা কাজে দিচ্ছে। তাই বেবিচকের নতুন নিয়মে ফ্লাইট চালাতে খুব একটা বেগ পেতে হচ্ছে না।

 

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক এএইচএম তৌহিদ উল আহসান বলছেন, ‘বেবিচক বেঁধে দেওয়া স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়ম মেনেই যাত্রী পরিবহন করেছে এয়ারলাইনসগুলো। প্রথম দিন যাত্রী কম ছিল। তবে ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে তেমন কোনো সমস্যা হয়নি।’

এই পোস্টটি আমাদের সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন