আজ ৩০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জুলাই, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

টিউশন ফি নিয়ে সংকটে শিক্ষক-অভিভাবক
টিউশন ফি নিয়ে সংকটে শিক্ষক-অভিভাবক

টিউশন ফি নিয়ে সংকটে শিক্ষক-অভিভাবক

প্রথমবার্তা প্রতিবেদক, গাইবান্ধা:করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি রোধে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। স¤প্রতি সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত খুলছে না স্কুল-কলেজের দরজা। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কোনো চিন্তা-ভাবনা যখন নেই। কিন্তু বেতন পরিশোধ নিয়ে অভিভাবক আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চলছে মন কষাকষি।

 

করোনাকালে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা বেতন-ভাতা পরিশোধের বিপক্ষে নানা যুক্তি তুলছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষা ফি (টিউশন ফি) আদায়ে চাপ না দিতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান এই সময়েও শিক্ষা ফি আদায় করছে, তাগাদাও দিচ্ছে।

 

আবার শিক্ষা ফি আদায় করতে না পারায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই বেতন-ভাতা দিতে না পারায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। এই পরিস্থিতিতে উভয় সংকটে পড়েছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকরা। কিন্তু এই প্রশ্নে নীরব ভ‚মিকায় জেলা শিক্ষা অফিস। গাইবান্ধা শহরের মহুরী পাড়ার শামীম হক নামের এক অভিভাবক বলেন, যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা নেই। তাই কয়েক মাসের শিক্ষা ফি মওকুফ করে প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকি দিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের সমস্যা সমাধান পারে।

 

বর্তমান পরিস্থিতিকে উভয়সংকট উলে¬খ করে শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী জহুরুল কাইয়ুম বলেন, টিউশন ফি নির্ধারিত হয় মূলত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, বিভিন্ন ধরনের বিল পরিশোধসহ বিভিন্নকাজের জন্য। কিন্তু করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেতন-ভাতা ছাড়া প্রতিষ্ঠানের তেমন কোনো খরচ ছিল না। যেসব অভিভাবক বেসরকারি চাকরি ও ছোট ব্যবসা করেন, তারা সমস্যায় আছেন। এই অবস্থায় শতভাগ বেতন আদায় করা কোনো যুক্তির মধ্যে পড়ে না।

 

আর যেসব স্কুলের ফান্ড রয়েছে, তাদের তো কয়েক মাস শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি না নিয়েও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনে কিছুটা ফি কম নেওয়া বা কিস্তিতে ফি নেওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারে, যার মধ্য দিয়ে অভিভাবকরাও কিছুটা স্বস্তি পেলেন।

 

এসকেএস স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার বলেন, করোনাকালে আমরা অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ক্লাশ ও পরীক্ষা নিচ্ছি। সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দাপ্তরিক কাজকর্মও শুরু করেছি। এক হাজার একশত শিক্ষার্থীর টিউশন ফি আদায় করেই আমাদের বিরানব্বই জন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন দিতে হয়। খুব কম প্রতিষ্ঠানই আছে যাদের বছর শেষে টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। বর্তমান অবস্থায় টিউশন ফি পাওয়া যাচ্ছে না বলেই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ধার-কর্য করতে হচ্ছে। এভাবে গত তিনমাস চালিয়ে এসেছি, আর কতদিন চলতে পারবো বলতে পারছিনা। শতকরা ২৫ ভাগ অভিভাবক স্বেচ্ছায় তাদের সন্তানদের টিউশন ফি পরিশোধ করেছেন। তবে যারা সচ্ছল অভিভাবক তারা যদি সবাই বেতন পরিশোধ করে দিতেন, তাহলে যারা সত্যিকার অর্থেই সমস্যায় আছেন তাদের ব্যাপারে ভাবতে পারত প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীদের বেতন আদায়ে আমরা কোন চাপ বা তাগাদা দিচ্ছিনা। করোনাকাল শেষে আমরা সবার সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বেতন আদায় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবো।

 

আহম্মদ উদ্দিন শাহ শিশু নিকেতন স্কুল ও কলেজের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, গাইবান্ধার স্কুলগুলো মাসের শুরুতে সেই মাসের বেতন নিয়ে থাকে। অথচ করোনাকালে অনেক অভিভাবক পুরো মাস চাকরি করেও বেতন পাচ্ছেন না। এমনকি অনেক বেসরকারি চাকুরের একাধিক মাসের বেতনও বাকি। গত মে মাসে ঈদের আগে সাধারণ ছুটির মধ্যেই জেলা শহরের বেশিরভাগ স্কুলগুলো মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিনমাসের বেতন আদায় করার চেষ্টা করছিল, এতে কিছু শিক্ষার্থীর বেতন আদায় হলেও অভিভাবকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। জুন মাসের বেতন আদায়ের সময় এসে গেছে। এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের মাঝে নতুন করে আবারও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে।

 

করোনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছে জেলার কিন্ডারগার্টেন স্কুল। সেগুলোর বেশির ভাগেই আয়- রোজগার খুব বেশি নয়। শিক্ষকরাও সামান্য টাকা বেতন পান। কিন্তু মার্চ মাস থেকেই এসব স্কুলে টিউশন ফি আদায় বন্ধ রয়েছে। শিক্ষকরাও বেতন পাচ্ছেন না। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এসব স্কুলের শিক্ষকদের আয় ছিল মূলত প্রাইভেট টিউশনি নির্ভর। কিন্তু মার্চ মাস থেকে প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের আয়- রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। জেলা শহরের কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের টিউশন ফির জন্য নানাভাবে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিভাবকদের মোবাইল ফোনে এসএমএস বা কল করে বেতন চাইছে। বিষয়টা অভিভাবকদের জন্য বিব্রতকর।

 

গাইবান্ধা সদর উপজেলা মডেল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারী ও অভিভাবক সকলেই এক সংকটকাল অতিক্রম করছেন। করোনাকালে বিগত মাসগুলোতে স্কুল ফান্ড থেকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধ করেছি। কিছু অভিভাবক স্বেচ্ছায় সন্তানদের টিউশন ফি দিচ্ছেন। তবে এ ধরনের অভিভাবক শতকরা দশ ভাগের বেশি হবেনা। টিউশন ফি আদায়ে কাউকেই কোন চাপ প্রয়োগ বা তাগাদা দেয়া হচ্ছেনা।

 

গাইবান্ধা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে গত ১৮ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সবাই কমবেশি সমস্যায় পড়েছে। একদিকে পড়াশোনার ক্ষতি, অন্যদিকে আর্থিক সংকট। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সমস্যাটি বেশি। অভিভাবকেরাও আর্থিক সমস্যায় আছেন। এ জন্য বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের ফি আদায়ে চাপ না দিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

এই পোস্টটি আমাদের সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন