আজ ৩০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জুলাই, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ডুইবা গেলো চোখের সামনেই দুই মামা, আহারে

প্রথমবার্তা,প্রতিবেদকঃ  ‘আহারে, আমার চোখের সামনেই দুই মামা ডুইবা গেলো। আমি কিছুই করতে পারলাম না। নিজের জীবনটা নিয়া কোনোরকমে ভাইসা ছিলাম। একটা নৌকায় উঠতে পারছিলাম’, দুই মামাকে হারিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে বসে আহাজারি করছিলেন মাসুদ (৩০)। দুই মামা বাচ্চু শেখ (৫৯) ও আফজাল শেখ (৫৫)সহ মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থেকে সদরঘাটে আসছিলেন তারা। সকাল ৯টার দিকে সদরঘাটে পৌঁছানোর একটু আগেই আরেক লঞ্চের সঙ্গে সংঘর্ষে ডুবে যায় তাদের ছোট্ট লঞ্চ—মর্নিং বার্ড। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরিরা এসে মাসুদের দুই মামাসহ ৩০ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। এখনও নিখোঁজ অনেক যাত্রী।ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মাসুদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার বড় মামা বাচ্চু শেখ পুরনো ঢাকার মৌলভীবাজারে ব্যবসা করেন। আরেক মামা আফজাল শেখ থাকেন ময়মনসিংহে, সেখানে ব্যবসা করেন তিনি। ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন আফজাল শেখ। সকালে দুই মামাসহ তারা তিন জন একসঙ্গে সদরঘাটের উদ্দেশে রওনা দেন। সদরঘাট পৌঁছে বাচ্চু শেখের নিজ দোকানে, আর আফজাল শেখের ময়মনসিংহ চলে যাওয়ার কথা ছিল।‘দুজনই লাশ হয়ে ফিরছেন, বাড়িতে।’ বলেই আবারও ডুকরে কেঁদে উঠলেন সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মাসুদ। অ্যাম্বুলেন্সে মামার লাশের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন অন্য স্বজনদের সঙ্গে। পাশেই সারি সারি অ্যাম্বুলেন্স। শনাক্তের পর মরদেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন অনেকেই। আগেই ভাড়া করে রেখেছেন অ্যাম্বুলেন্স।সোমবার (২৯ জুন) দুপুর থেকেই পুরনো ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বা মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে। করোনাভাইরাসের প্রকোপের মাঝেও মৃত ব্যক্তিদের লাশ শনাক্তের জন্য ভিড় করছিলেন অনেকে।বাবা আমির হোসেনের লাশ সামনে নিয়ে বসেছিলেন ছেলে সোলায়মান। সঙ্গে আরও আত্মীয়-স্বজন। দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে মুন্সীগঞ্জে থাকতেন একসময় জাহাজের সারেং হিসেবে চাকরি করা আমির হোসেন। পানিতে পানিতে যার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে, চাকরি ছেড়ে এসে সেই পানিতেই ডুবে মরতে হলো তাকে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলে সোলায়মান জানান, সারা জীবন জাহাজে চাকরি করেছেন তার বাবা। কখনও কিছু হয়নি। এখন চাকরি ছেড়ে এসে লঞ্চডুবিতে মারা গেলেন।বংশালের কসাইটুলীতে থাকতেন আব্দুর রহমান ও হাসিনা আক্তার দম্পতি। তিন ছেলেকে নিয়ে ঢাকার বাসাতেই ছিলেন তারা। ছোট ছেলে সিফাতকে নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর আব্দুল্লাহপুরে। সকালে ফেরার সময় তিন জনেরই সলিল সমাধি হয়েছে। হাসিনা ও ছেলে সিফাতের লাশ উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন আব্দুর রহমান। মেহেদী হাসান রাজু নামে এই পরিবারের এক আত্মীয় জানান, আব্দুর রহমান জজকোর্টে আইনজীবীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। অনেক কষ্টে তিন ছেলেকে মানুষ করছিলেন তিনি। বড় ছেলে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার কথা তার। অথচ এক মুহূর্তেই পরিবারটা তছনছ হয়ে গেলো।ইউসুফ আলী নামে এক স্বজন জানান, তাদের গ্রামের তিনটি ছেলে যমুনা ব্যাংকে কাজ করতেন। শাহাদাত, সুমন ও আবু তাহের নামে তিন জন একসঙ্গেই মারা গেছেন। ইউসুফ আলী জানান, শাহাদাত যুমনা ব্যাংকের মৌলভীবাজার শাখা, সুমন ইসলামপুর শাখা, আর তাহের প্রধান কার্যালয়ে চাকরি করতেন। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর মীরকাদিমপুরে তাদের বাসা। সকালে একসঙ্গে লঞ্চে করে অফিসে আসছিলেন তারা। নিহত সুমনের ভাই শরীফ বলেন, ‘অফিস করতেই ঢাকার পথে রওনা হয়েছিল সে। অফিস আর করা হইলো না। নিহত সুমনের দুটি ছেলে আছে। আমাদের পরিবারে বাব-মা নেই। আমরা সব ভাইয়েরা আছি। সুমনের ছেলে দুইটার কী হবে?’নিহতদের স্বজনরা জানান, ‘মর্নিং বার্ড’ টঙ্গিবাড়ী এলাকার লঞ্চ। মুন্সীগঞ্জের কাঠপট্টি এলাকা থেকে প্রতিদিন সকালে ব্যবসায়ী ও অফিসগামীদের নিয়ে সদরঘাট আসে।

সন্ধ্যায় আবারও ফিরে যায় কাঠপট্টিতে। লঞ্চের বেশিরভাগ যাত্রীই ছিল টঙ্গিবাড়ী এলাকার।লালবাগের কামলাবাগে ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকতেন ময়না বেগম (৩৫)। মেয়ে মুক্তা (১৪) ও ছেলে রিফাতকে (১৭) নিয়ে গিয়েছিলেন গ্রামের বাড়ি টঙ্গিবাড়ীতে। স্বামী মাছুম থাকেন মালয়েশিয়ায়। সকালে ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে এই লঞ্চে করেই ফিরছিলেন ঢাকার বাসায়। আর ফেরা হলো না তাদের। মা-মেয়ের সলিল সমাধি হয়েছে বুড়িগঙ্গায়। ছেলে রিফাত সাঁতরে ভেসে থাকে কিছুক্ষণ, পরে আশপাশের নৌকা এসে উদ্ধার করে তাকে।মিটফোর্ড মর্গে লাশ চিনতে বেগ পেতে হয়েছে অনেককে। অনেক লাশ ফুলে যাওয়ায় কিংবা নাক-মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়ে যাওয়ায় চিনতে কিছুটা বেগ পেতে হয় স্বজনদের। লাশ পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। হতবিহ্বল স্বজনদের কেউ কেউ অ্যাম্বুলেন্সে লাশ তুলে অপেক্ষা করছিলেন। এদিকে লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাফন বাবদ ২০ হাজার টাকা এবং বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, দিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কমিটির প্রধান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন ও পিপিপি সেল) মো. রফিকুল ইসলাম খান। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এই পোস্টটি আমাদের সোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন